জীবিত ব্যক্তিকে মৃত বানিয়ে ফের জীবিত করেন ইউপি চেয়ারম্যান

দেলুয়াবাড়ী ইউপির চেয়ারম্যান রিয়াজুল ইসলাম।
দেলুয়াবাড়ী ইউপির চেয়ারম্যান রিয়াজুল ইসলাম।ছবি : সংগৃহীত

রাজশাহীতে চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ১২ জন সদস্যের প্রায় তিন বছরের মাসিক ভাতার সাড়ে ১৮ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।

জেলার দুর্গাপুর উপজেলার ৪ নম্বর দেলুয়াবাড়ী ইউপির চেয়ারম্যান রিয়াজুল ইসলাম। ২০১৬ সাল থেকে ওই ইউপির চেয়ারম্যান তিনি। প্রথমবার চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পেয়ে ৫ বছরে নির্বাচিত ১২ জন ইউপি সদস্যের প্রায় ৩ বছরের মাসিক ভাতা (১৮ লাখ ৪৮ হাজার) আত্মসাৎ করেছেন।

শুধু তাই নয়, জেলহাজতে থাকা মাদক মামলার এক আসামির জামিন করিয়ে দিতে ওই আসামির মা মৃত্যুবরণ করেছেন— এ মর্মে সনদপত্র দেন তিনি। পরে রাজশাহীর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলি আদালত-৩ এর বিচারক বিষয়টির তদন্ত করতে দুর্গাপুর থানার ওসিকে নির্দেশ দেন। পরে তোপের মুখে ওই আসামির মা জীবিত আছেন মর্মে আরেকটি প্রত্যয়নপত্র দেন ওই চেয়ারম্যান।

চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে শুধু এ দুই অভিযোগ নয়, এমন শত শত অভিযোগের পাহাড় নিয়ে রাজশাহী সাংবাদিক ইউনিয়নের (আরইউজে) কার্যালয়ে হাজির হন ওই ইউপির ৮ জন নির্বাচিত সদস্য।

গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে আরইউজে কার্যালয়ে ওই চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে সংবাদ সম্মেলন করেন তারা। ইউপি সদস্যরা চেয়ারম্যানের এসব দুর্নীতি থেকে এলাকাবাসীর মুক্তির জন্য প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে সংবাদ সম্মেলন করেছেন ৮ জন ইউপি সদস্য।
চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে সংবাদ সম্মেলন করেছেন ৮ জন ইউপি সদস্য।ছবি : কালবেলা

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে ৪ নম্বর দেলুয়াবাড়ী ইউপির ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য ও প্যানেল চেয়ারম্যান এস এম আবুল বাশার বলেন, ‘গত ১ আগস্ট ইউপি সদস্য ও মাদক মামলার আসামি সাজাপ্রাপ্ত মো. কামারুজ্জামান ওরফে মো. কামরুল সরকারের জামিন করার অভিনব কৌশল আঁটেন চেয়ারম্যান। ওই দিন কামারুজ্জামানের মা মোছা. জমেলা ভোর ৬টায় মৃত্যুবরণ করেছেন মর্মে একটি প্রত্যয়নপত্র দেন তিনি। এমনকি ওইদিন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় তার জানাজা অনুষ্ঠিত হবে বলেও প্রত্যয়নপত্রে উল্লেখ করা হয়।’

তিনি জানান, প্রকৃতপক্ষেই ওই নারী মৃত্যুবরণ করেছেন কি না, সে বিষয়ে খোঁজ-খবর নিতে রাজশাহীর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলি আদালত-৩ এর বিচারক দুর্গাপুর থানার ওসি নাজমুল হককে আদেশ (আদেশ নং-৪, তাং-০২ আগস্ট ২০২২) দেন। আদালতের আদেশে ওসি নাজমুল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) জি এম মনিরুজ্জামানকে বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দেন। গত ২৮ আগস্ট এসআই মনিরুজ্জামান তথ্য-প্রমাণসাপেক্ষে ওই নারী মৃত্যুবরণ করেননি মর্মে সংশ্লিষ্ট আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেন। একই দিন মোছা. জমেলা বেওয়া নামের ওই নারী মৃত্যুবরণ করেননি বরং সুস্থ অবস্থায় জীবিত আছেন মর্মে চেয়ারম্যান রিয়াজুল ইসলাম আরেকটি প্রত্যয়নপত্র দেন।

