বিলুপ্তির পথে ২০ দলীয় জোট ও ঐক্যফ্রন্ট

২০ দলীয় জোট ও ঐক্যফ্রন্টের লোগো
২০ দলীয় জোট ও ঐক্যফ্রন্টের লোগো

সরকার হটাতে ২০ দলীয় জোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরিকরাসহ সমমনা অন্য দলগুলোকে নিয়ে যুগপৎ আন্দোলনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। শরিকরাও জোটগত অংশগ্রহণের পরিবর্তে নিজ নিজ অবস্থান থেকে মাঠে নামার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় কার্যত বিলুপ্ত হতে চলেছে জোট দুটি। যদিও কৌশলগত কারণে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো জোটকেই বিলুপ্ত ঘোষণা করবে না প্রধান শরিক বিএনপি। মূলত একাদশ সংসদ নির্বাচনের পর থেকেই জোট দুটি অকার্যকর। শুধু কাগজে-কলমেই টিকে আছে অস্তিত্ব। বিএনপিও এখন এককভাবে কর্মসূচি পালন করছে। ডিসেম্বরের শেষে কিংবা নতুন বছরের শুরুতে যুগপৎভাবে মাঠের আন্দোলনে নামার পরিকল্পনা রয়েছে দলটির। বিএনপির দায়িত্বশীল একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে এমনটি জানা গেছে।

জানতে চাইলে ২০ দলীয় জোটের সমন্বয়ক ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান কালবেলাকে বলেন, ২০ দলীয় জোট আনুষ্ঠানিকভাবে ভেঙে দেওয়া হয়নি, এখনো আছে। সংলাপে জোটের শরিক দলগুলো একমত হয়েছে, তারা যুগপৎভাবে আন্দোলনটা শুরু করবে। যার যার অবস্থান থেকে আন্দোলন শুরু হয়ে চলতে থাকবে। যারা আন্তরিকতার সঙ্গে সেই আন্দোলনে থাকবে, তারা কোনো একপর্যায়ে গিয়ে আবার ঐক্যবদ্ধ হবে কিনা—সেটা এখনই বলা যাবে না। আন্দোলনের গতি-প্রকৃতির ওপর সেটা নির্ভর করবে।

তবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু কালবেলাকে বলেন, ২০ দলীয় জোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট আর নেই। দুই জোটের শরিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ করে আমরা এরই মধ্যে যুগপৎ আন্দোলনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সেই আন্দোলনে দলগুলো নিজ নিজ অবস্থান থেকে অংশগ্রহণ করবে। আমরা এখন যুগপৎভাবে এগোচ্ছি।

২০ দলীয় জোট প্রসঙ্গে জোটের অন্যতম শরিক এলডিপির সভাপতি অলি আহমদ বীরবিক্রম কালবেলাকে বলেন, বিএনপি যে পরিকল্পনা (যুগপৎ আন্দোলন) দিয়েছে, সে অনুযায়ী ২০ দলীয় জোটের দলগুলো নিজ নিজ জায়গা থেকে কাজ করছে। আমরা (এলডিপি) এক মাসের মধ্যে ঢাকায় দুটি বড় কর্মসূচি করেছি। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে গত ৮ অক্টোবর বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল এবং ২ নভেম্বর একটা বড় সমাবেশ করেছি। অনুরূপভাবে অন্য দলগুলোও নিজ নিজ উদ্যোগে সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ করে যাচ্ছে।

যুগপৎ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ২০ দলীয় জোট বিলুপ্ত হতে চলেছে কিনা—এমন প্রশ্নে জোটের অন্যতম এই নেতা বলেন, ২০ দলীয় জোট জোটের জায়গায়ই আছে, যদিও জোটগত কোনো কর্মসূচি নেই। কারণ, আমরা বলছি যুগপৎভাবে কাজ করব। সুতরাং এখানে জোটগতভাবে কাজ করার সুযোগ নেই।

২০ দলীয় জোটের আরেক শরিক বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীরপ্রতীক বলেন, যুগপৎ আন্দোলন হলেই যে জোট বিলুপ্ত হতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। একান্নবর্তী পরিবারে সবাইকে একসঙ্গে বাজার করতে যেতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তবে ২০ দলীয় জোট যে দীর্ঘদিন ধরে অকার্যকর, এটা সত্য। একই সঙ্গে জোট যে নেই—অফিসিয়ালি এমন কোনো ঘোষণাও দেওয়া হয়নি।’ ‘২০ দলীয় জোট আর নেই’—বিএনপি নেতা ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর এমন বক্তব্য প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জোটের অন্যতম এই শীর্ষনেতা বলেন, উনি (টুকু) যেটা বলেছেন সেটাও সত্য। উনার কথাকে চ্যালেঞ্জ করার কোনো কারণ আমাদের নেই।

