মিথ্যা মামলায় ২৭ মাস কারাভোগ, এসআইসহ চারজনের নামে মামলা

ভুক্তভোগী হোসেন এবং তার অ্যাডভোকেট।
ভুক্তভোগী হোসেন এবং তার অ্যাডভোকেট।ছবি : কালবেলা

লক্ষ্মীপুরের রামগতির মোহাম্মদ হোসেন (৪৬) দ্বিতীয় স্ত্রী ও চার সন্তান নিয়ে সংসার করছিলেন। হঠাৎ তার স্ত্রী পারুল নিখোঁজ হন। পরে রামগতি থানা পুলিশ অজ্ঞাত এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করে।

হোসেনের শ্বশুর ওই মরদেহ পারুলের বলে শনাক্ত করে মিথ্যা হত্যা মামলা করেন। মামলার সাত দিন পর নিখোঁজ পারুল ঢাকার এক ব্যবসায়ীর বাসায় আত্মহত্যা করে। অথচ ৭ দিন আগেই সাজানো হত্যা মামলায় আটক করে পুলিশ। শেষে মিথ্যা মামলায় ২৭ মাস কারাভোগ করার পর গত বছরের ডিসেম্বরে জামিন পান হোসেন।

এ ঘটনার বিচারের দাবিতে গত সোমবার এক পুলিশ কর্মকর্তাসহ শ্বশুর,শাশুড়ি ও শ্যালকের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেন মোহাম্মদ হোসেন। মামলা গ্রহণ করে বাদীর জবানবন্দি নিয়ে আদালতের সিনিয়র ম্যাজিস্ট্রেট মো. বেলায়েত হোসেন (রামগতি অঞ্চল) ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত কোনো আদেশ প্রদান করেননি।

আজ বৃহস্পতিবার আদালতের বেঞ্চ সহকারী মো. মান্নান এবং বাদী হোসেনের আইনজীবী অ্যাডভোকেট শাকিল পাটোয়ারী এ তথ্য জানান। মামলার আসামিরা হলেন—লক্ষ্মীপুরের রামগতি থানার সাবেক এসআই মজিবুর রহমান তফাদার, বাদীর শ্বশুর নোয়াখালির হাতিয়া উপজেলার বড়খেরি গ্রামের মো. বাহার মিস্ত্রী, শাশুড়ি হাজেরা বেগম ও শ্যালক মো. বাবুল।

মামলায় বাদীর অভিযোগে বলা হয়, মোহাম্মদ হোসেন রামগতির মেঘনা নদীর অসহায় জেলে। তার প্রথম স্ত্রী দুই মেয়েকে রেখে মারা যায়। তার তিনমাস পর পারুল বেগম নামে এক নারীকে বিয়ে করেন। তাদের ঘরে দুই ছেলে রয়েছে। ২০১৯ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর পারুল বেগম বাড়ি থেকে নিরুদ্দেশ হন। অনেক খোঁজার পর না পেয়ে ২৫ সেপ্টেম্বর রামগতি থানায় সাধারণ ডায়রি করেন হোসেন।

১৪ অক্টোবর দুপুর তিনটার দিকে রামগতিতে বাংলালিংক টাওয়ারের বাথরুমে অজ্ঞাত নারীর লাশ পায় পুলিশ। ওই লাশ পারুল বেগমের বলে শনাক্ত করে তার মা-বাবা। এ ঘটনায় শ্বশুর বাহার মিস্ত্রী ১৪ অক্টোবর রাতে মোহাম্মদ হোসেনকে আসামি করে রামগতি থানায় হত্যা মামলা করেন। পরে ১৪ অক্টোবর বিকেলে হোসেনকে বাড়ি থেকে অসুস্থ বৃদ্ধ মাসহ তিন সন্তানকে থানায় আটক করে নিয়ে আসে পুলিশ।

