বিশ্বাসের মুক্তিযুদ্ধ আমাদের সামনে পথ দেখাবে : আবেদ খান

শুক্রবার রাজশাহী সিটি করপোরেশনের আয়োজনে গুণীজন সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন কালবেলার প্রধান সম্পাদক আবেদ খান।
শুক্রবার রাজশাহী সিটি করপোরেশনের আয়োজনে গুণীজন সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন কালবেলার প্রধান সম্পাদক আবেদ খান।ছবি : কালবেলা

‘বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের দেশ। কোনো অবস্থাতে দেশ যখন মুক্তিযুদ্ধ দিয়ে স্বাধীন হয়, সেই দেশ আর কখনো কারও পদানত হয় না। যে দেশ রাজনৈতিকভাবে স্বাধীনতাবিরোধীদেরকে পরাস্থ করে, সেই দেশ নতুন করে স্বাধীনতাবিরোধীদের অধীনতা করতে পারে না।’

আজ শুক্রবার বেলা ১১টায় রাজশাহী সিটি করপোরেশনের নগর ভবন গ্রিন প্লাজায় সিটি করপোরেশনের আয়োজনে গুণীজন সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে কালবেলার প্রধান সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা আবেদ খান এসব কথা বলেন।

আবেদ খান বলেন, ‘আজকে মুক্তিযুদ্ধের কথা অনেকেই বলেন। যারা মুক্তিযুদ্ধ করবেন, করেন কিংবা করেছেন তারা চিরকাল মুক্তিযোদ্ধাই থাকেন। আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধ করেছি, তারা মনেপ্রাণে মুক্তিযুদ্ধই করি এবং সেটাকে বিশ্বাস করি। কেউ কেউ বাধ্যতামূলকভাবে মুক্তিযুদ্ধ করতে পারেন, কেউ কেউ বিশ্বাস চুরি করতে পারেন। আমি মনে করি, সেই বিশ্বাসের মুক্তিযুদ্ধ আমাদের সামনে এসে পথ দেখাবে।

‘আজকে আমার বয়সের যে জায়গায় পৌঁছেছি, আমি মনে করি সেই ’৭১-এর মুুক্তিযুদ্ধের সময় যে আবেগ, তাড়না, শক্তি এবং মানসিক বল নিয়ে রেখেছিলাম। আজকে এখানে এসে নতুন করে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করছি। কেননা মুক্তিযুদ্ধ সেই শক্তিটা আমাকে দিয়েছে। বঙ্গবন্ধুই সেই শক্তিটা আমার ভেতরে দিয়েছেন এবং পরিচালিত করেছেন। বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা, যিনি বাংলাদেশের সব অন্ধকার ঘরকে আলোকোজ্জ্বল করার প্রয়াস নিয়েছেন। আমি দূর থেকে হলেও তার সেই প্রয়াসের প্রতি এবং সমগ্র মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোকোজ্জ্বল প্রভার প্রতি বিনীত শ্রদ্ধা জানাই।’

রাজশাহী সিটি মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে কালবেলার প্রধান সম্পাদক বলেন, ‘রাজশাহীর ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিষয়ে এই প্রজন্মের যারা আছেন তারা হয়তো ওই সময় ছিলেন না। তবে এসব বিষয় সম্পর্কে নিশ্চয়ই শুনেছেন। আমি মনে করি, এই মুক্তিযুদ্ধের চিরন্তন রেখে যাওয়ার মতো একটা উদ্যোগ নেওয়া উচিত এবং অবশ্যই সেটি নেওয়া হচ্ছে। কারণ, রাজশাহীর একটা বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে, ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের সময় রাজশাহীর প্রথম শহীদ মিনারটি কয়েকজন মিলেই তৈরি করেছিলেন। আজকের রাজশাহী ইতিহাসের মধ্য দিয়ে অবশ্যই চলাচল করে। কারণ, অবশ্যই তেভাগা আন্দোলনের কথা মনে হারাননি। নাচোলের সেই ইলা মিত্র কিন্তু এখানকার। অর্থাৎ রাজশাহীর প্রতি পদে পদে, প্রতি অঞ্চলে অঞ্চলে ইতিহাস কথা বলে।’

