ভারতে চিকিৎসা করাতে এসে কিডনি বিক্রির চক্র গড়লেন শহিদুল!

কিডনি বিক্রি হয় ২৫ লাখে, বিক্রেতা পেত মাত্র ২ লাখ
গ্রেপ্তারকৃত কিডনি বিক্রি চক্রের সদস্যরা।
গ্রেপ্তারকৃত কিডনি বিক্রি চক্রের সদস্যরা।ছবি: কালবেলা

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিডনি বেচাকেনা চক্রের অন্যতম মূলহোতা মো. শহিদুল ইসলাম মিঠু (৪৯) ও ফেসবুক পেজের এডমিনসহ ৫ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে র‍্যাব। মঙ্গলবার (১৯ জুলাই) রাতে র‌্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখা ও র‌্যাব-১ এর যৌথ অভিযানে রাজধানীর ভাটারা, বনশ্রী ও মিরপুর এলাকায় তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।

গ্রেপ্তারকৃত চক্রের বাকি সদস্যরা হলেন- মো. মিজানুর রহমান (৪৪), মো. আল মামুন ওরফে মেহেদী (২৭), মো. সাইমন (২৮) ও মো. রাসেল হোসেন (২৪)।

র‍্যাব জানায়, প্রতারণার মাধ্যমে মানবদেহের কিডনিসহ নানা অঙ্গের অবৈধ ট্রান্সপ্লান্টেশনের সঙ্গে দেশের কয়েকটি চক্র সক্রিয় আছে। এসব চক্রের ফাঁদে প্রলুব্ধ হয়ে প্রতারিত হচ্ছেন অসহায় নিম্নআয়ের মানুষ। আইন বহির্ভূত, স্পর্শকাতর ও অবৈধ ট্রান্সপ্লান্টেশনে চক্রের সদস্যরা অর্থের লোভে অমানবিক কার্যক্রমে যুক্ত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অবৈধভাবে কিডনিসহ অন্যান্য মানব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বেচাকেনা চক্রের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে আসছিল র‍্যাব। এসব চক্রের সদস্যরা অনলাইনে বিভিন্ন প্রচার প্রচারণার মাধ্যমে গ্রাহক ও ডোনারদের আকৃষ্ট করে থাকে।

অভিযানে কিডনি বেচাকেনা চক্রের সদস্যদের কাছ থেকে বিভিন্ন ভুক্তভোগীর সঙ্গে চুক্তির এফিডেভিট কপি, ১৪টি পাসপোর্ট, কিডনি ক্রসম্যাচিং এর বিভিন্ন দলিল, দেশি ও বিদেশি মুদ্রা, বিভিন্ন ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্র ও ফটোকপি, বিভিন্ন ব্যাংকের চেকবই ও এটিএম কার্ড, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি দপ্তরের জাল সিল মোহর, খালি স্ট্যাম্প, সিপিইউ, মোবাইল ও সিমকার্ড জব্দ করা হয়।

গ্রেপ্তারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে র‍্যাব জানায়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিডনি বেচাকেনা এই চক্রের মোট সদস্য সংখ্যা ১৫-২০ জন। তারা মূলত ৩টি ভাগে বিভক্ত হয়ে এই অবৈধ কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। এই চক্রের সদস্যরা পার্শ্ববর্তী দেশে অবস্থানরত তাদের সহযোগীদের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রায় শতাধিক মানুষকে পাচার করেছে।

এই চক্রের প্রথম গ্রুপ ঢাকায় অবস্থান করে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিডনি ট্রান্সপ্লান্টেশন প্রয়োজন এমন বিত্তশালী রোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে। চক্রের দ্বিতীয় গ্রুপ প্রথম দলের চাহিদা মোতাবেক দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের গরিব ও অভাবী মানুষদের চিহ্নিত করে এবং তাদের অর্থনৈতিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে অর্থের বিনিময়ে কিডনি ট্রান্সপ্লান্টেশন এর জন্য ডোনার হতে প্রলুব্ধ করে ঢাকায় নিয়ে আসে।