মোহাম্মদ হোসেন অভিযোগ করেন, তিনিই তার স্ত্রীকে হত্যা করেছে এই বলে থানায় বৈদ্যুতিক শক দিয়ে নির্যাতন করে দুই মেয়ের কাছ থেকে স্বীকারোক্তি আদায় করে পুলিশ। এই শেখানো স্বীকারোক্তি আদালতের বিচারকের কাছে না বললে তাদের পিতা হোসেনকে (কারাগারে বন্দী) ক্রসফায়ারে মেরে ফেলার হুমকি দেয় পুলিশ। শিশু ছেলে ও হোসেনের মাকে আটক রেখে পরের দিন দুই কিশোরী মেয়েকে দিয়ে হোসেনের বিরুদ্ধে ১৬৪ ধারায় আদালতে মিথ্যা বানোয়াট স্বীকারোক্তি আদায় করে নেয় এসআই আবদুল মজিদ দফাদার।

তিনি আরও জানান, ২৭ মাস কারাভোগ করার পর গত বছরের ২২ ডিসেম্বর উচ্চ আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পান তিনি। পারুলের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে তিনি তখন জানতে পারেন, সংসারে অভাব অনটনের কারণে পারুলকে তার মা-বাবার পরামর্শে ভাই বাবুল গার্মেন্টসে চাকরির কথা বলে চাটখিলের বাড়ইপাড়া গ্রামের ফাহাদ হোসেন নামের এক ব্যবসায়ীর লালবাগের নিউপল্টন রোডের বাসায় গৃহকর্মীর কাজ দেয়। স্বামীর প্রতি অবিচার হচ্ছে শুনে ২০১৯ সালের ১৯ অক্টোবর সকাল নয়টার দিকে বাসার জানালার গ্রিলের সঙ্গে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেন।

পরে পারুলের লাশ উদ্ধার করে ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত করান এসআই সুব্রত সাহা। এ ঘটনায় ওই থানায় অপমৃত্যু মামলা হয়। পরে বাবুল তার বোন পারুলের লাশ গ্রহণ করে গ্রামের বাড়ি রামগতিতে না এনে গোপনে রাতেই ঢাকার আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করে।

ভুক্তভুগী হোসেন আরও জানান, তার শ্বশুর-শাশুড়ি ও শ্যালক পরস্পর যোগসাজসে পরিকল্পিতভাবে পারুলকে ঢাকায় লুকিয়ে রেখে অজ্ঞাতনামা অর্ধগলিত নারীকে নিজেদের মেয়ে বলে সনাক্ত করেন। মিথ্যা হত্যা মামলা দিয়ে ২৭ মাস বিনাঅপরাধে কারাভোগ করিয়েছেন। তিনি পুলিশ কর্মকর্তাসহ চারজনের বিচার চান।

এ বিষয়ে কথা বলতে যোগাযোগ করা হলে অভিযুক্ত বাহার মিস্ত্রী, হাজেরা বেগম ও তাদের ছেলে বাবুলের ফোন বন্ধ থাকায় বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

রামগতি থানার সাবেক ও বর্তমানে খাগড়াছড়ি থানার এসআই আবদুল মজিদ তফাদার বলেন, ‘ওই মামলাটি আমার কাছে একমাস থাকার পর সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয়। আমার বিরুদ্ধে আনিত সব অভিযোগ মিথ্যা।’

এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির এসআই আশরাফ উদ্দিন সর্দার বলেন, ‘মোহাম্মদ হোসেন তার দ্বিতীয় স্ত্রীকে হত্যা করেননি। তার স্ত্রী পারুল বেগম ঢাকার নিউ পল্টনের এক ব্যবসায়ীর বাসায় গৃহকর্মীর কাজে থাকাকালী জানালার সঙ্গে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন। দীর্ঘ তদন্তের পর মামলাটি মিথ্যা দায়ের করা হয়েছে মর্মে ২০১৯ সালের ১৬ আগস্ট আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছি।’

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.
kalbela.com