বিতর্কিতদের ঢাবি ছাত্রলীগের হল কমিটিতে পদায়ন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ ছাত্রলীগের লোগো।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ ছাত্রলীগের লোগো।ছবি: সংগৃহীত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ক্যাম্পাস ও ক্যাম্পাস সংলগ্ন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ছিনতাই, যৌন নিপীড়ন ও ছাত্র নির্যাতনের মতো ঘটনায় অভিযুক্তদের হল কমিটিতে পদ দিয়েছে ছাত্রলীগ। এসব কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকায় বিতর্কিত এসব নেতার অনেককেই সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পদবঞ্চিত নেতাকর্মীরা।

পদবঞ্চিত কয়েকজন নেতাকর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কমিটিতে স্থান পাওয়া অনেকে ক্যাম্পাসে ছিনতাই, সাধারণ শিক্ষার্থীদের মারধরসহ নানা বিতর্কিত ঘটনার জন্ম দিলে তাদের সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়। এ ছাড়া তাদের মধ্যে অনেককে বিভিন্ন মেয়াদে বহিষ্কার করা হয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও। কিন্তু বিতর্কিত ও বহিষ্কৃত এসব নেতা ছাত্রলীগের হল শাখার সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকদের কাছের লোক হওয়ায় কমিটি ঘোষণার আগে সংগঠনের বহিষ্কারাদেশ তুলে তাদের কমিটিতে পদায়ন করা হয়েছে। এ বিষয়ে নীরব ভূমিকা পালন করেছে ঢাবি ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতারা।

এ বিষয়ে হল কমিটির পদবঞ্চিত এক নেতা বলেন, ‘আমি চার বছর ধরে হলের সব রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছি। আমার পুরো পরিবার আওয়ামী লীগের রাজনীতি করে। কিন্তু আমাকে হলের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক পদে মূল্যায়ন করা হয়নি। অথচ হলে অনেক বিতর্কিত লোককে পদায়ন করা হয়েছে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ ছাত্রলীগের লোগো।
বৃহস্পতিবার সারা দেশে ছাত্রদলের বিক্ষোভ

২০১৭ সালের ডিসেম্বরে ঢাবি শিক্ষার্থী এহসান রফিকের কাছ থেকে ক্যালকুলেটর ধার নেয় ছাত্রলীগের হল শাখার সহ-সম্পাদক ওমর ফারুক। কিন্তু ২০১৮ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ওমর ফারুকের কাছে এহসান ক্যালকুলেটর দাবি করলে তাকে কয়েক দফায় মারধর করা হয়। ওই সময় ঢিভি রুমে ডেকে নিয়ে এহসানকে শিবির অপবাদ দিয়ে তার মোবাইল ফোন পরীক্ষা করা হয়। কিন্তু কিছু না পেয়ে তার কাছ থেকে জোরপূর্বক শিবির স্বীকারোক্তি আদায় করে তাকে কয়েক দফায় মারধর করে তাকে হল গেটে বের করে দেয়। এ সময় হল গেটেও তাকে আরেক দফায় মারধর করা হয়। এক পর্যায়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেললে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে হল শাখার তৎকালীণ সভাপতি তাহসান আহমেদের (১৬ নম্বর) কক্ষে তথ্য প্রকাশ না করতে হুমকি দিয়ে আটকে রাখা হয়। মারধরের ঘটনায় জড়িত ছিলেন হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি তাহসান আহমেদ, সহসভাপতি আরিফ, সহসভাপতি তানিম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আনিম ইরতিজা শোভন ও আবু তাহের, সহ-সম্পাদক ওমর ফারুক ও রুহুল আমিন, সদস্য সামিউল ইসলাম সামী, আহসান উল্লাহ ও উপ-সম্পাদক মেহেদী হাসান হিমেল।

পরে এ ঘটনায় এহসান বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বরাবর লিখিত অভিযোগ দিলে তদন্তের পর মারধরের মূল হোতা ওমর ফারুককে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়। এ ছাড়া দুই বছরের জন্য বহিষ্কার করা হয় সামিউল ইসলাম সামি, আহসান উল্লাহ, রুহুল আমিন বেপারি, মেহেদী হাসান হিমেল ও ফারদিন আহমেদ মুগ্ধ। এ ঘটনায় প্ররোচণার দায়ে হল শাখা ছাত্রলীগের সহসভাপতি আরিফুল ইসলামকে এক বছরের জন্য বহিষ্কার করা হয়।

