বাইডেনের ‍উদ্দেশে যা বললেন নিহত সাংবাদিক শিরিন আকলেহের ভাতিজি

ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে নিহত হন আল জাজিরার সাংবাদিক শিরিন আবু আকলেহ
ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে নিহত হন আল জাজিরার সাংবাদিক শিরিন আবু আকলেহসংগৃহীত ছবি

ক্ষমতাগ্রহণের পর প্রথম বারেরমতো ইসরায়েল এবং অধিকৃত পশ্চিম তীর সফর করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন।

সফরকালে ইসরায়েলি নেতাদের সঙ্গে বৈঠক, বিমানঘাঁটি পরিদর্শন এবং হলোকাস্ট স্মরণ কেন্দ্র পরিদর্শন করেন বাইডেন। তার এ সফরে আবারও আলোচনায় এসেছেন আল জাজিরার সাংবাদিক শিরিন আবু আকলেহ। যিনি সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে নিহত হন।

বাইডেন যখন পশ্চিম তীর সফর করছেন, তখন আল জাজিরার মতামত বিভাগে একটি লেখা লিখেন নিহত সাংবাদিক শিরিন আবু আকলেহের ভাতিজি লিনা আবু আকলেহ। যেখানে তিনি বলেন, ইসরায়েলি অভিযান নিয়ে সংবাদ সংগ্রহে যাওয়ার পর গত ১১ মে সকালে জেনিন শরণার্থী শিবিরের সামনে হত্যা করা হয় আমার ফুফুকে।

দায়ভার থেকে মুক্তি পেতে প্রাথমিকভাবে তার মৃত্যুর জন্য ফিলিস্তিনিদের ওপর দোষ চাপানোর চেষ্টা করেছিল ইসরায়েল। তবে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, সিএনএন, ওয়াশিংটন পোস্ট, নিউ ইয়র্ক টাইমস, জাতিসংঘ, ইসরায়েলি মানবাধিকার সংস্থা বি’তেসেলেমের তদন্ত প্রতিবেদন এবং প্রত্যক্ষদর্শী সাংবাদিকরা বলছেন-

একজন ইসরায়েলি স্নাইপার আমার ফুফুকে তার বুলেট প্রুফ ভেস্ট (স্পষ্টভাবে প্রেস দ্বারা চিহ্নিত) এবং সুরক্ষামূলক হেলমেটের মাঝখানে গুলি করেছিল। গুলির ধরন ও স্থান নির্বাচন দেখে যে কেউই বুঝবে- এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। কারণ, ফুফুর ওপর ইসরায়েলি বাহিনী অনেক আগে থেকেই ক্ষুব্ধ ছিলো। যার নগ্ন বহিঃপ্রকাশ তার শেষ বিদায়ে জড়ো হওয়া লোকদের ওপর ইসরায়েলি দখলদার বাহিনীর জঘন্যতম হামলা।

ফুফুর সঙ্গে শৈশবের সুখস্মৃতি মন্থন করতে গিয়ে তিনি বলেন, তিনি আমার ভীষণ পছন্দের একজন মানুষ ছিলেন। উনি যখন বাসা থেকে লাইভ দিতেন, আমি পাশে বসে বিস্মিত ও মুগ্ধ চোখে তাকে দেখতাম। এরপর আামর রুমে গিয়ে ফুফুকে নকল করতাম। আমার গোলাপী বার্বি ফোন কানে নিয়ে লাইভ দিতাম। শেষে পে-অফে বলতাম- শিরিন আবু আকলেহ, আল জাজিরা!

