আমেরিকান হওয়ার স্বপ্নে যেভাবে শেষ হচ্ছে বহু জীবন

মরদেহ নিয়ে যাচ্ছেন স্বজনরা
মরদেহ নিয়ে যাচ্ছেন স্বজনরা

মেক্সিকোর সান মার্কোস অ্যাটেক্সকুইলাপান। যেখানে বসবাস করে অলিভেরাস পরিবার। বাড়ির উঠানে শতাধিক মানুষের ভিড়। ভিড়ের কেন্দ্রবিন্দুতে তিনটি ছবি। যেখানে এক যুবক ও দুই কিশোরকে দেখা যাচ্ছে। মেক্সিকো থেকে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যে পাড়ি দেওয়ার সময় ভয়াবহ পরিস্থিতিতে পড়ে মৃত্যু হয়েছে তাদের।

লরিতে হিট স্ট্রোকে মারা যাওয়া- মিরেল (বাঁ থেকে) ইয়োভানি ও জাইর।
লরিতে হিট স্ট্রোকে মারা যাওয়া- মিরেল (বাঁ থেকে) ইয়োভানি ও জাইর।

সংবাদমাধ্যম বিবিসি বলছে, গত ২৭ জুন যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের সান আন্তোনিও শহরে একটি লরির ভেতরে ও পরে হাসপাতলে নেওয়ার পথে অন্তত ৫৩ জনের মৃত্যু হয়। নিহত সবাই অভিবাসনপ্রত্যাশী। যাদের মধ্যে রয়েছে অল্পবয়স্ক ওই তিন মেক্সিকান- মিরেল (১৬), ইয়োভানি (১৬) ও জাইর (২০)। তাদের মধ্যে ইয়োভানি ও জাইর সহদোর এবং মিরেল তাদের চাচাতো ভাই।

দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে এই তিনজনের মরদেহ যুক্তরাষ্ট্র থেকে মেক্সিকোতে আনা হয়েছে। দুই ছেলেকে হারিয়ে শোকে কাতর ইয়োভানি ও জাইরের মা ইয়েলদা। তিনি বলেন, ‘আমি জানি তাদের আর ফিরে পাওয়া যাবে না। কিন্তু দেরিতে হলেও তাদের মরদেহ ফিরে পেয়েছি। এখন অন্তত তাদের সমাধিস্থলে গিয়ে দাঁড়াতে পারব।’ এরপর কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন তিনি।

কিন্তু প্রশ্ন হলো- এতো অল্প বয়সে এতবড় ঝুঁকি তারা কেন নিলো, এর পেছনে প্রভাবক হিসেবে কোন বিষয়টি কাজ করেছে? এই প্রশ্নের জবাবে স্থানীয়রা বলেন, তারা কোনো সহিংসতার জন্য বা সংগঠিত অপরাধের জন্য দেশ ছাড়েনি। অথবা তারা কোনো রাজনৈতিক নির্বাসনের অংশ হিসেবেও ওই যাত্রা করেনি। মেক্সিকো ছেড়ে তাদের টেক্সাসে পাড়ি দেওয়ার একটাই উদ্দেশ্য ছিল- অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা ও উন্নত জীবনের স্বপ্ন।

ভিন দেশে মারা যাওয়া দুই 
ছেলের মরদেহ বাড়ি পৌঁছালে কান্নায় ভেঙে  পড়েন মা ইয়েলদা
ভিন দেশে মারা যাওয়া দুই ছেলের মরদেহ বাড়ি পৌঁছালে কান্নায় ভেঙে পড়েন মা ইয়েলদা

ইয়োভানি ও জাইরের মা ইয়েলদার মুখেও শোনা গেল একই কথা। তিনি বলেন, ‘ওরা জানত এই পথে ঝুঁকি আছে। কিন্তু অন্যরা এই পথে (টেক্সাসে) গিয়েছে, এমনকি আমাদের পরিচিত এক কিশোরীও, এটাই ওদের প্ররোচিত করেছে। একটি বাড়ির ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দাঁড় করানোর স্বপ্ন দেখতো ওরা। এজন্য এখানকার জুতার কাজ বাদ দিয়ে সেখানে (যুক্তরাষ্ট্রে) পাড়ি দিতে চেষ্টা করে।’

গ্রামবাসী জানান, তাদের ওখানে জুতা ও বুট জুতার উপরিভাগ তৈরি হয়। গ্রামের প্রায় সবাই এ কাজের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করেন। মারা যাওয়া তরুণদের এক চাচাতো ভাই বিবিসিকে জানিয়েছেন, সারা মাস কাজ করে তারা ১২০ ডলারের মতো আয় করতে পারেন। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ১২ থেকে ১৪ হাজার টাকা।

এতো অল্প উপার্জন হওয়ায় গ্রামের তরুণরা এ কাজ না করে ঝুঁকি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র পাড়ি দিতে চান। এভাবে অনেকেই স্বপ্ন নিয়ে বাড়ি ছাড়লেও ফেরেন লাশ হয়ে। কিন্তু তবুও এ যাত্রা থামছেই না।

বরং এই প্রবণতা দিন দিন আরও বেড়েই চলেছে। একই পরিবারের তিনজনের এভাবে মৃত্যুর পর গ্রামবাসী জানান, এখন হয়তো আপাতত কেউ এভাবে সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার ঝুঁকি নেবে না। তবে তাদের মধ্যে এই ভয় বেশি দিন কাজ করবে না। কারণ, কেউ দরিদ্রতাকে ভালোবাসে না। যখন স্বল্প আয় দিয়ে তাদের জীবন চলবে না, স্বচ্ছল জীবন যখন তাদের ডাকবে, তখন তারা আবারও ঝুঁকি নিয়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের চেষ্ট করবে।

জুয়ান ভ্যালেন্সিয়া নামের এক বৃদ্ধ যিনি জুতার ব্যবসা করতেন তিনি বলেন, উন্নত জীবনের আশায় গ্রামের তরুণরা যেভাবে বিদেশ পাড়ি দিচ্ছে, এভাবে চলতে থাকলে গ্রামটি একসময় জনমানবহীন হয়ে পড়বে।

তিনি মনে করেন, যদি এই অঞ্চলে বড় আকারের জুতার কারখানা স্থাপন না করা হয়, তবে তরুণদের থামানো যাবে না। নতুন করে কোভিড মহামারির কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক মন্দা তরুণদের অবৈধ অভিবাসী হতে আরও বেশি উৎসাহী করছে বলেও জানান তিনি।

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.
kalbela.com