এনআইডি সংশোধনে আবেদনের স্তূপ

জাতীয় পরিচয়পত্র।
জাতীয় পরিচয়পত্র।পুরোনো ছবি

রাজধানীর নির্বাচন ভবনের সপ্তমতলায় ঘোরাঘুরি করছেন মাদারীপুরের মো. আতিয়ার হওলাদার। তিনি জানান, তিন মাস আগে উপজেলা নির্বাচন অফিসে জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধনের আবেদন করেছিলেন। সুরাহা হয়নি দেখে ঢাকায় এসেছেন। কুমিল্লার বরুড়া থেকে এনআইডি সংশোধনের আবেদন করেছিলেন এম সোলাইমান। নিজের ও বাবার নাম বদলে মুফতি সোলাইমান ও মাওলানা আলী আকবর করতে চান তিনি। জন্মসনদ, পাসপোর্ট ও ড্রাইভিং লাইসেন্সের কপিও জমা দিয়েছেন। তবু কাজ হচ্ছে না। একই জেলার ভেলু রানি অধিকারী নিজের নামের অধিকারী সংশোধন করে চক্রবর্তী করাতে চান। সংশোধন করতে চান শিক্ষাগত যোগ্যতাও। প্রমাণ হিসেবে এফিডেভিট ও জন্মসনদের কপি সংযুক্তি দিয়েও পাননি সমাধান। রাজশাহী থেকে নিজের বয়স ১০ বছর বাড়িয়ে জন্ম সাল ১৯৬৪ থেকে ১৯৫৪ সাল করার আবেদন করেছেন রহিম শেখ। সেটাও ঝুলে আছে দীর্ঘদিন।

জাতীয় পরিচয়পত্র।
‘শর্ত’ না মানলে ওয়ারিশ সনদ দেন না জাহেদ

জানা যায়, লাখ লাখ মানুষের জাতীয় পরিচয়পত্রে রয়েছে নানা ধরনের ভুল। কারও নিজের নাম, কারও বাবা-মায়ের নাম, কারও ঠিকানা বা কারও জন্মসাল ভুল। আবার দেখা গেছে, কারও বাবার নামের স্থলে স্বামীর নাম ছাপা হয়েছে।

নির্বাচন কমিশনের এনআইডি অনুবিভাগের তথ্যানুযায়ী, চালু হওয়ার পর থেকে গত ১৩ আগস্ট পর্যন্ত সারা দেশে ২১ লাখ ৫৪ হাজার ৮০টি এনআইডি সংশোধন করা হয়েছে। এ ছাড়া আইডি হারানোসহ নানা কারণে ১৭ লাখ ৯৮ হাজার ৭৩৪টি ডুপ্লিকেট এনআইডি সরবরাহ করা হয়েছে। ওই সময় পর্যন্ত ৫ লাখ ৩৭ হাজার ৬৩৫টি সংশোধন এবং ১৬ হাজার ২৪টি ডুপ্লিকেট এনআইডির আবেদন জমা রয়েছে।

ইসি জানায়, সারা দেশে প্রতিদিন গড়ে হাজারখানেক আবেদন জমা পড়ছে। আবেদনগুলো ‘ক’ থেকে ‘ঘ’ পর্যন্ত ৪টি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়। অনলাইনে আবেদনের পর সেগুলোকে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ফেলার জন্য ১০টি অঞ্চলের ১০ জন উপপরিচালক ও সহকারী পরিচালককে দায়িত্ব দেওয়া আছে।

সামান্য ভুলের জন্য ক ক্যাটাগরিতে যায়। উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা বা সহকারী পরিচালক সেটা দেখেন। একটু বড় ভুল যায় খ ক্যাটাগরিতে। সেটা দেখেন জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা বা উপপরিচালক। গ ক্যাটাগরির ভুল আঞ্চলিক কর্মকর্তা বা পরিচালক এবং ঘ ক্যাটাগরির বড় সংশোধন হলে স্বয়ং ডিজি সেটি সংশোধনের অনুমতি দিতে পারেন। এ ছাড়া সরকারি চাকরিজীবীদের বয়স কমানো-বাড়ানো সংক্রান্ত সংশোধনের জন্য পরিচালকের (অপারেশন্স) নেতৃত্বে ৫ সদস্যর আলাদা কমিটি আছে।

