রাজনীতির খেলায় এগিয়ে আ.লীগ

আওয়ামী লীগের লোগো
আওয়ামী লীগের লোগো

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে চাঙ্গা হয়ে উঠেছে রাজনীতির মাঠ। নানা কর্মসূচি নিয়ে মাঠে সক্রিয় বিএনপি ও আওয়ামী লীগ। নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী সক্রিয় অন্য রাজনৈতিক দলগুলোও। সব মিলিয়ে দেশের রাজনীতিতে গণতন্ত্রের সুবাতাস বইতে শুরু করেছে। বিভাগীয় গণসমাবেশের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের নিষ্ক্রিয়তা কাটিয়ে উজ্জীবিত বিএনপি। অন্যদিকে, ভিন্ন কোনো পন্থার পরিবর্তে সাংগঠনিক কর্মসূচির মাধ্যমে রাজপথে প্রতিপক্ষ মোকাবিলা করছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। ইতিবাচক এ কৌশলের কারণে এই মুহূর্তে রাজনীতির মাঠের খেলায় আওয়ামী লীগ এগিয়ে রয়েছে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপিকে অবাধে কর্মসূচি পালনে সুযোগ সৃষ্টি, গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ফলে রাজনীতিতে যে ইতিবাচক পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে, তা সরকারের জন্য একটি প্রাপ্তি। এ ছাড়া সরকারি দলের নীতিনির্ধারকরাও মনে করেন, নিজ দলের কর্মীদের গাছাড়া ভাব দূর করতে বিএনপিকে আন্দোলনের সুযোগ দেওয়া উচিত। একই সঙ্গে দেশে যে গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় আছে, তা দেশে-বিদেশে প্রমাণ করা যাবে। তবে বিশ্লেষকরা দুই প্রধান দলের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি যেন সংঘর্ষে রূপ না নেয়, সেই বিষয়েও সাবধান করেছেন। তাদের মতে, গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চা অবশ্যই গণতান্ত্রিক উপায়ে করা উচিত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক কালবেলাকে বলেন, রাজনীতির মাঠে প্রতিযোগিতা থাকবেই। দলগুলো নিজেদের মতো কাজ করে যাবে। নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসবে সরকার ও বিরোধী দল তাদের মতো করে জনসমর্থন নিজেদের পক্ষে টানার চেষ্টা করবে। কে এগিয়েছে বা পিছিয়েছে, সেই চূড়ান্ত ফলাফল অনুমান করা যাবে জাতীয় নির্বাচনের আগে আগে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এ উপাচার্য আরও বলেন, ‘বিরোধী দলের আন্দোলন তো সরকার ইতিবাচকভাবেই দেখছে। এতে সরকারের ভূমিকা ইতিবাচক, যদি না বিরোধী দলগুলো সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে।’

রাজনীতির মাঠে ক্ষমতাসীন দলের এগিয়ে থাকার বিষয়ের ব্যাখ্যায় বিশেষজ্ঞরা বলেন, সরকারের নমনীয় নীতির সুযোগে বিএনপি তাদের সরকারবিরোধী কর্মসূচি বৃদ্ধির মাধ্যমে জনসমর্থন তৈরির চেষ্টা করছে। দীর্ঘদিনের দলের নিষ্ক্রিয়তা কাটিয়ে কর্মীদের সক্রিয় করছে। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগও বিএনপির এসব গণসমাবেশের পাল্টা জনসংযোগ করছে। ঢাকাসহ সারা দেশে শাখা সম্মেলনের মাধ্যমে নেতাকর্মীদের চাঙ্গা করছে। এ ছাড়া জেলায় জেলায় চলছে সহযোগী সংগঠনগুলোর সম্মেলন। ঢাকার বাইরে যেদিন বিএনপির কর্মসূচি থাকে সেদিন আওয়ামী লীগ ঢাকায় শক্তি প্রদর্শন করছে। সম্প্রতি বিএনপি রংপুরে যেদিন গণসমাবেশের আয়োজন করে সেদিন ক্ষমতাসীন দলটি ঢাকা জেলা সম্মেলন আয়োজনের মাধ্যমে শক্তি প্রদর্শন করে। বিএনপি বরিশালে যেদিন গণসমাবেশ করে সেদিন আওয়ামী লীগ রাজধানীতে শান্তি সমাবেশের আয়োজন করে নিজেদের অবস্থানের জানান দেয়।

অন্যদিকে, ১০ ডিসেম্বর বিএনপির ঢাকায় মহাসমাবেশকে ঘিরে ব্যাপক পাল্টা কর্মসূচি দিয়েছে আওয়ামী লীগ। রাজধানীতে মাঠ নিজেদের দখলে রাখার জন্য দলের ত্রিবার্ষিক জাতীয় সম্মেলন, মহাসমাবেশ, সহযোগী ও অঙ্গসংগঠনগুলোর সম্মেলনের মাধ্যমে দলীয় রাজনীতি চাঙ্গা রাখতে গ্রহণ করেছে ধারাবাহিক কর্মসূচি। ১১ নভেম্বর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যুব মহাসমাবেশ করবে যুবলীগ। ২৬ নভেম্বরে হবে মহিলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন।