তিনি আরও লিখেন- আমি একটু বড় হওয়ার পর থেকেই ফুফু আমাকে তার অফিসে নিয়ে যেতেন। তিনি যে প্রতিবেদনগুলো নিয়ে কাজ করছেন আমার সঙ্গে তা শেয়ার করতেন। শুক্রবারে অফিসে সহকর্মীদের সঙ্গে সকালের খাবার খেতেন তিনি। মাঝে মাঝে আমাকেও সেখানে নিয়ে যেতেন। নিহত হওয়ার মাত্র নয় দিন আগেও আমি ফুফুর সঙ্গে শুক্রবারে ওই অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলাম। কিন্তু ঘুনাক্ষরে ভাবতে পারিনি যে তার সঙ্গে আর কখনোই এখানে আসা হবে না।

যাইহোক, বাইডেন প্রশাসন আমার ফুফুকে আমাদের কাছে ফিরিয়ে দিতে পারবে না। তারা আমার কাছে সেই ব্যক্তিকে ফিরিয়ে দিতে পারবে না, যে কেবল আমার ফুফু নয়, বিশ্বস্ত, পরামর্শদাতা এবং আমার সেরা বন্ধুও। তবুও, আমরা আশা করি বাইডেন আমাদের সঙ্গে বসবেন এবং সাংবাদিক শিরিন হত্যাকারীদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবেন।

এ জন্য নিরাপত্তার ধুয়া তুলে অন্যায়ভাবে যাকে খুশি তাকে গুলি করে হত্যা করার ইসরায়েলি প্রথাকে সমর্থন করা থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বিরত থাকতে হবে। মার্কিন কংগ্রেসের ৫৭ জন সদস্যের দাবি মেনে শিরিন হত্যাকাণ্ডে এফবিআই এবং স্টেট ডিপার্টমেন্ট দ্বারা পরিচালিত একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ, স্বচ্ছ তদন্ত করতে হবে।

আমরা ও নির্যাতিত ফিলিস্তিনিরা চাই- তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসুক- কে গুলিয়ে চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলো। শুধু তাই নয়, হত্যাকাণ্ডে কী অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল এবং সেই অস্ত্রগুলো কীভাবে কেনা হয়েছিল তাও প্রকাশ করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ফিলিস্তিনের যৌথ নাগরিক আমর ফুফুকে হত্যা করার অস্ত্রটি যদি ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা হিসেবে দেওয়া মার্কিন অস্ত্র হয়, তবে বাইডেন প্রশাসনকে জবাবদিহি করতে হবে- মার্কিন করদাতাদের অর্থে বানানো অস্ত্র দিয়ে মার্কিনীদেরই হত্যাযজ্ঞ আর কতদিন চলতে দেওয়া হবে?
-লিনা আবু আকলেহ।

বাইডেন প্রশাসনকে অন্তত একটি জায়গায় পরিবর্তন আনার দাবি জানিয়ে তিনি আরও লেখেন, সাংবাদিক শিরিন হত্যাকাণ্ডে পূর্ববর্তী মার্কিন প্রশাসনের চিরায়ত নীরবতা ভাঙতে হবে। জবাবদিহি করতে হবে খুনিদের। বিচারহীনতার সংস্কৃতি তুলে ধরে তিনি লেখেন-

মার্কিন সরকার ফিলিস্তিনি-আমেরিকান ওমর আসাদ, তুর্কিয়ে-আমেরিকান ফুরকান দোগান এবং ওয়াশিংটনের শান্তিকর্মী রাচেল কোরি হত্যাকাণ্ডের জন্য ইসরায়েলের কাছে জবাবদিহিতা চায়নি। যার ফলে সাংবাদিক শিরিনকে হত্যার আগে দুইবার ভাবতে হয়নি ইসরায়েলি সৈন্যদের। কারণ তারা জানে, যা-ই করা হোক যুক্তরাষ্ট্র চোখ বন্ধ করে রাখবে।

তিনি আরও বলেন, একজন শিরিন হত্যার বিচার হওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, তাতে নির্যাতিত ফিলিস্তিনিদের হত্যার বিচারকাজকেও ত্বরান্বিত করবে। কয়েক দশক ধরে চলা ইসরায়েলি দখলদারিত্ব ও নির্মম নির্যাতন বন্ধে এই পদক্ষেপের বিকল্প নেই। আর আমার ফুফু নিহত সাংবাদিক শিরিন আবু আকলেহে এটাই চাইতেন।

লিনা আবু আকলেহ, নিহত আল জাজিরার সাংবাদিক শিরিন আবু আকলেহের ভাতিজি।

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.
kalbela.com