বগুড়ায় হুমকিতে ২৫ খালের জীবন

বগুড়ার শাজাহানপুরের বুড়ির ভিটা খালের অস্তিত্বও টিকিয়ে রাখা যাচ্ছে না।
বগুড়ার শাজাহানপুরের বুড়ির ভিটা খালের অস্তিত্বও টিকিয়ে রাখা যাচ্ছে না। ছবি : কালবেলা

বগুড়ায় দখল-দূষণে ২৫ খালের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছে। বিল থেকে উৎসারিত এসব খাল বিলীন হতে চলেছে। নিকট অতীতে যে খালগুলো ছিল জলাবদ্ধতা দূরীকরণ, স্থানীয় পদ্ধতির সেচ এবং মাছের আধার, সেই খালগুলো দখল-দূষণে এবং ময়লা-আবর্জনা ফেলায় প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়ে হারিয়ে যাচ্ছে। যদিও খাল রক্ষার সরকারি প্রতিষ্ঠান বলছে, ১৭ কোটি ২৪ লাখ টাকা ব্যয়ে ১০টি খাল ঠিকাদারের মাধ্যমে খনন করা হয়েছে। আরও ২০টি খাল খননের জন্য প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে মন্ত্রণালয়ে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) থেকে খালের যে তালিকা পাওয়া যায়, সেখানে ২৫টির নাম আছে। এগুলো আঁকাবাঁকা পথে ৭ থেকে ১৭ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত। এ খালগুলো দেখে মনেই হয় না একদা বড় জলাশয় ছিল। কোনো খালের উৎসমুখে এবং ভেতরে মাটি ফেলে দখল করা হয়েছে। এ খালগুলো মরে গেছে। কোনো খাল দখলের প্রক্রিয়ায় চলে যাচ্ছে। এসব খাল দেখভালকারী প্রতিষ্ঠান জেলা প্রশাসন, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ এবং পানি উন্নয়ন বোর্ড নীরব দর্শক হয়ে আছে।

বগুড়া সদরের নুরইল বিল থেকে উৎসারিত সামুজা খাল বয়ে গেছে তিন কিলোমিটার এলাকায়। এরপর করতোয়া নদীতে মিশেছে। বগুড়া শহরের উত্তর দিকে বয়ে যাওয়া ইতিহাস খ্যাত সুবিল খালটি পৌরসভার দুই ওয়ার্ড এবং ইউনিয়ন পরিষদের অন্তত ৭ কিলোমিটার এলাকায় প্রবাহিত হয়েছে। এই খালের দুই পাড়ের অর্ধেকের বেশি দখল হয়ে ব্যক্তি মালিকানায় অবকাঠামো গড়ে উঠেছে। বাকি অংশ ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে।

মালগ্রাম বিল থেকে বের হওয়া খালটির একই গতি। এই খাল আর এখন চেনা যায় না। খালকে ঘিরে যে নয়নজুলি হয়েছিল, তাও উধাও হয়ে গেছে। এই খালের অন্যতম একটি অংশ শহরের ঠনঠনিয়া পশ্চিমপাড়া হয়ে শাজাহানপুর উপজেলার ফটকি এলাকা দিয়ে প্রায় ১৭ কিলোমিটার বয়ে করতোয়ায় মিশেছে। ফটকি এলাকায় খালটি ফটকি নামেই পরিচিত।

বগুড়ার শাজাহানপুরের বুড়ির ভিটা খালের অস্তিত্বও টিকিয়ে রাখা যাচ্ছে না।
ফুটপাত আটকে ট্রাফিক বক্স, বৈধতা নিয়ে দ্বন্দ্ব

একদা বিরাট এই খাল এখন আর চেনা যায় না। আশপাশের প্রবীণরা জানেন, এটি তাদের খাল ও খাঁড়ি ছিল। শুকনো মৌসুমে এই খালের পানি স্থানীয় পদ্ধতিতে চৌর দিয়ে জমিতে সেচ দেওয়া হতো। বর্ষায় এই খালের মাছ স্থানীয় লোকজনের মাছের চাহিদা মেটাত। প্রাচীন এই খালের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা যাচ্ছে না।

অন্য খালগুলোর পরিচিতি হলো নাগরজানি খাল, কালাইহাটা খাল, পেঁচিবাড়ি খাল, পদ্মাবতী খাল, ভদ্রাবতি খাল, গোবরধন খাল, কুতুবপুর খাল, কৃষ্ণপুর খাল, তারাশির খাল, চিকাবালা খাল বারোমাসি খাল, গেন্দাখালি খাল, শিলাইদহবাড়ি খাল, নাদান খাল, দারা খাল, রঞ্জিতপুর খাল, নিমতলী খাল, চামরুল খাল, জামালপুর রেগুলেটর খাল, দিবাহারি খাল, এবসি খাল, ইএফ খাল। এই খালগুলোর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। এলাকার লোকজন বলেন, খালগুলো বর্ষায় কিছুটা ভরে ওঠে। তারপর শুকনো মৌসুমে একেবারে মনে হবে ঢালু কোনো সড়ক।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, ২০১৮-১৯ এবং ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১০টি খাল ঠিকাদারের মাধ্যমে খনন করা হয়েছিল। ব্যয় হয় ১৭ কোটি ২৪ লাখ টাকা। শ্যাওড়া বিল নামক প্রকল্পে বগুড়া শহরের সুবিল খাল, মালগ্রাম বিল ও করতোয়া নদী খনন, তীর সংরক্ষণ, পাড় মেরামত করার জন্য একটি প্রস্তাবনা ওপর মহলে পাঠানো হয়েছে। বাকি খালগুলোর অবস্থান দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে দখলদার উচ্ছেদ করে খাল উদ্ধারে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার কোনো উদ্যোগ নেই।

বগুড়ার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক উজ্জ্বল কুমার ঘোষ জানান, গত ২২ জানুয়ারি করতোয়ায় নদী রক্ষা কমিটির মাসিক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় জানানো হয়, জেলার ১১টি খালের পুনঃখনন কাজ শেষ। নতুন করে আরও ২০টি খাল পুনঃখননে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়াও নদীতে ময়লা-আবর্জনা ফেলা বন্ধে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ময়লা ফেলা বন্ধে হাট-বাজারের লোকদের জরিমানা করা হবে বলে জানিয়েছেন কমিটির সদস্যরা। স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) ২০০৯-এর আইনের আওতায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহযোগিতায় এই অভিযান পরিচালনা করবে ভ্রাম্যমাণ আদালত। নদীর নাব্য ফিরিয়ে আনার কর্মসূচির অগ্রগতি নিয়ে আলোচন হয়। এতে জানানো হয়, বাঙ্গালী নদীর খনন কাজের ৭৭ শতাংশ সম্পূর্ণ হয়েছে। সারিয়াকান্দি ও ধুনট উপজেলার মধ্য দিয়ে মরাবাঙ্গালী নদীর সাড়ে ৩৩ কিলোমিটার খনন কাজ চলমান।

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.
logo
kalbela.com