তদন্তের খবরে জুয়াড়ি শেয়ারে পিছুটান

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ।ছবি : সংগৃহীত

অস্বাভাবিক শেয়ার দাম ও লেনদেনের ডামাডোলের মধ্যে শেয়ারবাজারে গুঞ্জন রটেছে, সাম্প্রতিককালে যেসব শেয়ারের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে, সেসব শেয়ারে অস্বাভাবিক কিছু ঘটেছে কিনা, তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি গঠন করছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।

এই গুঞ্জনে জুয়াড়িরা যেমন খুব সতর্কতার সঙ্গে লেনদেন করছে, বিনিয়োগকারীরাও সাবধানে পা ফেলছে। যে কারণে বাজারে লেনদেন শ্লথ হয়ে পড়েছে এবং শেয়ার দামের অস্বাভাবিক উত্থান-পতনও থেমেছে।

গত ২৮ জুলাই শেযারবাজারের পতন ঠেকাতে দ্বিতীয় দফায় ফ্লোর প্রাইজ আরোপ করে বিএসইসি। সেদিন লেনদেন শেষে প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক অবস্থান করছিল ৫ হাজার ৯৮০ পয়েন্টে। আট সপ্তাহ পর আজ সপ্তাহের শেষ কার্যদিবস বৃহস্পতিবার (২২ সেপ্টেম্বর) সূচক বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৫৬৪ পয়েন্টে। এই সময়ে সূচক বেড়েছে ৫৮৪ পয়েন্ট।

সূচকের এই বড় উত্থানের মধ্যেও ফ্লোর প্রাইজে থাকা ৩৪ কোম্পানি এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭২টিতে। অন্যদিকে, ৩০টির মতো জুয়াড়ি শেয়ারের দাম বেড়েছে চোখে পড়ার মতো। তারমধ্যে ৭-৮টি শেয়ারের দাম বেড়েছে লাগামহীনভাবে। কোনো কোনোটির দাম বেড়েছে দ্বিগুণ থেকে পাঁচগুণ পর্যন্ত।

অস্বাভাবিক শেয়ার দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় কিছু কোম্পানির বিরুদ্ধে শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি তদন্ত কমিটি গঠন করবে, এমন খবরে বুধবার শেয়ারবাজারে বড় পতন ঘটে। যদিও দিন শেষে তদন্ত কমিটি গঠনের কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। তবে আজ বৃহস্পতিবারও গুঞ্জনের রেষ থামেনি। যে কারণে আজ জুয়াড়ি শেয়ারগুলোতে সাবধানী আচরণ দেখা গেছে।

বিনিয়োগকারীরা বলছেন, গতকাল বুধবার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির নির্ধারিত সাপ্তাহিক বৈঠক ছিল। সেটাকে ঘিরেই বাজারে গুজব ছড়িয়ে পড়ে, যেসব কোম্পানির শেয়ারের দাম এক মাসে দু-তিন গুণ বা আরও বেশি বেড়েছে, সেগুলোর বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি করতে যাচ্ছে বিএসইসি। ঊর্ধ্বমুখী বাজারে তখন আচমকা পতন নেমে আসে। দিনশেষে বাজারে বড় পতন দেখা যায। আর গুঞ্জনের সুযোগটি গ্রহণ করে ওই শেয়ারগুলোর জুয়াড়িরা। তারা শেয়ারের কৃত্রিম চাহিদা তৈরি করে চড়া দামে তাদের শেয়ার ছেড়ে দিয়ে মুনাফা তুলে নেয়। এতে বাজারে শেয়ার বিক্রির চাপ বেড়ে যাওয়ায় বড় পতন হয়।

এদিকে, জুয়াড়ি শেয়ারগুলোর দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি লেনদেনেও বড় চমক দেখা যায়। এর ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার (২০ সেপ্টেম্বর) ডিএসইতে লেনদেন হয় ২ হাজার ৮৩২ কোটি ৩০ লাখ ৭৪ হাজার টাকা, যা চলতি বছরের তো বটেই, গত বছরের ৭ সেপ্টেম্বরের পর সর্বোচ্চ। আর ২০১০ সালের মহাধসের পর এটি ছিল সপ্তম সর্বোচ্চ লেনদেন।