এদিকে, গত ১৪ অক্টোবর রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম (এসএম) হল শাখার পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়। এ কমিটিতে আলোচিত এহসান রফিকের নির্যাতনকারী আহসান উল্লাহকে এক নম্বর সহসভাপতি, ফারদিন আহমেদ মুগ্ধকে ৩ নম্বর সহসভাপতি, সামিউল ইসলাম সামিকে ৪ নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, রুহুল আমিন বেপারিকে ৫ নম্বর সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে। এ ছাড়াও কমিটিতে গেস্টরুমে শিক্ষার্থী নির্যাতনের অভিযোগ থাকা আল-ইমরানকে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, ইয়াসিন আরাফাত প্লাবনকে ৩ নম্বর সাংগঠনিক সম্পাদক, ইয়াসিন আল শাহিনকে ৯ নম্বর সাংগঠনিক সম্পাদক পদ দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া গত ২৪ মে ছাত্রদল নেত্রী মানসুরাকে মারধর ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে ছাত্রলীগের ৩৩ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়। মামলার আসামি মো. নাজিম উদ্দিন সাইমুনকে ১১ নম্বর সাংগঠনিক সম্পাদকের পদ দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে এসএম হল ছাত্রলীগের সভাপতি তানভীর সিকদার কালবেলাকে বলেন, ‘এটি অনেক আগের ঘটনা। কোনো শিক্ষার্থী বহিষ্কার থাকা অবস্থায় আমরা তাদের পদায়ন করিনি। তাদের বহিষ্কারাদেশ তুলে নেওয়ার পর আমরা পদায়ন করেছি। তারা ছাত্রলীগ করেছে। যোগ্যতা অনুযায়ী তাদের পদায়ন করা হয়েছে। তারা সংগঠনবহির্ভূত কাজ করেনি।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ ছাত্রলীগের লোগো।
আ.লীগের নির্বাচনী প্রচার শুরু হচ্ছে যশোর থেকে

শিক্ষার্থীদের মারধর করা সংগঠনবহির্ভূত কাজ কিনা, জানতে চাইলে তানভীর বলেন, ‘এ ঘটনা ঘটেছে আমার কমিটির আগে। আমি সভাপতি হওয়ার পর তাদের কোনো বহিষ্কারাদেশ ছিল না।’

চলতি বছরের মার্চে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আখলাকুজ্জামান অনিক ও মো. রাজীব আহমেদকে মারধর করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় একাত্তর হল ছাত্রলীগের কয়েকজন কর্মী। পরে মারধরের অভিযোগ প্রমাণিত হলে ছয় কর্মীকে হল থেকে স্থায়ী বহিষ্কার করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তবে, বহিষ্কৃত এই শিক্ষার্থীদের বহিষ্কারাদেশ চলমান থাকলেও তাদের পদায়ন করা হয়েছে হল কমিটিতে। ২৬ সেপ্টেম্বর ঘোষিত কমিটিতে বহিষ্কৃত শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাসফি-উর রহমানকে পরিকল্পনা ও কর্মসূচিবিষয়ক উপ-সম্পাদক, শফিউল্লাহ সুমনকে সংস্কৃতিবিষয়ক উপ-সম্পাদক, নাইমুর রশিদকে গণযোগাযোগ ও উন্নয়ন সম্পাদক, সাব্বির আল হাসান কাইয়ুমকে দুর্যোগ ও ত্রাণ ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, মোহাম্মদ ফিরোজ আলমকে উপ-প্রশিক্ষণবিষয়ক ও আবদুল্লাহ আল মারুফকে ছাত্রবৃত্তি উপ-সম্পাদক পদ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ছিনতাই করে—এমন কয়েকজনকে এ কমিটিতে স্থান দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ বিষয়ে বিজয় একাত্তর হল ছাত্রলীগের সভাপতি সজীবুর রহমান সজীব কালবেলাকে বলেন, ‘ওই ঘটনার পর উভয়পক্ষ মিলিত হয়ে হল প্রশাসন বরাবর ভুক্তভোগীরা লিখিত অভিযোগ দেয়, যেন তাদের বহিষ্কাদেশ তুলে নেওয়া হয় এবং তারা মিলিত হয়ে আমাদের কাছেও এসেছে। পরে আমরা তাদের কমিটিতে পদায়ন করেছি।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুষদ প্রাঙ্গণে প্রাকৃতিক ডাকে সাড়া দেওয়াকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতাকে মারধর করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যার এ এফ রহমান হলের ছাত্রলীগ কর্মী সামিউজ্জামান সামী। পরে এ ঘটনায় সামীকে ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়। তবে, হল কমিটি দেওয়ার কয়েকদিন আগে সেই বহিষ্কারাদেশ তুলে তাকে পদায়ন করেছে এফ আর হল ছাত্রলীগ। এ ছাড়া সামিউজ্জামান সামীর বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও এর আশপাশ এলাকায় ছিনতাইয়ের অভিযোগও রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ ছাত্রলীগের লোগো।
নেতিবাচক রাজনীতিতে বিএনপির পতন অনিবার্য : কাদের

