ন্যানো প্রযুক্তিতে দেশের প্রথম সড়ক হচ্ছে সিলেটে

প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি

সিলেটে প্রথম ন্যানো প্রযুক্তির স্মার্ট সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই ন্যানো প্রযুক্তির মাধ্যমে দেশে সর্বপ্রথম সড়ক নির্মিত হচ্ছে বলে জানিয়েছে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর।

সংশ্লিষ্ট গবেষক ও প্রকৌশলীরা দাবি করেছেন, এর ফলে নির্মাণ খরচ কম হবে। পাশাপাশি বন্যায় সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত না হওয়া ও সড়কের নিরাপত্তাও নিশ্চিত হবে। সড়কের স্থায়িত্বও বাড়বে।

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) সিলেট জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ও দেশে ন্যানো টেকনোলজি গবেষণা দলের প্রধান প্রকৌশলী মো. ফজলে রাব্বি দৈনিক কালবেলাকে জানান, এ প্রযুক্তিতে একেবারে প্রথম পর্যায়ে সিলেট অঞ্চলের তিনটি সড়ক নির্মাণের একটি প্রকল্প প্রস্তাবনা ডিপিডি (ডেভেলপম্যান্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল) প্রণয়ন করা হয়েছে। এ প্রযুক্তিতে ৪৮ দশমিক ৫৭ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৯৮৫ কোটি টাকা। সম্প্রতি এ প্রস্তাবনা সওজের প্রধান প্রকৌশলী বরাবর প্রেরণ করেছে সিলেট সড়ক জোন। প্রস্তাবনা অনুমোদন পেলে এটি হবে এই ন্যানো প্রযুক্তিতে তৈরি দেশের প্রথম কোনো প্রকল্প।

এ প্রযুক্তিতে সিলেট সড়ক বিভাগের আওতাধীন মৌলভীবাজার-রাজনগর-ফেঞ্চুগঞ্জ-সিলেট, কুলাউড়া (ব্রাহ্মণবাজার)-মৌলভীবাজার এবং হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ-হবিগঞ্জ সড়ক নির্মাণের প্রস্তাব প্রেরণ করা হয়েছে।

অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. ফজলে রাব্বি আরও বলেন, ‘এ প্রকল্পের নাম দেওয়া হয়েছে টেকসই ও সাশ্রয়ী সড়ক নির্মাণ বিষয়ে আধুনিক উপকরণ-(অ্যাক্রিলিক পলিমার, স্টিল ফাইবার, স্টিল স্ল্যাগ) ব্যবহার করে গবেষণার ভিত্তিতে প্রাপ্ত সড়ক নির্মাণ কৌশল প্রয়োগ করে সিলেট জোনের বিভিন্ন সড়ক উন্নয়নের পাইলট প্রকল্প।’ টেকসই পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, প্রকল্প এলাকার আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, শিল্প উন্নয়ন ও এর মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্মার্ট প্রযুক্তি ও শিল্পায়নজনিত দুর্ভোগ লাঘবই এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। তিনি বলেন, প্রকল্পের আওতায় চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের পণ্য অ্যাক্রিলিক পলিমার ব্যবহার করে আধুনিক সড়ক বাঁধ, স্টিল ফাইবার ব্যবহার করে অত্যাধুনিক কংক্রিট পেভমেন্ট এবং স্টিল স্ল্যাগ ব্যবহার করে সড়কের সারফেসিং করা হবে।

অ্যাক্রিলিক পলিমার ব্যবহার করে নির্মিত সড়কের ভিত্তি সম্পূর্ণ পানিরোধী হওয়ায় বন্যার কারণে সড়ক পানিতে নিমজ্জিত থাকলেও সড়কের ভিত্তি কোনোরূপ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। স্টিল ফাইবার ব্যবহার করে কংক্রিট পেভমেন্ট নির্মাণ করলে এর স্থায়িত্ব হবে কমপক্ষে ৫০ বছর।

স্টিল স্ল্যাগ দেশের লৌহ নির্মাণ শিল্পের একটি উপজাত-যা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। ফলে সড়ক নির্মাণে এর ব্যবহার একদিকে যেমন সড়ক মজবুত ও টেকসই করবে; অন্যদিকে পরিবেশ দূষণ হতে রক্ষা পাবে। পাশাপাশি পাথর কুচি থেকে স্টিল স্ল্যাগের মূল্য তুলনামূলক কম।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এআরআই) সহকারী অধ্যাপক কাজী সাইফুন নেওয়াজ গণমাধ্যমকে জানান, অনুমোদন পেলে সিলেটের এ প্রকল্পটিই হবে ন্যানো প্রযুক্তিতে নির্মিত দেশের প্রথম কোনো প্রকল্প। অ্যাক্রিলিক পলিমার-এ নির্মিত সড়কের নির্মাণ খরচ কম এবং এ প্রযুক্তি রোড সেইফটি নিশ্চিত করবে বলে তার মন্তব্য। বিশেষ করে রাতের বেলা গাড়ি চলাচলের ক্ষেত্রে অ্যাক্রিলিক পলিমারে নির্মিত সড়ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে বলে জানান তিনি।

