কবি নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাস্থ্য সচেতনতায় ‘কালমেঘ’

বিজয় ম্যারাথন আয়োজনের দিনের একটি চিত্র।
বিজয় ম্যারাথন আয়োজনের দিনের একটি চিত্র। ছবি : সংগৃহীত

প্রতিদিন খুব সকালে হু হা শব্দে আবাসিক ডরমিটরিতে থাকা অনেক শিক্ষক আর হলে থাকা অনেক শিক্ষার্থীর ঘুম ভাঙে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। সবাই আবার পাল্টা হু হা শব্দ করে তাদের ঘুম থেকে উঠে বের হওয়া নিশ্চিত করেন।

একে একে সবাই এসে জড়ো হয় ক্যাম্পাসের নজরুল ভাস্কর্যের সামনে। শুরু হয় দৌড়। বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন রাস্তা ধরে এক থেকে দুই কিলোমিটার রাস্তা দৌড়ে এসে আবার সবাই একত্রিত হয় বিবিএ ভবন, বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য কখনো বা চারুদ্বীপের ছোট খাটো জিমনেসিয়ামে।

বলছিলাম জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শরীরচর্চাবিষয়ক সংগঠন ‘কালমেঘ’-এর কথা। একটা ওষুধি গুণসম্পন্ন গাছের নামে নামকরণ করা হয়েছে সংগঠনটির।

বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের সহযোগী অধ্যাপক দ্রাবিড় সৈকত ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠা করেন কালমেঘ নামের এই সংগঠনটি। প্রথম প্রথম তিনি একা একাই ভোরে ঘুম থেকে উঠে হাঁটতেন, দৌড়াতেন। তারপর ধীরে ধীরে যুক্ত হয় অনেক শিক্ষক, কর্মকর্তাসহ সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা। বর্তমানে এই সংগঠন বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা বৃহৎ পরিবার।

সংগঠনে সাবেক, বর্তমান, নিয়মিত, অনিয়মিত মিলিয়ে রয়েছে প্রায় ৫০০ জন সদস্য। সাংগঠনিকভাবে রয়েছে আলাদা আলাদা পাঁচটি সেক্টর। প্রতিটা সেক্টরে একজন সেক্টর কমান্ডারসহ রয়েছেন কমান্ডার প্রধান। সেক্টর কমান্ডার প্রধানের দায়িত্ব হচ্ছে সব সেক্টর কমান্ডারদের ফোন দিয়ে ঘুম থেকে জাগিয়ে দেওয়া। আবার সব কমান্ডারদের দায়িত্ব হচ্ছে তার আওয়াত সকালে যারা ব্যায়ামে আসেন তাদের জাগিয়ে দেওয়া। কমান্ডার প্রধানসহ সেক্টর কমান্ডার যারা ফোন দিয়ে ঘুম ভাঙায় তাদের কারও ফোন রিসিভ করা দণ্ডনীয় অপরাধ। যদি কারও ব্যক্তিগত সমস্যা থাকে তাহলে কমান্ডারের ফোন কেটে দিয়ে তাকে ফোন দিয়ে তার ব্যক্তিগত সমস্যা জানিয়ে তার অনুউপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। কারণ সে যদি আসতে দেরি করে বাকি পুরো টিম তার জন্য অপেক্ষা করে।

কালোমেঘ সদস্যদের শরীরচর্চা।
কালোমেঘ সদস্যদের শরীরচর্চা।ছবি : সংগৃহীত

প্রাথমিক দৌড় শেষ করে এসে সুবিধামতো জায়গা বিবিএ ভবন, বঙ্গবন্ধু ভাস্কর্য কিংবা চারুদ্বীপের জিমনেসিয়ামে চলে ব্যায়াম, যোগ ব্যায়ামসহ আত্মরক্ষার বিভিন্ন কৌশল। আত্মরক্ষার অনুশীলনে মেয়েদের উপস্থিতিও লক্ষ্যণীয়। ততক্ষণে পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠে যায়—এবার চলে সূর্যের দিকে মুখ করে লাইনে দাঁড়িয়ে সূর্যশক্তির বন্দনা। বন্দনা শেষে সেক্টর কমান্ডাররা তাদের আওতায় সৈন্য যারা আসছেন তাদের নিয়ে চলে যান প্রকৃতি থেকে বিভিন্ন ঘাস, লতাপাতা সংগ্রহ করতে। তালিকায় থাকে পাঁচ রকম গাছের পাতা।

একটা টিম চলে আসে চক্রবাক ক্যাফেতে। এখানে চলে নাস্তার প্রস্তুতি। সবার ঘাস, লতাপাতা সংগ্রহ হয়ে গেলে ক্যাফেতে এসেই জড়ো হন। সেখানে লতাপাতা পরিষ্কার করে সবাই ফ্রেশ হয়ে নাস্তার জন্য প্রস্তুত হন। নাস্তার তালিকায় থাকে, আমলকী, হরীতকী, থানকুনি, আমপাতা, বটপাতা, তেঁতুলপাতা, তুলসীপাতা, কালমেঘের পাতাসহ ছোলা, বাদাম, খেজুর, কিসমিস, কালোজিরাসহ নানা রকমের খাবার। যে খাবারগুলোর আবার রয়েছে কালমেঘের ভাষায় আলাদা আলাদা নাম।

