রাঙ্গা ইস্যুতে ফের বেসামাল জাতীয় পার্টি

জাতীয় পার্টির লোগো
জাতীয় পার্টির লোগো

রাঙ্গা ইস্যুতে ফের বেসামাল হয়ে পড়েছে জাতীয় পার্টি। তবে পার্টির দুর্গ বলে পরিচিত রংপুরের মানুষজন বলছেন, জাপায় নাটকীয়তা নতুন কোনো ঘটনা নয়।

পার্টির চেয়ারম্যান সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদ বেঁচে থাকাকালীন নাটকীয়তার সূত্র ধরেই শুরু হয় নানা টানাপোড়েন। তার মৃত্যুর পর পার্টির হাল ধরা নিয়ে দ্বন্দ্ব চলে স্ত্রী রওশন এরশাদ ও ছোট ভাই জি এম কাদেরের মধ্যে। মহাসচিব নিয়েও একাধিকবার কোন্দল তৈরি হয় পার্টির অভ্যন্তরে। তারপরও বিরোধী দল হিসেবে অবস্থান নিয়ে চলছিল জাতীয় পার্টির কার্যক্রম।

সবশেষ পার্টির সাবেক মহাসচিব ও জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ মসিউর রহমান রাঙ্গাকে সব পদ-পদবি থেকে অব্যাহতি দেওয়ার ঘটনায় আবারও আলোচনায় এসেছে দলটি।

রাঙ্গাকে বাদ দিতে রংপুর জেলা জাতীয় পার্টির আগের কমিটি বিলুপ্ত করে বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল মাসুদ চৌধুরী নান্টুকে আহ্বায়ক ও হাজি আবদুর রাজ্জাককে সদস্য সচিব করে ৩১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নুর সুপারিশে গত ২০ সেপ্টেম্বর কমিটি অনুমোদন দিয়েছেন পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের। এর আগে জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি ছিলেন মসিউর রহমান রাঙ্গা।

অন্যদিকে জাতীয় পার্টির গঠনতন্ত্রের ২০ ধারার ১, ২ ও ৩ উপধারার ক্ষমতাবলে দলের চেয়ারম্যানের একক ক্ষমতাকে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক উল্লেখ করে এসব বিধান অপব্যবহারের অভিযোগ এনে ধারাগুলো স্থগিত ঘোষণা করেছেন দলটির প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন এরশাদ। পার্টির গঠনতন্ত্রের ধারা ২০-এর উপধারা ১-এ বর্ণিত প্রধান পৃষ্ঠপোষকের ক্ষমতাবলে বুধবার জি এম কাদেরকে দেওয়া এক চিঠিতে এ ঘোষণা দেন তিনি।

জাতীয় পার্টির লোগো
আরও ঘনীভূত হচ্ছে জাপার সংকট

জাপা চেয়ারম্যান জি এম কাদেরকে উদ্দেশ করে পাঠানো রওশন এরশাদের সই করা চিঠিতে বলা হয়, জাতীয় পার্টির সর্বময় ক্ষমতার সংরক্ষক হিসেবে পার্টির গঠনতন্ত্রের ধারা ২০-এর উপধারা ১: প্রধান পৃষ্ঠপোষকের ক্ষমতাবলে চেয়ারম্যানের বিশেষ ক্ষমতা এবং মৌলিক অধিকার পরিপন্থি ধারা ২০-এর উপধারা ১(১)-এর ক, খ, গ, ঘ, ঙ, চ ও ছ এবং উপধারা ২-এর ক, খ, গ এবং উপধারা ৩-এ বর্ণিত অগণতান্ত্রিক ও স্বেচ্ছাচারীমূলক বিধান স্থগিত করে এরই মধ্যে জাতীয় পার্টি থেকে অব্যাহতিপ্রাপ্ত ও কমিটি থেকে বাদ দেওয়া সব নেতাকর্মীকে পার্টিতে অন্তর্ভুক্তির আদেশ দেওয়া হচ্ছে।

চিঠিতে বলা হয়, একটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল দেশের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশন প্রণীত বিধানাবলি অনুযায়ী তার কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। সেখানে দলের নেতাকর্মীদের মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের সুযোগ নেই। পাশাপাশি সারা দেশের নেতাকর্মীরাও গঠনতন্ত্রে বর্ণিত এ ধরনের অগণতান্ত্রিক ও অগঠনতান্ত্রিক ধারার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। এ ধরনের অগণতান্ত্রিক ধারা-উপধারা বাতিল এখন লাখ লাখ নেতাকর্মী সমর্থকের প্রাণের দাবি।

যা বললেন রওশন এরশাদ

‘সম্প্রতি দলীয় কার্যক্রম পর্যালোচনা করে প্রতীয়মান হয় যে, বিগত দিনে দলের বহু সিনিয়র, অভিজ্ঞ, দায়িত্বশীল পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়েছে। যোগ্য ও ত্যাগীদের পদোন্নতিবঞ্চিত করে রাখা হয়েছে, যা পার্টিকে দিন দিন দুর্বল করার নামান্তর। পার্টির অগণতান্ত্রিক ভাব আবহ সৃষ্টির কারণে নেতাকর্মীরা বিভ্রান্ত হচ্ছে এবং ভীতি ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে পার্টি খণ্ডিত হওয়ার সমূহ আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে।

‘তাই আমি পার্টির গঠনতন্ত্রের ধারা ২০-এর উপধারা-১ প্রধান পৃষ্ঠপোষকের ক্ষমতাবলে সারা দেশের লাখ লাখ নেতাকর্মীর দাবি মেনে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষে দশম জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার আগ পর্যন্ত গঠনতন্ত্রের ধারা ২০-এর উপধারাগুলো স্থগিত ঘোষণা করছি।’