পরবর্তীতে তৃতীয় গ্রুপ প্রলোভনের শিকার কিডনি ডোনারদের ঢাকায় বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে কিডনি ট্রান্সপ্লান্টেশন প্রত্যাশী রোগীর সঙ্গে ব্লাড ম্যাচিং এবং অন্যান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করে। ব্লাড ম্যাচিং এবং অন্যান্য ডায়াগনস্টিক টেস্টে কিডনি ট্রান্সপ্লান্টেশন এর উপযুক্ততা নিশ্চিত হলে, তার পাসপোর্ট, ভিসা প্রসেসিং এবং ভূয়া কাগজপত্র তৈরির মাধ্যমে ভূক্তভোগী ডোনারকে পার্শ্ববর্তী দেশে পাঠানোর জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হয়।

র‍্যাব আরও জানায়, এই চক্রের সঙ্গে পার্শ্ববর্তী দেশে অবস্থানকারী আরেকটি চক্রের পারস্পরিক যোগসাজশে ভুক্তভোগী কিডনি ডোনারকে বিদেশের এয়ারপোর্ট অথবা স্থলবন্দরে রিসিভ করা থেকে শুরু করে হাসপাতালের ডকুমেন্টেশন, অস্ত্রপাচারসহ যাবতীয় কার্যক্রম শেষে অবৈধ উপায়ে বিমান বা উত্তর পূর্বাঞ্চলের সীমান্ত এলাকার মাধ্যমে দেশে ফেরত পাঠায়।

গ্রেপ্তারকৃতরা এই চক্রের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ অবৈধ উপায়ে হাতিয়ে নিয়েছে। প্রতিটি কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য তারা রোগী প্রতি ২০ হতে ২৫ লাখ টাকা নিতো। তবে তারা কিডনি ডোনারকে মাত্র ৪ থেকে সাড়ে ৪ লাখ টাকা দেওয়া হবে বলে আশ্বস্ত করে এবং অগ্রীম ২ লাখ টাকা প্রদান করতো। কিডনি ট্রান্সপ্লান্টেশন এর পর প্রলোভনের শিকার কিডনি দাতাদের বাকি টাকা না দিয়ে নানাবিধ ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হতো।

এই বিষয়ে র‍্যাব-১ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আব্দুল্লাহ আল মোমেন বলেন, চক্রের মূলহোতা ও অন্যতম অভিযুক্ত মো. শহিদুল ইসলাম ২০১৬ সালে নিজের চিকিৎসার জন্য পার্শ্ববর্তী দেশে যায়। সেখানে অবস্থানকালীন সে কিডনি প্রতিস্থাপনের রোগীদের ব্যাপক চাহিদা দেখতে পায়। এ থেকে সে নিজেই কিডনি প্রতিস্থাপনের অবৈধ ব্যবসা পরিচালনা শুরু করে।

এরপর সে ভারতে অবস্থানরত কিডনি ক্রয়-বিক্রয় চক্রের সঙ্গে যোগসাজশে বাংলাদেশে একটি দালাল চক্র প্রতিষ্ঠা করেন। তারা অনলাইনের মাধ্যমে আগ্রহী বিত্তশালী কিডনি রোগী এবং বিভিন্ন এলাকা হতে স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে কিডনি ডোনার সংগ্রহসহ যাবতীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করতেন।

তিনি আরও বলেন, শহীদুল এর মাধ্যমে ৫০টিরও বেশি কিডনি বেচাকেনা হয়েছে বলে সে প্রাথমিকভাবে স্বীকার করে। মিজানুর রহমান কিডনি ডোনারদের পার্শ্ববর্তী দেশে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পাসপোর্ট, ব্যাংক এনডোর্সমেন্ট, মেডিকেল ডকুমেন্টস, ভিসা এবং অন্যান্য কাগজপত্র তৈরি করে থাকে।

এছাড়া গ্রেপ্তারকৃত মো. সাইমন বিগত এক বছর আগে এবং মো. আল মামুন ৬ মাস আগে চক্রটির মাধ্যমে জনপ্রতি ৪ লক্ষ টাকায় কিডনি বিক্রি করে। পরবর্তীতে দ্রুততম সময়ে অধিক পয়সা উপার্জনের লোভে তারা এ চক্রটির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে এবং কিডনি ডোনার ও ক্রেতা সংগ্রহে লিপ্ত হয়। তারা নিজেদের সুস্থতার প্রমাণ দেখিয়ে অন্যান্য ডোনারদের কিডনি বিক্রির জন্য আগ্রহী করতো। তারা এ পর্যন্ত ১০ জনের কিডনি বেচাকেনা করেছে।

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.
kalbela.com