আওয়ামী লীগের লোগো
সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ স্থগিত

আওয়ামী লীগের নেতারা জানিয়েছেন, বিজয়ের মাসেও রাজনীতির মাঠ দখলে রাখতে রয়েছে দলের ধারাবাহিক কর্মসূচি। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সম্মেলন ২৪ ডিসেম্বরের আগেই ৩ ডিসেম্বর হবে ছাত্রলীগের সম্মেলন, ৯ ডিসেম্বর যুব মহিলা লীগের সম্মেলন। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সম্মেলনের আগেই হবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ ছাত্রলীগের সম্মেলন।

ঢাকার বাইরেও জেলায় জেলায় আওয়ামী লীগের জনসভা করার পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা উপস্থিত থাকবেন। ২৪ নভেম্বর যশোর, ৪ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম ও ৭ ডিসেম্বর কক্সবাজারে জনসভা করবে দলটি। এ ছাড়া বিজয়ের মাস ডিসেম্বরকে ঘিরে দেশজুড়ে আওয়ামী লীগ ব্যাপক কর্মসূচি পালন করে, এবারও করবে।

বিএনপির কর্মসূচি প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, আওয়ামী লীগ পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিতে বিশ্বাস করে না। আমরা কোনো সংঘাত চাই না। আন্দোলনের নামে কেউ নৈরাজ্য হলে তা সহ্য করা হবে না।

দুই দলের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি ছাড়াও জোটের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ এগিয়ে রয়েছে বলেও মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেন, ২০০৫ সালে তৈরি আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটে তেমন কোনো ভাঙন ধরেনি। শরীফ নুরুল আম্বিয়ার নেতৃত্বাধীন জাসদের একটি অংশ জোট থেকে বের হয়ে গেলেও ঐক্য অটুট আছে। অন্যদিকে, ২০ দলীয় জোট ভাঙনের শিকার হয়েছে বেশ কয়েকবার। খেলাফত মজলিশ, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ), ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টিসহ ৭টি দল জোট ছেড়েছে। নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের প্রধান শরিক নিবন্ধন বাতিল হয়ে যাওয়া দল জামায়াত। তাদের নির্বাচনমুখী কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পেয়েছে। নিবন্ধন বাতিল হয়ে যাওয়ার পরও তারা নতুন নামে দলের নিবন্ধন নেওয়ার চেষ্টা করছে। সরকারের সবুজ সংকেত পেলে তারা নির্বাচনে অংশ নেবে।

ভেতরে ভেতরে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের ছোট ছোট দল নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য চাপ প্রয়োগ করছে। অলি আহমদ নেতৃত্বাধীন এলডিপিও হঠাৎ রাজনীতির মাঠে সক্রিয় হয়ে উঠেছে, এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী নেতৃত্বাধীন বিকল্পধারা বাংলাদেশ নির্বাচনে আসবে বলেও অনেকের ধারণা।

অন্যদিকে, নানা ধরনের টানাপোড়েন ও দ্বিধাবিভক্তির পরও জাতীয় পার্টি সরকারের সঙ্গেই আছে। জাতীয় পার্টির প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদ ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদেরের পৃথক সম্মেলনের ঘোষণা, সংসদ বয়কটের মতো সিদ্ধান্ত পরিবর্তিত হয় ক্ষমতাসীন দলের দৃঢ় ভূমিকার কারণেই।

আওয়ামী লীগের লোগো
‘১৫ জানুয়ারির মধ্যে অনুমোদন না হলে ১৫০ আসনে ইভিএমে ভোট সম্ভব নয়’

ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সুসম্পর্ক রয়েছে। হেফাজতে ইসলাম স্পষ্ট করেছে বিএনপির সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্কই নেই। অপরদিকে ইসলামী আন্দোলন সরকারের সমালোচনামুখর হলেও আগামীতে নির্বাচনে আসবে বলেও পর্যবেক্ষদের ধারণা।

এ ছাড়া নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকার পতনের আন্দোলনে জোর দিতে আ স ম আব্দুর রব, নুরুল হক নুরসহ সাতটি দলের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে গণতন্ত্র মঞ্চ। গণফোরামের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ড. রেজা কিবরিয়া ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সাবেক ভিপি নুরুল হক নুরের নেতৃত্বে নতুন রাজনৈতিক দল গণঅধিকার পরিষদ নিজেদের আলাদা অস্তিত্ব জানান দিতে নির্বাচনে আসবে বলেই বিশেষজ্ঞদের ধারণা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. হারুন-অর-রশিদ কালবেলাকে বলেন, দলগুলো যদি শান্তিপূর্ণভাবে নিজেদের কর্মসূচি পালন করে এটি অবশ্যই গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক। যদি সাংঘর্ষিক রূপ নেয় তবে সেটি জনগণের জন্য শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সরকার বিরোধী দলকে কর্মসূচি পালনের সুযোগ দিচ্ছে এটাই স্বাভাবিক। রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব হচ্ছে জনসংযোগ করা। জনগণের সামনে দাবি তুলে ধরা। তবে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে, উসকানিমূলক বক্তব্য পরিহার করতে হবে।

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.
kalbela.com