ভারী ধাতু ফসলে যাচ্ছে মাটি থেকে

ভারী ধাতু ফসলে যাচ্ছে মাটি থেকে
পুরোনো ছবি

সবজিতে ভারী ধাতু কোথা থেকে এলো—তা খোঁজ করতে গিয়ে ফসলের মাটিতে সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি লেড, নিকেল ও ক্যাডমিয়ামের উপস্থিতির প্রমাণ পেয়েছেন গবেষকরা। সম্প্রতি জামালপুরের মাটিতে চাষ হওয়া বেগুন নিয়ে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বেগুনে ভারী ধাতুর উপস্থিতি সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি। পরে এর কারণ খুঁজে বের করতে ফসলের মাটি পরীক্ষা করা হয়। এতে মিলছে মাটিতে সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি লেড, নিকেল ও ক্যাডমিয়াম থাকার প্রমাণ। গবেষকরা বলছেন, এ মাটিতে ফলানো অন্যান্য ফসলেও এসব ভারী ধাতুর উপস্থিতি থাকতে পারে।

কী কারণে মাটিতে লেড, নিকেল ও ক্যাডমিয়ামের পরিমাণ বাড়ছে—তা জানতে এবং এর প্রতিকারে আরও গবেষণা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলছেন গবেষকরা। কারণ, এসব ভারী ধাতু খাবারের সঙ্গে বছরের পর বছর নিয়মিত গ্রহণ করলে ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ে।

জামালপুরের ইসলামপুর ও মেলান্দহ উপজেলার ২০টি স্পটের কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি সংগ্রহ করা বেগুন ও মাটির নমুনা নিয়ে দুই বছরের গবেষণা থেকে সম্প্রতি এর ফলাফল জানিয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. জাকির হোসেন। তার সঙ্গে গবেষক দলে আরও ছিলেন অধ্যাপক ড. কাজী ফরহাদ কাদির, অধ্যাপক ড. হারুনুর রশিদ ও বাকৃবির এমএস (থিসিস) শিক্ষার্থী আনিকা বুশরা। এ গবেষণার ফল প্রকাশিত হয় আন্তর্জাতিক জার্নাল ‘সায়েন্টিফিক রিপোর্টে’।

অধ্যাপক ড. জাকির হোসেন বলেন, এ গবেষণায় তিনটি ধাতুর উপস্থিতি নিয়ে কাজ করেছি। কিছু কিছু অনুপুষ্টি, যা মানুষের জন্য উপকারী, সেগুলো নিয়েও আমরা কাজ করেছি। গবেষণায় ৭৫ শতাংশ বেগুনের নমুনায় লেড বা সিসা এবং ১০ শতাংশ নমুনায় নিকেলের পরিমাণ ছিল সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি। এই বেগুন সুদীর্ঘ সময় নিয়মিত খাওয়া হলে ক্যান্সারের একটা ঝুঁকি থাকবে।

ভারী ধাতু ফসলে যাচ্ছে মাটি থেকে
অতিদরিদ্রদের ব্যয়ের ৩২% খরচ চালে

তাহলে বেগুন খেলে কি ক্যান্সার হবে—এমন প্রশ্নের জবাবে এ গবেষক বলেন, গাড়ির কালো ধোঁয়ার মধ্যেও কিন্তু সিসা আছে। সেটিও ক্যান্সার তৈরি করতে পারে। এই ধরনের শত শত অনুষঙ্গ আছে, যা ক্যান্সারের ঝুঁকির তালিকায় রয়েছে। সুতরাং এখন বেগুন খেলেই ক্যান্সার হবে, বিষয়টি এমন নয়। বেগুন নিয়ে ভীতিকর অবস্থার তৈরি হোক, সেটি আমরা চাই না এবং ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করার মতো কিছু হয়নি আমাদের দৃষ্টিতে। তবে নতুন প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে খাদ্য নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দিতে হবে। খাদ্যশৃঙ্খলে যেন ভারী ধাতু ঢুকতে না পারে, সেই ব্যবস্থা করতে হবে।

ড. জাকির বলেন, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, বৃহত্তর ময়মনসিংহের ছয় জেলায় মোট যে পরিমাণ বেগুন পাওয়া যায়, তার ৬০ শতাংশই জামালপুরের ইসলামপুর থেকে আসে। এ ছাড়া রাজধানীসহ সারা দেশে রয়েছে এখানকার বেগুনের বিশেষ চাহিদা। চাহিদা ও উৎপাদনের এমন গুরুত্ব বিবেচনায় গবেষণার জন্য ইসলামপুর এবং পাশের মেলান্দহ উপজেলাকে বেছে নেওয়া হয়। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে সরেজমিন গবেষণা শুরু করা হয়। ২০টি এলাকার কৃষকদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা বেগুন ও মাটির স্যাম্পল পরীক্ষায় এসব ভারী ধাতু মিলেছে। অর্থাৎ মাটি থেকেই লেড, নিকেল ও ক্যাডমিয়াম ফসলে যাচ্ছে। শুধু বেগুন নয়, অন্য যে কোনো শাক-সবজি বা শস্য সেই মাটিতে উৎপাদিত হলে সেগুলোও এসব ভারী ধাতু দ্বারা সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

মাটিতে ভারী ধাতুর উপস্থিতির উৎস খুঁজে বের করতে গবেষণা প্রয়োজন জানিয়ে এ গবেষক বলেন, মাটিতে ভারী ধাতুর যে উপস্থিতি পাওয়া গেল, এসবের উৎস রাসায়নিক সার, কীটনাশক, সেচের পানি নাকি অন্য কোনো উপায়ে মাটি নষ্ট হচ্ছে—এ বিষয়ে গবেষণা প্রয়োজন। যেসব উৎস থেকে ভারী ধাতুগুলো আসছে সেগুলো যদি আমরা বন্ধ করে দিতে পারি, তাহলে মাটিতে ভারী ধাতুর পরিমাণ কমে যাবে এবং খাদ্যশৃঙ্খলে কম অনুপ্রবেশ করতে পারবে। এ ব্যাপারে গবেষণার ওপর ভিত্তি করে নেওয়া পদক্ষেপে নিরাপদ ফসল উৎপাদন করা সম্ভব হবে।

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.
kalbela.com