আবুল বাশার বলেন, ‘২০১৬ সালে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক নিয়ে ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন মো. রিয়াজুল ইসলাম। ২০২১ সালে নির্বাচনে আওয়ালী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে দ্বিতীয়বার চেয়ারম্যান হন তিনি। প্রথম মেয়াদের ৫ বছরে শত শত অনিয়ম করার পরও দ্বিতীয়বার ক্ষমতার দাপটে পুনরায় চেয়ারম্যানের চেয়ার দখল করেন রিয়াজুল। চেয়ারম্যানের আসন পেয়েই শুরু করেন নানা অনিয়ম, দুর্নীতি আর অর্থ আত্মসাৎ।’

লিখিত বক্তব্যে তিনি আরও বলেন, ‘ইউনিয়নের হতদরিদ্র মানুষের মধ্যে বিতরণের জন্য চলতি মাসে জিআর-এর ৬ টন চাল আসে। গত ৮ সেপ্টেম্বর ১৯৬ জন ব্যক্তির মধ্যে ৩.৫ টন বা ৩ হাজার ৫০০ কেজি চাল বিতরণ করেন। বাকি ২.৫ টন বা ২ হাজার ৫০০ কেজি (৫০ বস্তা) চাল ইউনিয়ন পরিষদের হলরুমে রাখা হয়। সেখান থেকে ১.৭ টন বা ১ হাজার ৭০০ কেজি (৩৪ বস্তা) চাল (এ চালের আনুমানিক মূল্য ৬৮ হাজার টাকা) চেয়ারম্যান তার গাড়িচালক শামীমের মাধ্যমে চুরি করে বিক্রি করে দেন। ’

চেয়ারম্যান রিয়াজুল ইসলামের দেওয়া ভুয়া মৃত্যু সনদ।
চেয়ারম্যান রিয়াজুল ইসলামের দেওয়া ভুয়া মৃত্যু সনদ।ছবি : কালবেলা

