‘স্বপ্নের নায়ক’ আজও সবার অন্তরে

সালমান শাহ।
সালমান শাহ।ছবি : সংগৃহীত

ঢালিউডে হ্যালির ধূমকেতুর মতো আবির্ভাব হয়েছিল নায়ক সালমান শাহর। অল্প সময়েই জয় করে নিয়েছিলেন ভক্তদের মন। ঢালিউডের সেই স্বপ্নের নায়ক সালমান শাহর আজ জন্মদিন।

১৯৭১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সিলেট নগরীর দাড়িয়াপাড়ায় তার জন্ম। বাবা কমরউদ্দিন চৌধুরী সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন, মা নীলা চৌধুরী করতেন রাজনীতি; একাধিকবার সংসদ নির্বাচনও করেছেন। একমাত্র ছোট ভাইয়ের নাম চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরান ইভান। শিশু বয়সেই অভিনয়ে যুক্ত হন সালমান।

১৯৮৫ সালে বিটিভির ‘আকাশ ছোঁয়া’ নাটক দিয়ে অভিনয়ে যাত্রা শুরু করেন সালমান শাহ। পরে দেয়াল (১৯৮৫), সব পাখি ঘরে ফিরে (১৯৮৫), সৈকতে সারস (১৯৮৮), নয়ন (১৯৯৫), স্বপ্নের পৃথিবী (১৯৯৬) নাটকে অভিনয় করেন। ‘নয়ন’ নাটকটি শ্রেষ্ঠ একক নাটক হিসেবে বাচসাস পুরস্কার লাভ করে। ১৯৯০ সালে মঈনুল আহসান সাবের রচিত উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ‘পাথর সময়’ ধারাবাহিক নাটকে অভিনয় করেন। এ ছাড়া ১৯৯৪ সালে অভিনয় করেন ইতিকথা ধারাবাহিকেও।

অনেক খোঁজাখুঁজির পর আমি সালমানকে পাই। তারপর তাকে ছয় মাসের প্রশিক্ষণ দিই নাচ-গান, ফাইট এবং অভিনয়ের ওপর।
সোহানুর রহমান সোহান, চলচ্চিত্র পরিচালক

চলচ্চিত্রে পা রাখার আগেই বিয়ে করেছিলেন সালমান শাহ। ১৯৯২ সালের ১২ আগস্ট সামিরার সঙ্গে বিয়ে হয় তার। তবে সামিরা ও সালমানের বিয়ে নিয়ে পরিবারে সৃষ্টি হয় নানা জটিলতার। সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী সামিরাকে ভালোভাবে গ্রহণ করতে পারেননি। শুরুতে পরিবারের সঙ্গে বসবাস করলেও মা নীলা চৌধুরীর সঙ্গে স্ত্রীর সম্পর্ক ভালো না থাকায় আলাদা বাসায় বসবাস শুরু করেন সালমান। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ইস্কাটনের বাসাতেই স্ত্রীর সঙ্গে কাটিয়েছেন।

সালমান শাহ ও মৌসুমী।
সালমান শাহ ও মৌসুমী।ছবি : সংগৃহীত

১৯৯২ সালে প্রযোজনা সংস্থা আনন্দমেলা ভারত থেকে তিনটি সিনেমার কপিরাইট নিয়ে আসে। সেই তিনটি সিনেমার জন্য তারা নতুন নায়ককে নিতে চায়। দায়িত্ব পড়ল পরিচালক সোহানুর রহমান সোহানের ওপর। তিনি হন্যে হয়ে খুঁজতে থাকলেন নতুন নায়ক। একসময় পেয়ে গেলেন ইমন নামের একটি ছেলেকে। মা নীলা চৌধুরীর অনুমতি নিয়ে ইমনকে নির্বাচিত করলেন সিনেমার জন্য। নাম পরিবর্তন করে রাখা হলো সালমান শাহ।

তিনি বলেন, ‘১৯৯২ সালের ৩১ আগস্ট কেয়ামত থেকে কেয়ামত মুভির মহরত হয়। আর প্রথম শুটিং শুরু করি ১৩ সেপ্টেম্বর। সালমান-মৌসুমীকে নিয়ে কাজ করতে খুব একটা সমস্যা হয়নি। কারণ বুঝতাম তাদের নিয়ে কীভাবে কাজ করতে হবে।’

সালমানের ব্যাপারে আমি একটা কথাই বলব, ন্যাচারাল অ্যাকটিং যেটা বলে সেটা ওর ভেতরে ছিল। দুজনই শুটিং করার সময় দুষ্টুমি করতাম। শুধু আমার সঙ্গেই নয়, সবার সঙ্গেই সে খুব বন্ধুভাবাপন্ন ছিল।