মেয়র লিটন ও তার পিতা শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান সম্পর্কে আবেদ খান বলেন, ‘লিটন আমার খুবই স্নেহভাজন, কামারুজ্জামান হেনা ভাই আমার খুবই শ্রদ্ধাভাজন। শহীদ কামারুজ্জামানের সঙ্গে আমার সাংবাদিকতা জীবনের প্রথম লগ্নে অত্যন্ত সুসম্পর্ক ছিল এবং তার স্নেহেই আমি ধন্য হয়েছি। তিনি (শহীদ কামারুজ্জামান) ছোট ছোট ছড়া লিখতেন। আমি লিটনকে বলি 'লিটন, তুমি হেনা ভাইয়ের সেই ছড়াগুলো সংগ্রহ করো। সেগুলো সংকলন করো। কারণ, বাংলাদেশের জন্য এই মানুষটির অনেক অবদান আছে। তাকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে, এই মানুষটিকে চিরঞ্জীব রাখার অনেক সুযোগ আছে, এটাও একটা সুযোগ। আমি মনে করি- লিটন সেই দায়িত্বটি পালন করবে।’

মডেল সিটির প্রশংসা করে আবেদ খান বলেন, ‘রাজশাহী শহর, রাজশাহী জনপদ কী অসাধারণ! আমরা একটা কী অসাধারণ জায়গাতেই না এসে দাঁড়িয়েছি! পদ্মাপাড়ের কথা বলব না। কেননা রবীন্দ্রনাথ-নজরুল সবকিছুতেই আমরা পদ্মাকে পেয়ে যাই, পদ্মা নদীকে পেয়ে যাই। সেই পদ্মা নদী, সেই রবীন্দ্রনাথ, সেই নজরুল, সেই রাজশাহী সবমিলিয়ে একটা অসাধারণ মেলবন্ধন।’

এরই মধ্যে রাজশাহীতে আসার স্মৃতিচারণ করে বিশিষ্ট এই সাংবাদিক বলেন, ‘আমাকে পেশাগত কারণে অনেক সময় মামলার হাজিরা দিতে রাজশাহীতে অনেকবার আসতে হয়েছে। জামায়াতের মামলা আমার বিরুদ্ধে এসেছে এবং সেই মামলাগুলো মোকাবিলা করতে হয়েছে। সেই সূত্রে আমার কয়েকবার রাজশাহীতে আসা পড়েছে। যতবার এসেছি, ততবারই রাজশাহীর জন্য একটু একটু করে ভালোবাসা তৈরি হয়েছে। এই ভালোবাসা অক্ষুণ্ণ থাকবে, এই ভালোবাসা থাকবে চিরন্তন।’

রাজশাহী সিটি করপোরেশনের আয়োজনে গুণীজন সংবর্ধনা অনুষ্ঠান।
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের আয়োজনে গুণীজন সংবর্ধনা অনুষ্ঠান।ছবি : কালবেলা

তিনি বলেন, ‘আজকে যারা সংবর্ধনার আয়োজন করেছেন, আমাদের একত্র করেছেন—এই মানুষগুলোকে একসঙ্গে এক জায়গায় পেতাম না। এখান থেকেই আমরা কিন্তু উজ্জীবিত হবো। যেমন করে ভাষা আন্দোলনে উজ্জীবিত হয়েছি ও ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে উজ্জীবিত হয়েছিলাম। ১৯৬৯ সালে শহীদ ড. শামসুজ্জোহা আমাদের যে ত্যাগ-তিতীক্ষা দেখিয়েছেন, নিশ্চয়ই আমরা তাকে মনে রাখব। তিনিসহ এমন যারা আমাদের পথ দেখিয়েছেন, যে পথ তৈরি করেছেন, সেই পথ ধরেই আমরা চলতে চাই।’

সভাপতির স্বাগত সম্ভাষণে রাসিক মেয়র লিটন বলেন, ‘একসঙ্গে এত গুণীজন সংবর্ধনা দেওয়ার সৌভাগ্য আমরা বেশি পাই না। দেশবরেণ্য গুণীজন দেশের জন্য, জাতির জন্য, স্বাধীনতার মূল স্রোতকে ধরে রাখার জন্য, সংবিধানকে সমুন্নত রাখার জন্য যা যা করেছেন, সেই ঋণ শোধ করা সম্ভব নয়। তারা তাদের কর্মের মাধ্যমে আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন।’

রাসিক মেয়র বলেন, ‘১৯৭৪ সালে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সাতটি নৌরুট নিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি হয়। ওই সাতটি নৌরুটের মধ্যে ভারতের মুর্শিদাবাদের ধুলিয়ান থেকে রাজশাহীর গোদাগাড়ী হয়ে রূপপুর ও পাকশী দিয়ে আরিচা হয়ে ঢাকা পর্যন্ত একটি নৌরুট রয়েছে। এই রুট চালু করে সারা বছর যদি পদ্মায় নাব্য রাখা যায় তবে উভয় দেশ লাভবান হবে। নানারকম পণ্য আনা-নেওয়া করা যাবে। পণ্যমুখর হয়ে উঠবে রাজশাহী বন্দর। বিশেষ করে ভারত থেকে আমরা প্রতিবছর কোটি কোটি টন পাথর আমদানি করে থাকি। এই পাথর দিয়ে আমরা রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্ট নির্মাণ করি। ভারতের পাকুর ব্যান্ডের পাথর আমরা আমদানি করি। এই পাথর আমাদের রাজশাহীর বর্ডার থেকে খুব বেশি দূরে নয়।