বাজর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারে লেনদেনের বড় বিস্ফোরণ দেখিয়ে এক ধরনের ক্রেজ বা কৃত্রিম চাহিদা তৈরি করা হয়। এরপর বুধবার কারসাজিকারীরা বড় ধরনের সেল প্রেসার দিয়ে বাজারে বড় পতন ঘটায়। দিনশেষে পতনের কারণ হিসেবে তদন্ত কমিটি গঠনের গুঞ্জন রটানো হয়।

তারা বলছেন, আজ বৃহস্পতিবারও তদন্ত কমিটি গঠনের রেষ অব্যাহত থাকে। যে কারণে আজও লেনদেনে শ্লথ গতি দেখা যায়। বুধবার যেখানে লেনদেন হয়েছিল ১ হাজার ৮০৮ কোটি ১৯ লাখ ১২ হাজার টাকা, আজ সেখানে লেনদেন হয়েছে ১ হাজার ৬৬৬ কোটি ১৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বেশ কিছুদিন ধরে শেয়ারবাজার কয়েকটি কোম্পানিনির্ভর হয়ে পড়েছে। এসব কোম্পানির শেয়ারের লেনদেনেই মূল্যসূচকের উত্থান-পতন ঘটছে। শেয়ার কেনাবেচার বড় অংশ কয়েকটি কোম্পানির দখলে চলে যাওয়ায় তাদের লেনদেন কমলে বা বাড়লে এর প্রভাব গিয়ে পড়ে বাজারের সার্বিক লেনদেনে।

একটি ব্রোকারেজ হাউসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালবেলাকে বলেন, কয়েকটি শেয়ারের দাম গত এক মাসে বেড়ে দ্বিগুণ–তিন গুণ হয়ে গেছে। এসব শেয়ারে অনেকের বড় অঙ্কের মুনাফাও রয়েছে। বুধবার লেনদেন চলাকালে হঠাৎ বাজারে খবর ছড়িয়ে পড়ে, কয়েকটি কোম্পানির বিরুদ্ধে তদন্তে নামছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। তখন বড় বিনিয়োগকারীদের অনেকে শেয়ার বিক্রি করে মুনাফা তুলে নেয়।

বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত কয়েক দিন ধরে ডিএসইতে লেনদেন ও মূল্যবৃদ্ধিতে দাপুটে অবস্থানে রয়েছে বেক্সিমকো ও ওরিয়ন গ্রুপের কোম্পানিগুলো। এর মধ্যে ওরিয়ন গ্রুপের কোম্পানি ওরিয়ন ইনফিউশনের শেয়ারের দাম প্রায় সাড়ে তিন গুণ বেড়েছে। আর ওরিয়ন ফার্মার শেয়ারের দাম এক মাসে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এ ছাড়া সি পার্ল বিচ রিসোর্টের (রয়েল টিউলিপ) শেয়ারের দামও এক মাসে দ্বিগুণ বেড়েছে। এসব কোম্পানির এমন মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে বাজার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে নানা ধরনের সমালোচনা চলছে। তাই কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে বিএসইসির তদন্তে নামার গুজবে লেনদেনের গতি শ্লথ হয়ে যায়।

ডিএসইতে গত মঙ্গলবার ওরিয়ন ফার্মার রেকর্ড ৩২৭ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছিল, যা বুধবার কমে ২৩০ কোটি টাকায় নামে। আজ বৃহস্পতিবার আরও কমে দাঁড়ায় ১৯৫ কোটি ৪০ লাখ টাকায়।

একইভাবে কমেছে বেক্সিমকো লিমিটেডের লেনদেনের পরিমাণও। মঙ্গলবারের ৩৪২ কোটি ৫ লাখ টাকার লেনদেন বুধবার কমে দাঁড়ায় ২২৯ কোটি ৬৯ লাখ টাকায়। আজ আরও কমে দাঁড়িয়েছে ১৫২ কোটি ২৭ লাখ টাকায়।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফ্লোর প্রাইজ আরোপের পর গত ৩১ জুলাই থেকে শেয়ারবাজারে যে উত্থান শুরু হয়, তাতে বিনিয়োগকারীরা সন্তুষ্ট হতে পারতেন যদি এর সুফল শেয়ারবাজারে সমানভাবে পড়ত। কিন্তু অল্প কিছু শেয়ারের দর উড়তে থাকার মধ্যে বেশির ভাগ সিকিউরিটিজের দরপতন ঘটতে থাকে। এর মধ্যে হঠাৎ লেনদেন নিম্নমুখী নামতে থাকার কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বিভ্রান্তির সঙ্গে নতুন করে শঙ্কাও তৈরি হয়েছে।

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.
kalbela.com