দল থেকে বাদ দেওয়া মসিউর রহমান রাঙ্গাসহ সিনিয়র নেতা এবং কমিটি থেকে বাদ দেওয়া নেতাকর্মীদের দলে অন্তর্ভুক্তির জন্য জি এম কাদেরকে নির্দেশনা দেন জাতীয় পার্টির প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন এরশাদ।

রওশন আরও যা বলেন

‘এরকম একটি পরিস্থিতির অবসানের লক্ষে এবং পার্টি শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যে আমার নির্দেশনা অনুযায়ী প্রেসিডিয়াম সদস্য মসিউর রহমান রাঙ্গা, সাবেক এমপি জিয়াউল হক, সাবেক এমপি আবদুল গাফফার বিশ্বাস, নবম কাউন্সিলের পর কমিটিতে না রাখা সাবেক মন্ত্রী ও প্রেসিডিয়াম সদস্য এম এ সাত্তার, অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন খান, জাফর ইকবাল সিদ্দিকী, ফখরুজ্জামান জাহাঙ্গীর, কাজী মামুনুর রশীদ, অধ্যাপক ইকবাল হোসেন রাজু, সাবেক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট মাহবুবুল আলম বাচ্চু, সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক নুরুল ইসলাম মিলন, নুরুল ইসলাম নুরুসহ দেশজুড়ে নিষ্ক্রিয় করে রাখা নেতাদের দলে অন্তর্ভুক্ত করা হোক।’

মসিউর রহমান রাঙ্গা জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় উপনেতা ও দলের সাবেক মহাসচিব। সম্প্রতি তিনি একটি বেসরকারি টেলিভিশনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রওশন এরশাদকে বিরোধীদলীয় নেতার পদ থেকে সরানোর প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তার রেশ ধরেই তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।

জাপার চেয়ারম্যান জি এম কাদের দলীয় গঠনতন্ত্র প্রদত্ত ক্ষমতাবলে পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্যসহ সব পদ-পদবি থেকে মসিউর রহমান রাঙ্গাকে অব্যাহতি প্রদান করেছেন। এ নিয়ে জাপার দুর্গখ্যাত রংপুরে তৈরি হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।

কেউ কেউ বলছেন, পার্টি রক্ষায় চেয়ারম্যান (জি এম কাদের) রাঙ্গাকে বাদ দিয়ে ঠিক কাজটিই করেছেন। অন্যদিকে রাঙ্গাপন্থিরা রংপুর নগরীসহ রাঙ্গার নির্বাচনী এলাকা (রংপুর-১) গঙ্গাচড়ায় জি এম কাদেরের কুশপুত্তলিকা দাহ করেছে। ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে পার্টির বিবদমান দুই পক্ষের মধ্যে।

জাতীয় পার্টির লোগো
রাঙ্গার পর এবার মৃধাকে জাপা থেকে অব্যাহতি

অব্যাহতি দেওয়ার পর জি এম কাদেরকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে রাঙ্গা যে কথা বলেছেন, তার তীব্র সমালোচনা করেছেন রংপুর জেলা ও মহানগর জাতীয় পার্টির নেতারা।

রংপুর মহানগর জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক এস এম ইয়াসীর বলেন, ‘জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, আমরা তার সঙ্গে একমত। রাঙ্গা ভাই আমাদের বলার কোনো ভাষা রাখেননি। তিনি পার্টির সিদ্ধান্ত অমান্য করেছেন। তারপরও হয়তো সুযোগ আসবে, রংপুরের মাটিতে আমরা জাতীয় পার্টিকে টুকরো করতে চাই না। দুর্গকে শক্তিশালী করতে একসঙ্গে কাজ করতে চাই।’

জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য, মহানগর কমিটির সভাপতি ও রংপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা বলেন, ‘রাঙ্গা সাহেব পার্টির চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে যে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন, তা ঠিক করেননি। সবার আগে দল বড়। দলের বিরুদ্ধে গিয়ে কেউ কখনো সুফল ভোগ করতে পারেনি।

‘দলের স্বার্থে চেয়ারম্যান যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সেটাতে আমরা একমত। তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। সময় হলে আবার দলে ফিরে আসার সুযোগ হতে পারে।’

পার্টির স্বার্থে রাঙ্গাকে উত্তেজিত না হয়ে শান্ত থাকার আহ্বান জানান তিনি।

জাতীয় পার্টির লোগো
জাতীয় পার্টির সব পদ থেকে রাঙ্গাকে অব্যাহতি

এদিকে রংপুর জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি পদ থেকে অপসারিত মসিউর রহমান রাঙ্গা নতুন কমিটির প্রতি শুভকামনা জানিয়ে দলকে আরও শক্তিশালী করতে কাজ করার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। সামনে অনেক চমক অপেক্ষা করছে উল্লেখ করে রাঙ্গা বলেন, ‘জীবনভর জাতীয় পার্টি করে আসছি। এর আগে অন্য কোনো দল করিনি। মনে-প্রাণে জাতীয় পার্টির রাজনীতিকে ধারণ এবং লালন করেছি। আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে অন্যায়ভাবে দলের সব পদ থেকে অব্যাহতি দিয়ে আমার প্রতি অবিচার করা হয়েছে। জাতীয় পার্টি আরও সমৃদ্ধ হোক, সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী হোক এই কামনা করছি।’

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.
kalbela.com