‘ভারতের ধুলিয়ান থেকে বিহারের পাকুর খুব বেশি দূরে নয়। এই পাথর যদি আমরা বার্জে করে নদীপথে আনতে পারি রাজশাহীতে খুব সহজে তা ঢাকা পর্যন্ত বার্জে করে পৌঁছে দেওয়া যাবে। এতে করে আমাদের আমদানি ব্যয় ও উৎপাদন খরচ কমবে। এই কাজটি করা খুবই সহজ। সামান্য কিছু স্থানে পদ্মা নদীর ড্রেজিং প্রয়োজন। আপাতত শুধু একটি কাস্টমস হাউস এবং একটি জেটি করলেই এই বন্দরটি চালু করা সম্ভব।’

রাসিক মেয়র আরও বলেন, ‘রাজশাহী কৃষিপ্রধান অঞ্চল। এখানে কৃষিপণ্যনির্ভর শিল্প-কারখানা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। এখানে একটি পূর্ণাঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় হওয়া খুবই দরকার। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় হলে কৃষিনির্ভর রাজশাহীতে এ বিষয়ে রিসার্চ হবে। যা কৃষিতে উচ্চ ফলনশীল জাতের বীজ উদ্ভাবনে ভূমিকা রাখবে। কৃষির মাধ্যমে এই অঞ্চলের অর্থনীতিকে বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে।

অনুষ্ঠানে সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক বলেন, ‘৩০ লাখ শহীদের রক্তের অক্ষরে লেখা আমাদের সংবিধান। সংবিধান নিয়ে যেভাবে কাটাছেঁড়া করা হয়েছে, তা কষ্টের। আপনারা খেয়াল রাখবেন, এই সংবিধানটা যেন আমরা আমাদের বক্ষে ধারণ করি, এটাকে প্রটেক্ট করি।’ তিনি আরও বলেন, ‘রাজশাহীতে ২০১৫ সালে একবার এসেছিলাম। এবার এসে দেখছি আমূল পরিবর্তন। রাজশাহীর দৃশ্যমান এই উন্নয়ন প্রমাণ করে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে।’

সাবেক গভর্নর অধ্যাপক ড. আতিউর রহমান বলেন, ‘রাজশাহী সবুজে বিবর্তিত। নিজ চোখে দেখে যেতে পারলাম কী করে একটি নগর জীবন্ত ও সজীব হয়ে উঠেছে। পুরো দেশ ঘুরে দেখুন এমন পরিচ্ছন্ন ও সুবজ নগরী গড়ে তুলতে পারছি না। রাজশাহী সবুজ ও গণমুখী নগর হিসেবে গড়ে উঠছে। জীবন আর শিক্ষা কখনো আলাদা হতে পারে না।

তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষ আর কোনোদিন হবে না। কারণ মানুষের এখনো পণ্য ক্রয়ের সক্ষমতা রয়েছে। গ্রামের কৃষি শ্রমিকরা এখন প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা আয় করেন। দুর্ভিক্ষ শুধু উৎপাদনহীনতার জন্য হয় না, মানসিকতার জন্যই দুর্ভিক্ষ হয়। সবার আগে মানসিকতার ইতিবাচক পরিবর্তন প্রয়োজন।’

অনুষ্ঠানে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে বক্তব্য দেন—বিশিষ্ট সমাজসেবী ও নারীনেত্রী শাহীন আকতার রেণী। অনুষ্ঠানের সমাপনী ঘোষণা করেন রাসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. এবিএম শরীফ উদ্দিন। অনুষ্ঠান মঞ্চে উপবিষ্ট ছিলেন—রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক গোলাম সাব্বির সাত্তার, রাজশাহী জেলা প্রশাসক আব্দুল জলিল, রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার আবু কালাম সিদ্দিক, বাংলাদেশ শিশু একাডেমির মহাপরিচালক আনজীর লিটন, সাংবাদিক রাশেদ চৌধুরী প্রমুখ।

অনুষ্ঠানে বীর মুক্তিযোদ্ধা, বিচারক, বিশিষ্ট নাগরিক, প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, সরকারি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, নাগরিক সমাজ ও ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ, চিকিৎসক, আইনজীবী, রাজশাহী সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর ও বিভাগীয় প্রধানগণ, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন ও শিক্ষকবৃন্দ, স্কুল ও কলেজের প্রধানগণ এবং গণমাধ্যমকর্মীবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.
kalbela.com