মাল্টা চাষে মুক্তারের সফলতা উদ্বুদ্ধ করছে লক্ষ্মীপুরের বেকার যুবকদের

মুক্তারের মাল্টা বাগান পরিদর্শন করেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা
মুক্তারের মাল্টা বাগান পরিদর্শন করেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা ছবি : কালবেলা

লক্ষ্মীপুরে তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা রেজাউল করিম মুক্তারের মাল্টা বাগানের সফলতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে উঠেছেন স্থানীয় বেকার যুবকরা। জেলার রায়পুর চরলক্ষ্মী ইউনিয়নের হাজিমারা গ্রামে সাড়ে ৮ একর জমিতে বাণিজ্যিকভাবে গড়ে উঠেছে এ মাল্টা বাগান। বর্তমানে বাগানটিতে ১ হাজার ৫০০টি মাল্টা ফলের গাছ রয়েছে। উৎপাদিত মাল্টা বাজারজাত করে প্রতিবছর লাভবান হচ্ছেন লক্ষ্মীপুরের বেড়ীর মাথা এলাকার বাসিন্দা মুক্তার।

সরেজমিন দেখা যায়, সারি সারি মাটির উঁচু লেন, তার ওপরেই সারিবদ্ধ দাঁড়িয়ে মাল্টা গাছ। মাল্টার ভারে নুয়ে পড়ছে ডালপালা। সবুজ অরণ্যে পাতার ফাঁকে ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে লেবুজাতীয় ফল ‘মাল্টা’। প্রতিদিন দূরদূরান্তের বহু মানুষ ঘুরতে আসেন মুক্তারের এই মাল্টা বাগান দেখতে। সুন্দর মনোরম পরিবেশে সাজানো গোছানো মাল্টা বাগানে থোকায় থোকায় ঝুলে থাকা মাল্টা দেখে অভিভূত হচ্ছেন দর্শনার্থীরা। অনেকে আবার বাগান থেকেই কিনে নিয়ে যাচ্ছেন মাল্টা।

জানা যায়, ‘ইউটিউব’ দেখে কৃষক মুক্তার গড়ে তোলেন এ বিশাল মাল্টা বাগান। এ জন্য পারিবারিকভাবে ৮০ লাখ টাকা মূলধন পান তিনি। এখন পর্যন্ত এ বাগানকে ঘিরে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে ১০-১২ বেকার মানুষের। লক্ষ্মীপুরের মতো প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রশিক্ষণহীন এক যুবকের কৃষিতে এমন সাহসিক সাফল্য দেখে অভিভূত খোদ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। মাল্টার ফলন বৃদ্ধিতে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে সংশ্লিষ্ট কৃষি বিভাগ। 

পুরো জেলায় এ বছর প্রায় ২০ হেক্টর জমিতে মাল্টা চাষ হয়েছে। এ অঞ্চলে ভালো সম্ভাবনা থাকায় মাল্টা চাষে আগ্রহ বাড়ছে অনেকের। যাদের অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করছেন তরুণ কৃষক মুক্তার। আমি তার বিশাল মাল্টা বাগান দেখে অভিভূত। এই বাগানের ফলন আরও বৃদ্ধির জন্য কৃষি বিভাগ থেকে সব ধরনের সার্বিক সহযোগিতা করা হবে।

ড. মো. জাকির হোসেন, উপপরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, লক্ষ্মীপুর

রেজাউল করিম মুক্তার কালবেলাকে জানান, ২০১৬ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষা উত্তীর্ণের কিছুদিন বেকার ঘোরাঘুরি করেন রেজাউল করিম মুক্তার। প্রবাসী আপন বড় ভাই আজিম ভূঁইয়ার উৎসাহ উদ্দীপনায় ঝুঁকে পড়েন মাল্টা চাষে। ৫ বছর আগে আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে সাড়ে ৮ একর জমি ১০ বছরের চুক্তিতে ১২ লাখ টাকা বিনিময়ে ভাড়া নেন তিনি। সেখান থেকেই তার স্বপ্নের শুরু।

