হয়নি শহীদদের তালিকা, মেলেনি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি

কেরানীগঞ্জের ঘাটারচরে গণকবর।
কেরানীগঞ্জের ঘাটারচরে গণকবর।ছবি : কালবেলা

আজ ২৫ নভেম্বর। একাত্তরের এই দিনে পাকিস্তানি সেনারা ঢাকার কেরানীগঞ্জের ঘাটারচরে ১০০ থেকে ১২৫ নিরীহ মানুষকে হত্যা করে। এর মধ্যে স্থানীয় টানপাড়ায় তেঁতুলগাছতলায় প্রায় ৪৫ জন বিভিন্ন বয়সী পুরুষকে সারি করে দাঁড় করিয়ে হত্যা করে। সেদিনে পাকিস্তানি সেনাদের হিংস্রতায় পুরো এলাকা স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল।

একাত্তরের ২৫ নভেম্বর মধ্যরাতে গানবোট থেকে কেরানীগঞ্জের শাক্তা ইউনিয়নের ওয়াশপুর ঘাটে নেমেছিল প্রায় দেড়শ পাকিস্তানি সেনা। ভোরের আলো ফোটার আগেই তারা তারানগর ইউনিয়নের ঘাটারচর গ্রামের পূর্ব পাশ ঘেরাও করে। তাদের আগমন টের পেয়ে অনেকেই বাড়ি থেকে উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করছিলেন। তাদের দেখামাত্রই পাকিস্তানি সেনারা গুলি চালিয়ে হত্যা করে। ঢাকার ওয়াশপুর, মোহাম্মদপুর, খালপাড়, সাভারের লুটেরচর থেকে অনেক শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছিলেন বিভিন্ন বাড়িতে ও ঘাটারচর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। তাদেরও গুলি করে হত্যা করা হয় বলে জানান ঘাটারচরের শহীদ পরিবারের সদস্য ও প্রত্যক্ষদর্শী মো. শমসের আলী।

শমসের আলী বলেন, ‘পাকিস্তানি সেনারা আমার বড় ভাই দরবেশ আলীকে বাড়ির সামনের রাস্তায়, মেজ ভাই আরজ আলীসহ স্থানীয় দুই যুবককে ঘাটারচর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে গুলি করে হত্যা করে। দুই ভাইয়ের স্ত্রী-সন্তানরা অনেক কষ্ট করেছেন। বড় ভাইয়ের স্ত্রী-পুত্র বিনা চিকিৎসায় ধুঁকে ধুঁকে মারা গেছেন।’

একাত্তরের ৯ মাসজুড়ে ১ নম্বর ঘাটারচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দুটি টিনের ঘরে ঢাকা ও এর আশপাশের লোকজন আশ্রয় নিয়েছিলেন। একদল পাকিস্তানি সেনা শরণার্থীদের শ্রেণিকক্ষ থেকে টেনে বের করে বিদ্যালয়ের মাঠে দাঁড় করায়। অন্যদল গ্রামে ঢুকে বাড়ি, রাস্তা থেকে ৩-৪ জনকে ধরে এনে বিদ্যালয়ের মাঠে হত্যা করে। এভাবেও অনেককে নির্মমভাবে হত্যা করে।

একই গ্রামের আপছু নামে আরেক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, ‘ঘাটারচর গ্রামে যাকে যেখানে পেয়েছে, সেখানেই তাকে হত্যা করে। কাশেম নামে এক যুবক পাকিস্তানি সেনাদের ভয়ে ছোট বোনকে ফুপুর বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। তিনিও কিছুক্ষণ পর ফুপুর বাড়িতে চলে আসেন। পাকিস্তানি সেনারা ওই বাড়িতে ঢুকে কাশেম, গ্রামের এক জামাই আর সাভারের লুটেরচরের এক ব্যক্তিকে ধরে নিয়ে স্কুলের মাঠে হত্যা করে। আমার দুই চাচাতো ভাই লোকমান হোসেন ও সোলেমান হোসেনকে তাদের বাড়ির কাছে হত্যা করে। দেশ স্বাধীন হলে বঙ্গবন্ধু ২ হাজার টাকার চেক দিয়েছে শহীদ পরিবার হিসেবে। এরপর আর কোনো সরকার আমাদের সহযোগিতা করেনি। খবরও নেয়নি।’