সওজের প্রধান প্রকৌশলী মো. ইসহাক জানান, তিনি এ পদে নতুন যোগদান করেছেন। এ বিষয়ে তিনি খোঁজ খবর নেবেন বলে জানান।

প্রকল্প প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০৪১ সালের মধ্যে ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশ রূপান্তরের জন্য নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন এবং বাঙালি জাতিকে সর্বক্ষেত্রে স্মার্ট হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। সেই আলোকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিভিন্ন বক্তব্যে সবসময় উদ্ভাবনী গবেষণার তাগিদ দেন।

এতে আরও বলা হয়, বর্তমানে পশ্চিমা বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে ন্যানো টেকনোলজি ব্যবহার করে স্বাস্থ্য খাতে স্মার্ট মেডিসিন (ওষুধ) তৈরি হচ্ছে; তেমনি সড়ক নির্মাণেও এমন সব নতুন নতুন উপকরণ ব্যবহার করা হচ্ছে- যা ন্যানো টেকনোলজিতে কাজ করে এবং ফল হিসেবে কাঠামোগত শক্তি বৃদ্ধি পায় এবং টেকসই হয়। তাই, স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে সড়ক সেক্টরেও আধুনিক উপকরণ এবং ন্যানো টেকনোলজি ব্যবহার শুরু করা প্রয়োজন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে অ্যাক্রিলিক পলিমার, স্টিল ফাইবার, স্টিল স্ল্যাগ নিয়ে একটি গবেষণা পরিচালনা করা হয়।

প্রকল্প প্রস্তাবনায় আরও বলা হয়, গেল বছরের ১৪ জুলাই সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সচিব এবিএম আমিন উল্লাহ নূরীর সভাপতিত্বে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় অ্যাক্রিলিক পলিমার ব্যবহার সংক্রান্ত গবেষণা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয় এবং সওজকে প্রযুক্তি নিয়ে এগিয়ে যেতে বলা হয়েছে। সেই আলোকে স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে সহায়তা করতে ৪র্থ শিল্প বিপ্লবের পণ্য তথা আধুনিক যুগের সাথে তাল মিলিয়ে নতুন উপকরণ ব্যবহার সড়ক নির্মাণ কৌশলের মাধ্যমে প্রকল্প প্রস্তাব প্রস্তুত করা হয়েছে।

যেসব দেশে অ্যাক্রিলিক পলিমার ব্যবহৃত হচ্ছে

নির্মাণ বিশেষজ্ঞরা বলেন, অ্যাক্রিলিক পলিমার বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ব্যবহার করা হচ্ছে। ভারত এবং ভুটানও রাস্তা নির্মাণের জন্য এটি ব্যবহার করা শুরু করেছে। ভারতীয় সেনাবাহিনী সফলভাবে কাশ্মীরের দুর্গম ও পাহাড়ি লাদাখ অঞ্চলে এবং বাংলাদেশের সীমান্ত বরাবর শিলিগুড়িতে কে.৩১ এপিএস ব্র্যান্ডের অ্যাক্রিলিক পলিমারের সফল ব্যবহার করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী প্রথমে পণ্যটি তৈরি করে, যা মার্কিন সামরিক এবং বিমান বাহিনী পরবর্তীতে তাদের দেশে এবং অন্যত্র ব্যবহার করা শুরু করে বলে গবেষকরা জানান।

প্রযুক্তিটি যেভাবে কাজ করে

প্রযুক্তিটির কৌশল ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রকৌশলী রাব্বি বলেন, ‘সনাতন পদ্ধতিতে ইট ও পাথর কুচি সড়কের ভিত্তি ও উপ-ভিত্তি নির্মাণের প্রধান উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তবে প্রস্তাবিত প্রক্রিয়ায় কোনো পাথর বা ইটের প্রয়োজন হবে না।’

তিনি বলেন, নতুন প্রযুক্তি ইট পোড়ানোর প্রক্রিয়া বাদ দিয়ে বাংলাদেশের বায়ুু দূষণরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তিনি বলেন, রাসায়নিক বিক্রিয়াটি একটি বিশেষ স্তর তৈরি করার জন্য একটি ন্যানো-পলিমারাইজড গ্রিড তৈরি করে, যা রাস্তার ভিত্তি (বেজ এবং সাব-বেজ) প্রথাগত সড়ক অবকাঠামোর চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী করে তোলে।

তিনি বলেন, অ্যাক্রিলিক পলিমার ব্যবহার করা হলে আমদানি করা পাথরের চাহিদা ব্যাপকভাবে কমে যাবে এবং রাস্তা নির্মাণে প্রয়োজনীয় উপকরণের ৭০ শতাংশ দেশীয় হওয়ায় বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.
logo
kalbela.com