সংবাদ সম্মেলনে ইউপি সদস্য আরও বলেন, ‘চেয়ারম্যান রিয়াজুল একজন মাছ ব্যবসায়ী। ইউনিয়নের নারায়ণপুর গ্রামে ৬০ জন কৃষকের কাছ থেকে ৭৬ বিঘা জমি নামমাত্র টাকায় ১০ বছরের জন্য লিজ নিয়ে পুকুর খনন করেন। তিনি লিজের ডিড জালিয়াতি করে ১০ বছরের জায়গায় ১৩ মাসে বছর গণনা করে ১০ বছর ১০ মাসের ভুয়া একটি ডিড তৈরি করে জোরপূর্বক ৬০ জন কৃষকের জমি দখল করে মাছ চাষ করে আসছেন। এ নিয়ে ভুক্তভোগী ৬০ জন কৃষক ইউএনওসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে অভিযোগ দিয়ে কোনো প্রতিকার পাননি। ভুক্তভোগী কৃষকরা চেয়ারম্যানের জোরপূর্বক ভোগদখলের বিরুদ্ধে মানববন্ধন কর্মসূচিও পালন করেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘২০১৮ সালে উপজেলার মহেন্দা এলাকার আক্কাছ আলী নামের এক ব্যবসায়ীকে একটি ফাঁকা চেক দিয়ে তার কাছ থেকে ৪১ লাখ ৫০ হাজার টাকা উচ্চ সুদে ঋণ নিয়েছিলেন চেয়ারম্যান। পরে টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ভুক্তভোগী আক্কাছ আলীর ছেলে সেন্টু আহমেদ বাদী হয়ে চেয়ারম্যান রিয়াজুলের বিরুদ্ধে চেক জালিয়াতির মামলা করেন। পরে গ্রাম্য সালিশের মাধ্যমে মীমাংসা করে সমুদয় টাকা ফেরত দেওয়া হয়। কিন্তু, মীমাংসার নামে চেয়ারম্যান রিয়াজুল সেন্টু আহমেদের ছবি তুলে দেন। পাশাপাশি তার একটি জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি কৌশলে নিয়ে নেন। এ ছবি ও জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি দিয়ে সেন্টুর নামে চেয়ারম্যান তার ছোট ভাই সাইদুরকে দিয়ে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের দুর্গাপুর শাখায় ব্যাংকটির কর্মকর্তা আব্দুর রহমানের মাধ্যমে একটি ভুয়া অ্যাকাউন্ট খোলেন। ভুক্তভোগী সেন্টুর স্বাক্ষর জালিয়াতি করে খোলা ওই অ্যাকাউন্টে চেয়ারম্যানের ভাই ৬১ লাখ ৫০ হাজারের একটি চেক পাঠান। কিন্তু ওই অ্যাকাউন্টে টাকা না থাকায় ভুক্তভোগী সেন্টুর নামে চেক জালিয়াতির মামলা করেন সাইদুর। সে মামলায় সেন্টুর নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি হয়েছিল। পরে আদালতের মাধ্যমে সেন্টুর জামিন হলে সেন্টুর বাবা আক্কাছ বিষয়টি নিয়ে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের রাজশাহী শাখায় খোঁজ-খবর নেন। প্রকৃত ঘটনাটি জানার পর ভুয়া অ্যাকাউন্ট খোলার অভিযোগে চেয়ারম্যান রিয়াজুল ইসলাম, তার ভাই সাইদুর রহমান ও ব্যাংক কর্মকর্তা আব্দুর রহমানের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন ভুক্তভোগী সেন্টু। ২০১৮ সালের শেষের দিকে সেই মামলায় জামিন নিতে গেলে আদালত রিয়াজুল ও সাইদুরের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাদের জেলহাজতে পাঠান। ওই সময় তারা দেড় মাস কারাগারে বন্দি ছিলেন। উচ্চ আদালত থেকে বর্তমানে তিনি জামিনে রয়েছেন।’

সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে ইউপি সদস্য মো. তাজুল ইসলাম, মো. খলিলুর রহমান, মো. আফসার আলী, মো. আবুল খায়ের, মো. রহিদুল ইসলাম, সংরক্ষিত নারী সদস্য মোসা. সুবেদা খাতুন, মোসা. লাবনী খাতুন ও প্রতারণার স্বীকার প্রকৌশলী মো. মামুনুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।

চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির পাহাড় নিয়ে ৪ নম্বর দেলুয়াবাড়ী ইউপির নির্বাচিত সদস্যরা সংবাদ সম্মেলনের বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত চেয়ারম্যান মো. রিয়াজুল ইসলামের মুঠোফোনে অসংখ্যবার কল করা হলেও তিনি ধরেননি।

জানতে চাইলে দুর্গাপুর থানার ওসি মো. নাজমুল হক বলেন, ‘ওই চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে চাল আত্মসাতের অভিযোগের কথা মৌখিকভাবে শুনেছি। তবে, এ ব্যাপারে কেউ লিখিত অভিযোগ করেনি।’

জীবিত ব্যক্তিকে মৃত্যু সনদ দেওয়ার পর বেঁচে আছেন মর্মে চেয়ারম্যানের আবার অন্য একটি প্রত্যয়নপত্র দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ঘটনা সত্য। প্রথমে ওই নারী মারা গেছেন মর্মে একটি প্রত্যয়ন দিয়েছিলেন। পরে অবশ্য জীবিত আছেন মর্মে আরেকটি প্রত্যয়নপত্র দিয়েছেন। বিজ্ঞ আদালত এ বিষয়ে খোঁজ-খবর নিতে আদেশ দিয়েছিলেন। ঘটনার তদন্তসাপেক্ষে সত্য রিপোর্টই আদালতে দাখিল করা হয়েছে।’

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.
kalbela.com