শহীদ লোকমান হোসেনের স্ত্রী শাহানারা বেগম বলেন, ‘স্বামীকে হারিয়ে তিন মেয়ে ও দুই ছেলে নিয়ে অথৈ সাগরে পড়ি। বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালে দেশে ফিরে শহীদ পরিবার হিসেবে ২ হাজার টাকার চেক, দুই বান্ডিল টিন দিয়েছিলেন ঘর তোলার জন্য। এরপর আর কেউ আমাদের খোঁজ নেয়নি। শহীদ হিসেবে আমার স্বামী রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পর্যন্ত পাননি। শহীদ পরিবারের স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য ‘একাত্তরে শহীদ পরিবার স্মৃতি সংসদ’-এর পক্ষ থেকে আমার নাতি অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ এনামুল হক মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ে একটি আবেদনও করেন ১৯৯৪ সালে। আজও কোনো সাড়া পাইনি।’

মুক্তিযোদ্ধা মো. ইমারত হোসেন কালবেলাকে জানান, ‘শরণার্থীরা হানাদারদের হাত থেকে বাঁচতে ঘাটারচরের দিকে চলে এসেছিলেন। অসংখ্য শরণার্থী বিদ্যালয়ে, এলাকাবাসীর বাড়িঘরে আশ্রয় নিয়েছিলেন। এখান থেকে তারা অন্য জায়গায় চলে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু নিরাপদ স্থানে তাদের আর যাওয়া হয়নি। এখানেই শহীদ হন। ঘাটারচর সামাজিক কবরস্থানের গেটের বাইরের বাম দিকে কয়েকটি গর্তে শহীদদের লাশ পুঁতে রাখা হয়। একেকটি গর্তে পাঁচ থেকে ছয়জনকে পুঁতে রাখা হয়েছিল।’ এখানে পাশাপাশি চার-পাঁচটি গণকবরের হদিস পাওয়া গেলেও তা বাঁধানো নয়। একটি দেয়ালে ‘গণকবর’ লেখা একটি ব্যানার পিন দিয়ে আটকে রাখা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা সিদ্দিকুর রহমান কালবেলাকে বলেন, ‘২০২০ সালে সেনাবাহিনী চারটি গণকবরে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করতে চেয়েছিল। সামাজিক কবরস্থানের পাশে হওয়ায় স্থানীয় জনগণ এখানে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করতে বাধা দেয়। পরে বিদ্যালয়ের মাঠের কোনায় ঘাটারচর গণহত্যায় স্মৃতি নামফলক তৈরি হয়। এখানে ৫২ জন শহীদের নামের তালিকা পাওয়া যায়। তারা সবাই ঘাটারচরের বাসিন্দা। শহীদদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিলেন শরণার্থী। ফলে তাদের নাম ও সংখ্যা জানা সম্ভব হয়নি।’

এ প্রসঙ্গে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি, লেখক ও সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘একাত্তরের গণহত্যাকারীদের শাস্তির জন্য সরকারকে দ্রুত শহীদদের তালিকা প্রণয়নের উদ্যোগ নিতে হবে। আমাদের এটাও মনে রাখতে হবে, অধিকাংশ সময় ক্ষমতায় ছিল স্বাধীনতাবিরোধী শাসকরা। এ কারণে শহীদদের গণহত্যাকারীদের বিচার হয়নি। সরকারকে দ্রুত শহীদদের তালিকা করে তাদের স্বীকৃতি দিতে হবে।’

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.
kalbela.com