ঘুষ না দেওয়ায় বকেয়া না দিয়েই চাকরিচ্যুত ১৮

নারায়ণগঞ্জে সিভিল সার্জন কার্যালয়।
নারায়ণগঞ্জে সিভিল সার্জন কার্যালয়। পুরোনো ছবি

নারায়ণগঞ্জে সিভিল সার্জনের অধীন বিভিন্ন হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মচারী নিয়োগে অর্থ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। ৬০টি পদের মধ্যে ১৮ জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। তাদের জায়গায় সমসংখ্যক নতুন কর্মীকে এক বছরের জন্য অস্থায়ী নিয়োগ দেওয়া হয়। তাদের কাছ থেকে জনপ্রতি ১ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। পুরোনো ৪২ জন টাকা দিতে পারায় পদে বহাল রয়েছেন।

সিভিল সার্জন কার্যালয়ের হিসাবরক্ষক নূরে আলম ও ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান পিমা অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেড এর সঙ্গে জড়িত বলে জানা গেছে। বেশ কয়েক মাসের বেতন বকেয়া রেখেই চাকরিচ্যুত হওয়া ওই ১৮ জন পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

চাকরিচ্যুতরা হলেন—মো. রাজু, রিটন দত্ত, এআর ইয়াসমীন, দ্বীন ইসলাম, পারভীন, সালাম, তুফান, সাইফুল, আবু রায়হান, মো. রবিউল ইসলাম, রিদম আহমেদ, মাসুদ, উজ্জ্বল, সুমি আক্তার, রুবেল, হাসান, শাকিল মিয়া ও আখলিমা। এরা সবাই চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী। তারা পিমা অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেডের মাধ্যমে গত ৫ বছর ধরে অস্থায়ী ভিত্তিতে সিভিল সার্জনের অধীন বিভিন্ন হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়োজিত ছিলেন। তাদের মাসিক বেতন ১৬ হাজার ৫০০ টাকা। সরকারি তহবিল সংকটে দীর্ঘদিন তাদের বেতন বন্ধ ছিল।

তাদের অভিযোগ, অস্থায়ী এই চাকরি নবায়ন করতে সিভিল সার্জন কার্যালয়ের হিসাবরক্ষক নূরে আলমকে বছরে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়। কিন্তু বছরে তারা বেতন পান ১ লাখ ৯৮ হাজার টাকা। এই টাকা থেকে নূরে আলমের চাহিদামতো দিয়ে তাদের হাতে প্রায় কিছুই থাকে না।

এ বছর নূরে আলম চাকরিচ্যুত কারও কাছে ১ থেকে ২ লাখ টাকা দাবি করে। দিতে না পারায় ওই ১৮ জনকে চাকরিচ্যুত করে নতুনদের টাকার বিনিময়ে নিয়োগ দেয়। নতুনদের মধ্যে ১০ জন হিসাবরক্ষক নূরে আলমের এবং বাকি ৮ জন ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান পিমা অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেডের।

চাকরিচ্যুত মো. রবিউল ইসলাম বলেন, ‘আমি ৫ বছর ধরে বন্দর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ওয়ার্ডবয়ের কাজ করছি। আমাদের চাকরি প্রতিবছর নবায়ন করতে হয়। নূরে আলম চাকরি নবায়নের নামে আমাদের কাছ থেকে অনেক টাকা দাবি করে। এ বছর তার চাহিদামতো ২ লাখ টাকা দিতে না পারায় আমাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। আমি এখনো ৮ মাসের বেতন পাওনা।’

একই অভিযোগ করেন সোনারগাঁ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ল্যাবরেটরিতে কাজ করা সুমি আক্তার। তারও ৮ মাসের বেতন বকেয়া। গত ১৮ নভেম্বর তিনি অফিসে গিয়ে জানতে পারেন তার জায়গায় নতুন নিয়োগ হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমাকে কেন বাদ দিল তা জানি না। জানতে পেরেছি, আমার জায়গায় নতুন এক লোক আড়াই লাখ টাকা দিয়ে নিয়োগ পেয়েছেন।’

সিভিল সার্জন অফিসের একটি সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অস্থায়ী ভিত্তিতে জনবল নিয়োগ হয়। পুরোনোরা অভিজ্ঞ হওয়ায় তাদেরই পুনর্বহালে প্রাধান্য দেওয়া হয়।

অভিযোগের বিষয়ে মো. নূরে আলম বলেন, ‘চাকরি দেওয়া কিংবা নেওয়ার ক্ষমতা আমার নেই। সরকারি হাসপাতালগুলোতে ঠিকাদাররা প্রয়োজনীয় জনবল সরবরাহ করেন।’ তিনি তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেন।

পিমা অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেডের পরিচালক বাকের হোসেন বলেন, ‘টাকার জন্য নয়, কাজে ত্রুটি থাকায় তাদের চাকরি নবায়ন করেনি সিভিল সার্জন অফিস। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আমাকে শুধু বলেছে, এ কজনকে পরিবর্তন করতে হবে। তাদের চাহিদা অনুসারে আমরা কর্মী পরিবর্তন করে দেই। এখানে কোনো অনিয়ম নেই।’

নারায়ণগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. আবুল জাহের মো. মশিউর রহমান বলেন, ‘নূরে আলম চাকরি দিবে কোথা থেকে? তার কাছে কোনো চাকরি আছে? সরকারি হাসপাতালগুলোতে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ হয়। ঠিকাদার আমাদের লোকের তালিকা দেয়। আমরা একটা মৌখিক পরীক্ষা নিয়ে যোগ্যতাসম্পন্নদের নিয়োগ দেই। নূরে আলমের এখানে কোনো ভূমিকা নাই।’

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.
kalbela.com