জানা গেছে, এখন খ ক্যাটাগরির প্রায় ৩২ হাজার এবং গ ক্যাটাগরির ১০ হাজারেরও বেশি আবেদন ইসিতে জমা আছে। ঘ ক্যাটাগরির আছে প্রায় ৫ শতাধিক আবেদন। এসব আবেদনের সপক্ষে কাগজপত্র জমা দিতে না পারায় আবেদনগুলোর সুরাহা করা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছে ইসি সূত্র।

বিভিন্ন গ্রাহকের সঙ্গে আলাপ করে এবং কয়েকটি উপজেলা নির্বাচনী অফিসের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জমা পড়া আবেদনের প্রায় ২০ শতাংশই নিজের বা বাবা-মায়ের নামের ভুল সংক্রান্ত। ১০ শতাংশ আবেদন ঠিকানা পরিবর্তনজনিত। প্রায় ৩০ শতাংশ আবেদন জমা পড়ে জন্ম তারিখের ভুল সংশোধন চেয়ে। কোনো এনআইডিতে দেখা গেছে ৬ মাস থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত বয়সের তারতম্য রয়েছে।

জাতীয় পরিচয়পত্র।
বৈধ নৌযান ১৫ হাজার অবৈধ দুই লাখ!

এসব ভুলের কারণে চরম ভোগান্তিতে রয়েছেন এনআইডিধারীরা। কারও চাকরি হচ্ছে না, কেউ বেতন/পেনশন পাচ্ছেন না, কারও পাসপোর্ট ও ভিসা হচ্ছে না, কেউ খুলতে পারছেন না ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, কেউ করোনার টিকা নিতে পারছেন না। এমনকি হতদরিদ্র অনেকে ভিজিএফসহ বিভিন্ন ত্রাণও নিতে পারছেন না। জাতীয় পরিচয়পত্রের এসব ভুলের দায়ভার নিতে রাজি নন কেউ। নির্বাচন কর্মকর্তারা দুষছেন গ্রাহকদের। গ্রাহকরা দুষছেন নির্বাচন অফিসকে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, নির্বাচন অফিস এবং কম্পিউটার দোকানের অপেশাদার ডাটা এন্ট্রি অপারেটরদের দিয়ে দ্রুত কাজ করানো, অপেশাদার কোম্পানিকে এনআইডি তৈরির দায়িত্ব দেওয়া এবং সর্বোপরি কোনো মনিটরিং ছাড়া এনআইডি প্রস্তুত করার কারণে লাখো মানুষ এ ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।

রাজধানীর নির্বাচন ভবনের প্রশিক্ষণ শাখার এনআইডি উইংয়ে দিনের পর দিন ঘুরতে থাকা গ্রাহকদের অনেকেই জানান, নির্বাচন অফিসের অপেশাদার কর্মচারী ও ডাটা এন্ট্রি অপারেটররাই এসব ভুলের জন্য দায়ী। নির্বাচন কর্মকর্তারা বলছেন, অনেকে জেনে বা না জেনে এনআইডিতে শুধু ডাকনাম দিয়েছেন। কেউ আবার জন্ম তারিখ বা জন্মসালকে তেমন গুরুত্ব দেননি। ছবি ও ফিঙ্গার প্রিন্ট নেওয়ার আগে গ্রাহককে তথ্য মিলিয়ে দেখতে হয়; কিন্তু তারা সেটি না করে ফাইনাল এন্ট্রি করে দিচ্ছেন।

আবার এমনও দেখা গেছে, সংশোধিত কার্ডের সব তথ্য সঠিক থাকলেও, জন্মস্থানে দেওয়া হয়েছে অন্য দেশের নাম। মৌলভীবাজারের একজনের এনআইডি সংশোধনের পর দেখা যায় তার জন্মস্থানে লেখা ভেনেজুয়েলা। যা নিয়ে রীতিমতো তোলপাড় হয় দেশজুড়ে।