এ বিষয়ে স্যার এ এফ রহমান হল ছাত্রলীগের সভাপতি রিয়াজুল ইসলাম বলেন, ‘সে দীর্ঘদিন ছাত্রলীগের রাজনীতি করেছে। এক পর্যায়ে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ তার কাজে সন্তুষ্ট হয়ে তার বহিষ্কারাদেশ তুলে নেওয়ার পর আমরা তাকে পদায়ন করেছি।’

চলতি বছরের ২ আগস্ট পলাশী থেকে ঢাবির টিএসসি যাওয়ার পথে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্মৃতি চিরন্তন চত্বরে মোটরসাইকেল আরোহী প্রজিত দাস নামে এক ব্যক্তিকে থামিয়ে মারধর এবং তার মোটরসাইকেল, মুঠোফোন ও ১৭ হাজার টাকা ছিনতাইয়ের অভিযোগ ওঠে বিশ্ববিদ্যালয়ের সূর্য সেন হলের ছাত্রলীগ কর্মী তুষার হোসেন ও শামীমুল ইসলামসহ আরও অজ্ঞাতনামা পাঁচ-ছয়জনের বিরুদ্ধে। পরে এ ঘটনায় ওই রাতেই ভুক্তভোগী প্রজিত দাস রাজধানীর শাহবাগ থানায় লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগে অভিযুক্তরা তাকে মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছেন বলেও তিনি জানান। পরে খবর পেয়ে ভুক্তভোগীর পরিচিত ছাত্রলীগের দুই কেন্দ্রীয় নেতা তাকে সেখান থেকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা করান।

গত মঙ্গলবার রাতে সূর্যসেন হল ছাত্রলীগের কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। কমিটিতে ছিনতাইয়ে অভিযুক্ত তুষার হোসেনকে সহসভাপতি ও শামীমুল ইসলামকে সাংগঠনিক সম্পাদক করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রশ্নফাঁস ও ছিনতাইয়ের ঘটনায় বহিষ্কৃত শেখ মারুফ হোসেন সুজনকে সহসভাপতি, শিক্ষার্থী নির্যাতনে বহিষ্কৃত মাহমুদ অর্পন সহসভাপতি পদে পদায়ন করা হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে সূর্যসেন হলের সভাপতি মারিয়াম সোহান খানকে (সোহান) ফোন দিলে তিনি প্রোগ্রামে আছেন জানান। সাধারণ সম্পাদকের সিয়াম রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

চলতি বছরের ১০ মার্চ রাতে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আবু তালিবকে গভীর রাতে ডেকে নিয়ে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করে বঙ্গবন্ধু হল ছাত্রলীগ কর্মী শেখ শান্ত আলম, ইমদাদুল হক বাঁধন, শাহাবুদ্দিন ইসলাম বিজয় ও নাহিদুল ইসলাম ফাগুন। ভুক্তভোগীকে অভিযুক্তরা হাতে না ধরে সিগারেটে আগুন ধরিয়ে মুখে দিতে বললে, ভুক্তভোগী না দিতে চাইলে তাকে একাধিকবার স্ট্যাম্প দিয়ে আঘাত করে। এ সময় ভুক্তভোগীর মা-বাবাকেও অকথ্য ভাষায় গালাগাল করা হয়।

মঙ্গলবার রাতে ঘোষিত কমিটিতে অভিযুক্তদের পদায়ন করা হয়েছে। কমিটিতে শেখ শান্ত আলমকে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, নাহিদুল ইসলাম ফাগুনকে আইন উপসম্পাদক, ইমদাদুল হক বাঁধনকে সাংস্কৃতিক উপসম্পাদক, আরিফুল হোসেন শুভকে স্কুল ছাত্র সম্পাদক করা হয়েছে।

এ ছাড়া এ কমিটিতে পল্লব রানা পারভেজ নামে একজনকে কর্মসংস্থান সম্পাদক করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, হয়রানি, ছিনতাই করে বলে অভিযোগ রয়েছে। ছিনতাইয়ের অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১ বছর বহিষ্কৃত করা হয়েছিল বলে জানা গেছে। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে ভুয়া ফেসবুক আইডি খুলে নারী শিক্ষার্থীদের যৌন হয়রানি করার অভিযোগ রয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘তাদের নামে অভিযোগ করা হলেও, তা প্রমাণিত নয়।’ এসব বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন বলেন, ‘যারা দীর্ঘদিন রাজনীতি করেছে, সবার কাছে গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে, তুলনামূলক ভালো ইমেজ, ভালো ছাত্রনেতা, তাদের পদ দেওয়া হয়েছে। তবে এর কোনো ব্যত্যয় থাকলে আমরা ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করব।’ এসব বিষয়ে জানতে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় ও সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্যকে একাধিকবার মোবাইল ফোনে কল করা হলেও তা রিসিভ হয়নি।

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.
kalbela.com