২০ দলীয় জোট ও ঐক্যফ্রন্টের লোগো
রাজনীতির খেলায় এগিয়ে আ.লীগ

১৯৯৯ সালের নভেম্বরে বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জামায়াত ও ইসলামী ঐক্যজোট নিয়ে চারদলীয় জোট গঠন করা হয়। পরে এইচএম এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি এ জোট থেকে বেরিয়ে গেলে নাজিউর রহমান মঞ্জুর নেতৃত্বে গঠিত নতুন দল বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) চারদলীয় জোটে সংযুক্ত হয়। এরপর ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জোটগতভাবে অংশগ্রহণ করে বিএনপি। বিজয়ের পর সরকারও গঠিত হয় জোটগতভাবে। পরে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন জোরদার করতে চারদলীয় জোটের সঙ্গে নতুন ১৪টি দল সংযুক্ত করে ২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল গঠন করা হয় ১৮ দলীয় জোট। এরপর আরও পাঁচটি দলের যোগদান এবং ভাঙা-গড়ার খেলায় জোটে এখন ২১টি দল রয়েছে, তবে এটি ২০ দলীয় জোট নামেই পরিচিত। এদিকে, ২০ দলীয় জোট বহাল রেখেই একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে ২০১৮ সালের অক্টোবরে গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করে বিএনপি। ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে ওই নির্বাচনে অংশগ্রহণও করে বিএনপি। এটা নিয়ে তখন বিএনপির সঙ্গে ২০ দলীয় জোটের দূরত্ব সৃষ্টি হয়। নির্বাচনের পর ঐক্যফ্রন্টও অকার্যকর হয়ে পড়ে। তবে জোটগত রাজনীতির গুরুত্ব বিবেচনায় কৌশলগত কারণে কোনো জোটকেই বিলুপ্ত করেনি বিএনপি।

এদিকে, নির্বাচনকালীন নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে এলেও দাবি মানতে সরকারকে বাধ্য করতে সক্ষম হয়নি দলটি। এমন প্রেক্ষাপটে বিএনপির হাইকমান্ড অনুধাবন করে, দাবি মানতে সরকারকে বাধ্য করতে হলে বিরোধী সব দলকেই আন্দোলনে সম্পৃক্ত করতে হবে। এমন ভাবনা থেকে ডান-বাম-ইসলামীসহ সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে এক প্ল্যাটফর্মে আনার উদ্যোগ নেয়। অনানুষ্ঠানিক কথাবার্তার পর গত ২৪ মে থেকে ৩ আগস্ট পর্যন্ত ২০ দলীয় জোটসহ ২২টি দলের সঙ্গে প্রথম দফার সংলাপ করে বিএনপি। কিন্তু সেখানে জামায়াতকে নিয়ে কয়েকটি দলের আপত্তিতে এক মঞ্চের পরিবর্তে যুপগৎ আন্দোলনের সিদ্ধান্ত হয়।

২০ দলীয় জোট ও ঐক্যফ্রন্টের লোগো
‘১৫ জানুয়ারির মধ্যে অনুমোদন না হলে ১৫০ আসনে ইভিএমে ভোট সম্ভব নয়’

বিএনপির এমন সিদ্ধান্তের মধ্যেই সরকারের পদত্যাগ এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে গত ৮ আগস্ট জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের দুই শরিক জেএসডি ও নাগরিক ঐক্য নিয়ে সাতটি দল ও সংগঠনের সমন্বয়ে নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ‘গণতন্ত্র মঞ্চ’র আত্মপ্রকাশ ঘটে। গণতন্ত্র মঞ্চ এরই মধ্যে কর্মসূচি নিয়ে মাঠে রয়েছে। জানা গেছে, বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে জোটগতভাবে অংশ নেবে তারা।

জানতে চাইলে গণতন্ত্র মঞ্চ ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরিক নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না কালবেলাকে বলেন, একাদশ সংসদ নির্বাচনের পর থেকেই জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট অকার্যকর। এরপর আমরা একবার বসেছিলাম, পরে আর বসা হয়নি। ঐক্যফ্রন্ট এখন কার্যত মৃত। ভবিষ্যতে আর কোনো মিটিং হবে বলেও মনে হয় না। এখন আমরা গণতন্ত্র মঞ্চকে সক্রিয় এবং বর্ধিত করতে কাজ করছি।

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.
kalbela.com