শাবনূর, চিত্রনায়িকা

১৯৯৩ সালের ২৫ মার্চ কেয়ামত থেকে কেয়ামত মুক্তি পায়। প্রথম সিনেমা দিয়েই দর্শকদের হৃদয় জয় করে নেন সালমান শাহ। ১৯৯৪ সালে ‘তুমি আমার’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে সালমান শাহর সঙ্গে জুটি বাঁধেন শাবনূর। প্রথম মুভিতেই ব্যাপক সফলতা পায় এ জুটি। সালমান-শাবনূর জুটির সফলতার দিকে তাকিয়ে পরিচালক প্রযোজকরা একের পর এক সিনেমায় নিতে থাকেন তাদের। সালমান অভিনীত ২৭টি সিনেমার ভেতরে ১৪টিতেই নায়িকা ছিলেন শাবনূর। এভাবেই বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতে সবচেয়ে সফল জুটি হিসেবে পরিচিতি পান এ দুজন।

শাবনূর বলেন, ‘সালমানের সঙ্গে আমার প্রথম মুভি “তুমি আমার”। তখন তো সে মৌসুমী আপুর সঙ্গে অভিনয় করত। শুটিংয়ের সময় মাঝেমধ্যে দেখতাম। আমি তখন ছোট ছিলাম। এতকিছু বুঝতাম না। একের পর এক মুভিতে ওর সঙ্গে অভিনয় করলাম। অনেক সিনেমা করার পর আমি বুঝতে শুরু করলাম, মানে ম্যাচিউরড হলাম। নিজেদের বোঝাপড়াটাও বাড়ল। ও কোন বিষয়টা কীভাবে ডেলিভারি দিচ্ছে আর আমি কোনটা কীভাবে ডেলিভারি দিচ্ছি, সেটা নিয়ে ভাবতাম। নিজেকে ঝালাই করে নিতাম।’

‘সালমানের ব্যাপারে আমি একটা কথাই বলব, ন্যাচারাল অ্যাকটিং যেটা বলে সেটা সালমানের ভেতর ছিল। দুজনই শ্যুটিং করার সময় দুষ্টুমি করতাম। শুধু আমার সঙ্গেই নয়, সবার সঙ্গেই সে খুব বন্ধুভাবাপন্ন ছিল, অনেক নম্র ছিল, আর্টিস্ট-ডিরেক্টরদের সঙ্গে কীভাবে কাজ করতে হবে তা বুঝত, তাদের সঙ্গে ভালোভাবে মিশতে পারত। অনেক মজার মানুষ ছিল। দেখা গেছে, মজা করতে করতে কখন যে শুটিং শেষ হয়ে গেছে তা বুঝতেই পারতাম না। সে যেমন হাস্যোজ্জ্বল ছিল, তেমনি অনেক চঞ্চলও ছিল। চটপটে ছিল বলে খুব দ্রুত কাজ করতে পারত। আমি ওর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পারতাম না। ও আমাকে মাঝেমধ্যেই তাড়া করত।’

সালমান ও শাবনূর।
সালমান ও শাবনূর।ছবি : সংগৃহীত

১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর। দিনটি ছিল শুক্রবার। এদিনই সালমান শাহ মারা যান। তার মৃত্যু নিয়ে নানা রহস্যের জাল বিস্তার হয় সে সময়। স্ত্রী সামিরা ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছিলেন, সালমান আত্মহত্যা করেছেন। তাকে ড্রেসিংরুমে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু পরিবারের দাবি তাকে হত্যা করা হয়েছে। ২৬ বছর ধরে চলছে সেই মামলা। সর্বশেষ ২০২০ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন-পিবিআই নতুন তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। পিবিআইর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, হত্যাকাণ্ড নয়, পারিবারিক কলহসহ নানা কারণে মানসিক যন্ত্রণায় বাংলা চলচ্চিত্রের অমর নায়ক সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছেন। সেই প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে সালমান শাহর পরিবার আপিল করেছে। সেই আপিলের নিষ্পত্তি এখনো হয়নি।

‘স্বপ্নের নায়ক’ ‘স্বপ্নের পৃথিবী’ থেকে বিদায় নিলেও আজও সালমান শাহ আছেন ভক্তদের ‘অন্তরে অন্তরে’। আছেন ঢাকাই সিনেমার ‘স্বপ্নের ঠিকানায়’। তাই আজকের দিনে ভক্তরা তাকে স্মরণ করছেন শ্রদ্ধাভরে।

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.
kalbela.com