তিনি বলেন, প্রথমবার ৩ হাজার কলমের চারা লাগান ওই বাগানে। কিন্তু কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই হঠাৎ সব মাল্টা গাছ মারা যায়। এতে সার ও কীটনাশকসহ প্রায় ১০ লাখ টাকার ক্ষতির সম্মুখীন হলেও ভেঙে পড়েননি তিনি। পারিবারিক উৎসাহ ও নিজের আত্মবিশ্বাস থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর সংগ্রামে আবারও কাজে নেমে যান। সাফল্যের কথা মাথায় রেখে ফের রাজশাহী থেকে এক বছর বয়সী মাল্টার কলম চারা এনে রোপণ করেন। সার, কীটনাশক প্রয়োগসহ নিয়োগকৃত শ্রমিকদের নিয়ে বাগান পরিচর্যাতেই ব্যস্ত থাকেন। 

থোকায় থোকায় ঝুলে থাকা মাল্টাগুলো দেখে অভিভূত হচ্ছেন
থোকায় থোকায় ঝুলে থাকা মাল্টাগুলো দেখে অভিভূত হচ্ছেনছবি : কালবেলা

মুক্তার বলেন, মাল্টা বাগানই আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। প্রথম দুবছর ফলন এলেও লাভের আশা না করে তা ছেটে ফেলে দিয়ে মাল্টার চারাগুলোকে বড় হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। তৃতীয় বছর থেকে ফলগুলোকে বড় হওয়ার সুযোগ দেন। এতে তৃতীয় বছরে প্রায় ১০ লাখ টাকার মাল্টা বিক্রি হয় তার। চতুর্থ বছরে অর্থাৎ গত বছর প্রায় ১৫ লাখ টাকার মাল্টা বাজারের আড়তদারদের কাছে বিক্রি করেছেন তিনি। চলতি বছর ফলন ভালো হওয়ায় এবং বাজারদর ভালো পেলে মাল্টা বিক্রিতে ৩০ লাখ টাকা লাভের আশা করছেন তিনি। 

তিনি আরও জানান, ১ বছর বয়সী চারা লাগানোর ২ বছর পর থেকেই ফলন আসতে শুরু করে। ফুল, পরাগায়ন এবং খাবার উপযোগী মাল্টা ফল হতেই ৭-৮ মাস সময় লেগে যায়। একেকটি মাল্টা গাছের যত্নের পেছনে প্রায় ৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে তার। সে হারে প্রতি গাছে ৩০০-৪০০টিরও বেশি মাল্টা ফল ধরে। সঠিক যত্ন নিলে একেকটি মাল্টাগাছ ১০ বছর পর্যন্ত ফলন দিয়ে থাকে। তাই মাল্টা চাষে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন তিনি।

জানা যায়, বর্তমানে বাগানে ‘বারি মাল্টা-১’ জাতের প্রায় ১ হাজার ৫০০ মাল্টার গাছ রয়েছে। মাল্টার পাশাপাশি ওই জমিতে ১ হাজার বিভিন্ন জাতের আম, বেশ কয়েকটি কমলা, লেবু ও পেঁপে গাছ রয়েছে। এ ছাড়া মুক্তারের আরও দুই একর জমিতে ৪ হাজার পেয়ারা গাছের বাগান রয়েছে।   

মুক্তার এখন একজন সফল কৃষি উদ্যোক্তার নাম। তাকে দেখে যারা ছোট ছোট মাল্টা বাগান করার উদ্যোগ নিয়েছেন, মুক্তার তাদের পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করছেন। এ বছর প্রয়োজনীয় বৃষ্টিপাত না হওয়ায় ইতোমধ্যে মুক্তারের মাল্টা বাগানে দেখা দিয়েছে সেচ সংকট। তাই সেচ সুবিধার জন্য সরকারের কাছে একটি কৃষি সেচ যন্ত্রের সহায়তার প্রত্যাশা করছেন এই নবীন কৃষি উদ্যোক্তা।

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.
kalbela.com