জাতীয় পরিচয়পত্র।
তিস্তা সেতুর ৪০ ভাগ কাজ শেষ, খুলতে যাচ্ছে সম্ভাবনার দুয়ার

নাগরিকদের হয়রানি কমাতে মাঠপর্যায়ে অযৌক্তিক কাগজপত্র চাওয়া থেকে বিরত থাকতে কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছিল নির্বাচন কমিশন। তাতেও ভোগান্তি কমেনি। বেশিরভাগ আবেদনই অযথা পাঠানো হচ্ছে প্রধান কার্যালয়ে। সেখানে অবহেলায় পড়ে থেকে ফাইলের স্তূপ বড় হচ্ছে। যে কারণে এনআইডি সংশোধনের জন্য গ্রামাঞ্চলের লাখ লাখ গ্রাহক ছুটে আসছেন রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের টেবিল পর্যন্ত তারা যেতেই পারেন না। পিএস, পিএ বা অফিস পিওনরা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে গ্রাহকদের ঘেঁষতেই দেন না বলে অভিযোগ তাদের। টাকা দিলে ফাইল নড়ে, নয়তো হদিস মেলে না—এমন অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।

এনআইডির দায়িত্বে থাকা নির্বাচন কর্মকর্তারা বলছেন, সংশোধনের জন্য আবেদনের প্রক্রিয়াই জানেন না বেশিরভাগ ভুক্তভোগী। অনেকেই স্থানীয় এলাকায় কম্পিউটারের দোকানের লোকজনের সঙ্গে চুক্তি করে প্রতারিত হচ্ছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন আগে এনআইডি করার কারণে এত দিনে অনেকের ব্যক্তিগত অবস্থার পরিবর্তন এসেছে। অনেকের শিক্ষাগত যোগ্যতা, বৈবাহিক অবস্থা, পেশাগত অবস্থা এসব তথ্য স্বাভাবিকভাবেই বদলেছে। অনেকের বাবা-মায়ের মৃত্যু হয়েছে, ঠিকানা বদল হয়েছে; কিন্তু এসব তথ্য সহজে হালনাগাদ না করতে পারার কারণে দুর্ভোগও বাড়ছে।

দেখা গেছে, শিক্ষিত বা সনদধারীদের এনআইডিতে ভুল কম। যাদের সনদ নেই, তাদের ভুল বেশি। কোনো ক্ষেত্রে সংশোধন প্রক্রিয়া দীর্ঘ হওয়ার কথা স্বীকার করে এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আবেদনকারীরা অনেকে তাদের পুরো নাম পাল্টে দিতে চান। এটি তদন্ত সাপেক্ষ। তাই দেরি হতে পারে। এ ছাড়া অনেকে বয়স কমানো বা বাড়ানোর আবেদন করেন। যার মধ্যে ফারাক থাকে অনেক বছরের। তারা নানা মতলবে এটি করতে পারেন। এগুলোর সহজে অনুমোদন দেওয়া হয় না।’

জনভোগান্তির কথা স্বীকার করে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল জানিয়েছেন, ভুলে ভরা জাতীয় পরিচয়পত্রের সংখ্যা প্রায় কোটির কাছাকাছি। এসব দ্রুত সংশোধনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এনআইডি নিয়ে ভোগান্তি হচ্ছে—এটা জানি। কিছু কিছু মানুষের জন্য আমাদের সুনাম নষ্ট হচ্ছে। তাই সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।

এ বিষয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক হুমায়ূন কবীর বলেন, অধিকাংশেরই ত্রুটি বয়স বা নাম সংশোধনজনিত। স্বপক্ষে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা না দিতে পারায় অনেকের এনআইডি সংশোধন করা যাচ্ছে না।

তিনি বলেন, মামলা থেকে বাঁচতে বা অন্য কোনো মতলবে অনেকে দ্বৈত ভোটার হচ্ছেন বা নাম-বয়স পাল্টে নতুন এনআইডি করছেন। এগুলো ঠেকাতে আমরা সতর্ক। তবে যাচাই-বাছাই করে তথ্য সঠিক পাওয়া গেলে সেটি সংশোধনযোগ্য। এক্ষেত্রে হয়রানির প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.
kalbela.com