যেমন কিসমিসের নাম ঝিঁঝিঁ পোকা, হরীতকীর নাম ওল্ড পাওয়ার। টিমের সবাই খাবারগুলোকে কালমেঘের দেওয়া নামেই ডাকতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। টিমে নতুন যিনি যুক্ত হন, তাকে বরণ করা হয় কালমেঘের পাতা খাইয়ে। এভাবে প্রতিদিন সুন্দর একটা সকালের সমাপ্তি হয় কালমেঘের সদস্যদের।

সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা দ্রাবিড় সৈকত বলেন, ‘প্রতিটা মানুষের নিজের সম্পদ হলো তার শরীর। শরীরকে ঠিক রাখার জন্য ভোরে ঘুম থেকে ওঠা এবং রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমাতে যাওয়ার গুরুত্ব অপরিসীম। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েই একজন শিক্ষার্থী নানা রকম মানসিক চাপে থাকেন, সমাধান না পেয়ে অনেকে নেশায় আসক্ত হন। একজন মানুষ যদি তার শরীর নিয়ে সচেতন হন, নিয়মিত শরীরচর্চা করেন তাহলে সে কোনো দিনই নেশায় আসক্ত বা মানসকি চাপে থাকবেন না। আর মেয়েরা অনেক জায়গায় নিরাপত্তায় ভোগেন। একটা মেয়ে যখন নিয়মিত ব্যায়াম করবেন, আত্মরক্ষার কৌশল জানবেন, তখন তার মধ্যে আত্মবিশ্বাস বেড়ে যাবে। মেয়েদের কালমেঘে প্রশিক্ষক দিয়ে আত্মরক্ষার কৌশল শেখানো হয়। মেয়েদের উপস্থিতিও ভালো।’

গত ১৬ ডিসেম্বর সমগ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শরীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতন করতে কালমেঘ আয়োজন করে ‘কালমেঘ বিজয় ম্যারাথন ২০২২’ নামে এক দৌড় প্রতিযোগিতার।

কালমেঘ সদস্যদের নাস্তার আয়োজন।
কালমেঘ সদস্যদের নাস্তার আয়োজন। ছবি : সংগৃহীত

বিজয় দিবস সকালে অনুষ্ঠিত এই কোয়ার্টার ম্যারাথন প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী এবং সাধারণ শিক্ষার্থীসহ ১০৮ জন প্রতিযোগী। ময়মনসিংহ, ঢাকাসহ বিভিন্ন পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করেছিলেন এ ম্যারাথনে। সকাল ৭টা ৪৫ মিনিটে জয়ধ্বনি মঞ্চের সামনে থেকে শুরু হয়ে কলা ভবনের সামনে দিয়ে জয় বাংলা চত্বর হয়ে ঢাকা ময়মনসিংহ মহাসড়ক জিরোপয়েন্ট গিয়ে আবার ফেরত এসে জয়ধ্বনি মঞ্চের সামনে শেষ হয়। দূরত্ব ছিল ১০.৫ কিলোমিটার।

ছেলে এবং মেয়ে দুই ক্যাটাগরিতে মোট ছয়জন প্রতিযোগী ১ম, ২য় এবং ৩য় স্থান অর্জন করেন। ছেলেদের মধ্যে প্রথম স্থান অর্জন করেন একাউন্টিং এন্ড ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগের শিক্ষার্থী সারোয়ার আলম, দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থী সিয়াম মল্লিক, তৃতীয় স্থান অর্জন করেন ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের শিক্ষার্থী রাসং মৃ।

প্রায় ৪০ জন মেয়ে প্রতিযোগী অংশ নেয় ম্যারাথনে। এর মধ্যে প্রথম ও দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থী পাপিয়া চাকমা ওয়াংজা, অনন্যা হোড় এবং তৃতীয় স্থান অর্জন করেন ফিল্ম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী ইশরাত জাহান তিথি। ম্যারাথনের সার্বিক নিরাপত্তায় ছিল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনসহ ত্রিশাল থানা।

প্রথমবার বিজয় ম্যারাথনে অংশ নেওয়া প্রথম হওয়া নারী প্রতিযোগী পাপিয়া চাকমা ওয়াংজা বলেন, ‘আমরা প্রায় ৪০ জন মেয়ে ম্যারাথনে অংশগ্রহণ করেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন রাস্তায় আমরা মেয়েরা দৌড়াতে পারব সেটা কল্পনাও করতে পারিনি। নারীদের বন্দিশালা থেকে বের করা কালমেঘের বিজয় ম্যারাথন এক অনন্য উদাহারণ। আমি মনে করি এই ম্যারাথনে যারা অংশ নিয়েছেন, তারা জীবনে যে কোনো পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারবেন। যারা অংশ নেননি তারাও এর মাধ্যমে এ বিষয়ে উৎসাহিত হবেন।

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.
logo
kalbela.com