চব্বিশে জানুয়ারির ডাক : গণবিরোধী শক্তিকে রুখে দেওয়ার প্রত্যয়

চব্বিশে জানুয়ারির ডাক : গণবিরোধী শক্তিকে রুখে দেওয়ার প্রত্যয়

আজ ঐতিহাসিক ২৪ জানুয়ারি, আমাদের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসের একটি অবিস্মরণীয় দিন। ঊনসত্তরের ১৭ থেকে ২৪ জানুয়ারি—এই এক সপ্তাহ ছিল পাকিস্তানের সামরিক স্বৈরাচারী আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে নির্যাতিত জনগণের চরম বোঝাপড়ার সময়। একদিকে চরম গণবিরোধী শক্তিসমূহ তথা সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও একচেটিয়া পুঁজির প্রতিভূ স্বৈরাচারী আইয়ুব সরকার; অন্যদিকে ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক, মধ্যবিত্ত—এককথায় সমগ্র জনতা। ১৭ থেকে ২৪ জানুয়ারির রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের ভাগ্য চূড়ান্তরূপে নির্ধারিত হয়ে যায়। দশ বছরের বেশি সময় স্থায়ী আইয়ুবের নিষ্ঠুর স্বৈরাচারী শাসনের অনিবার্য পতন নিছক সময়ের প্রশ্নে পরিণত হয়।

১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি কারফিউ ভেঙে ছাত্ররা মিছিল বের করলে পুলিশের গুলিতে ছাত্রনেতা আসাদ নিহত হন। ২৪ জানুয়ারি ঢাকায় আবার মিছিল হয় এবং সেদিন পুলিশ গুলি করলে মতিউর রহমান মল্লিক নিহত হন। তার মৃত্যুর দিনটিকে আমাদের দেশে গণঅভ্যুত্থান দিবস হিসেবে পালন করা হয়।

ঊনসত্তরের একুশে ফেব্রুয়ারি স্বৈরাচার বিরোধিতায় নতুন মাত্রা যোগ করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত এক সভায় ‘ভাষাভিত্তিক জাতীয়তার সংগ্রাম’ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে দৃঢ় অভিমত ব্যক্ত করা হয়। গণঅভ্যুত্থানের প্রবল চাপে আইয়ুব খান ঘোষণা করেন যে, পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন না। একই দিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অভিযুক্তরা এবং নিরাপত্তা আইনে আটক ৩৪ জন নেতা মুক্তি পান। গণতন্ত্রের দাবিতে স্বৈরশাসনবিরোধী এ সংগ্রামে গ্রামগঞ্জের খেটে খাওয়া মানুষ তখন শুধু সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ উচ্চারণ করেই থেমে থাকেনি, বরং নিজ নিজ ক্ষমতা বলয়ে অধিষ্ঠিত শোষকশ্রেণি বা তাদের প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধেও সোচ্চার হয়ে ওঠে। অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে, বহু স্থানে কৃষকরা ছাত্রদের সহযোগিতায় বিভিন্ন ধরনের অপরাধীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে। বহু স্থানে ছাত্ররা কৃষকদের সহযোগিতায় নায়েব, তহশিলদার, পুলিশ, দারোগা, সার্কেল অফিসারদের বিচার করে গলায় জুতার মালা পরিয়ে ঘুরিয়েছে। এ ছাড়া শহরাঞ্চলে ক্ষমতা অপব্যবহারকারী সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের প্রকাশ শারীরিক আক্রমণ বা নথিপত্রাদি তছনছ এবং অফিসে অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে ঘটেছে। নিম্ন ও মধ্য আয়ের পেশাজীবীরা তাদের দীর্ঘদিনের অপূর্ণ দাবিদাওয়া উত্থাপন করেছেন এবং রাজপথে নেমে মিছিলে উচ্চকিত হয়েছেন, হাজার হাজার শ্রমিক তাদের ন্যূনতম অধিকার আদায় করার লক্ষ্যে ঘেরাও আন্দোলনকে কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন।

গণঅভ্যুত্থানের জোয়ারের মুখে টিকতে না পেরে শেষাবধি ২৫ মার্চ পাকিস্তানের ‘লৌহমানব’ প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ইয়াহিয়া খানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। সারা দেশে নতুন করে জারি হয় সামরিক শাসন, তবে প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে জনগণের প্রতিনিধি নির্বাচন এবং অচিরে দেশে পার্লামেন্টারি ব্যবস্থা চালু করার দাবি স্বীকৃত হয়। এ ছাড়া গ্রাম ও শহরাঞ্চলে শ্রেণি চেতনার উন্মেষ হয়। পাশাপাশি পূর্ববাংলার জনগণের মধ্যে আলাদা রাষ্ট্র গঠনের আকাঙ্ক্ষা বৃদ্ধি পায়। যার সর্বশেষ পরিণতি ৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে মহত্তর বিজয় অর্জন।

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.
logo
kalbela.com