ওয়াদা চাই, নৌকায় ভোট দেবেন

জনসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
জনসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।ছবি : কালবেলা

আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নৌকা মার্কায় ভোট চেয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেছেন, আগামী নির্বাচনে আমি আপনাদের কাছে ওয়াদা চাই, নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে আওয়ামী লীগকে আপনাদের সেবা করার সুযোগ দেবেন।

গতকাল বৃহস্পতিবার যশোরে শামস-উল হুদা স্টেডিয়ামে জেলা আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসভায় তিনি এ আহ্বান জানান। এ সময় জনতা দুই হাত তুলে চিৎকার করে তার কথায় সাড়া দেন। করোনাভাইরাসের নিষেধাজ্ঞার কারণে প্রায় আড়াই বছর পর ঢাকার বাইরে এটাই প্রথম সশরীরে প্রধানমন্ত্রীর কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ।

প্রায় পাঁচ বছর পর যশোরে আসেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জনসভা উপলক্ষে দুপুরের আগেই কানায় কানায় ভরে যায় সভাস্থল, পরিণত হয় জনসমুদ্রে।

সকাল ৭টা থেকে জনসভাস্থলে আসতে শুরু করেন নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ। অনেকেই আসেন দল বেঁধে বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে। পুরো শহরে বিরাজ করে উৎসবের আমেজ। সমাবেশস্থল ও আশপাশের এলাকা রঙিন হয়ে ওঠে নানা রঙের টি-শার্ট, ক্যাপ ও শাড়ি পরা নেতাকর্মীতে। অনেকেই নিয়ে এসেছিলেন ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড। স্লোগানমুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।

সভামঞ্চে ছিলেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আবদুর রাজ্জাক, জাহাঙ্গীর কবির নানক, আবদুর রহমান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল-আলম হানিফ, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাংগঠনিক সম্পাদক বিএম মোজাম্মেল হক, মির্জা আজম, এসএম কামাল হোসেন, দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া, সামছুন্নাহার চাঁপা, কার্যনির্বাহী সদস্য ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, আনোয়ার হোসেন, সাহাবুদ্দিন ফরাজী, ইকবাল হোসেন অপু, আনিসুর রহমান, মেরিনা জাহান কবিতা ও পারভিন জামান কল্পনা।

যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শহিদুল ইসলাম মিলনের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক শাহীন চাকলাদারের পরিচালনায় জনসভায় বক্তব্য দেন বাগেরহাট-১ আসনের সংসদ সদস্য শেখ হেলাল উদ্দিনসহ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা।

গুজবে কান না দিতে আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বিএনপির কাজই হলো সবসময় গুজব ছড়ানো। নিজেরা কিছু করতে পারে না। ক্ষমতায় যখনই আসছে, তখন লুটপাট করে খেয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জিয়া যখন মারা যায়, কোনো কিছু রেখে যায়নি। ভাঙা সুটকেস আর ছেঁড়া গেঞ্জি। কিন্তু সেই ভাঙা সুটকেস হয়ে গেল জাদুর বাক্স। যে বাক্স দিয়ে কোকো আর তারেক হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েছে। দেশের টাকা বিদেশে পাচার করেছে। তার শাস্তিও হয়েছে। আজ তারেক সাজাপ্রাপ্ত আসামি। দেশের অর্থ বিদেশে পাচার করার মানি লন্ডারিংয়ের অপরাধে সাত বছরের জেল আর ২০ কোটি টাকা জরিমানা হয়েছে। অস্ত্র চোরকারবারি করতে গিয়ে দশ ট্রাক অস্ত্র নিয়ে ধরা খেয়েছে। সেখানেও সাজা হয়েছে। একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা করে আমাকেসহ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের হত্যা করতে চেয়েছিল। সেই মামলায় সাজাপ্রাপ্ত। আর খালেদা জিয়া এতিমের টাকা মেরে দিয়ে সাজাপ্রাপ্ত। যে দলের নেতা সাজাপ্রাপ্ত, তারা জনগণকে কী দেবে?’

বিএনপি খুন করা, হত্যা করা, অত্যাচার করা, নির্যাতন করাসহ জেল-জুলুম-মামলা করা ছাড়া কিছুই দিতে পারেনি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘রক্ত আর হত্যা ছাড়া বিএনপি আর কিছু দিতে পারেনি। তারা শুধু পারে মানুষের রক্ত চুষে খেতে।’

পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়ের রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘এ হত্যাকাণ্ডে ছিল খুনি জিয়া-মোশতাক। বিচার চাওয়ার অধিকার আমার ছিল না। মা-বাবা-ভাই হারিয়েও বিচার চাইতে পারব না! তার পরও সবকিছু মাথায় নিয়ে ফিরে এসেছি বাংলার জনগণের কাছে। একটাই কারণ, এই জাতির জন্য আমার বাবা সারাজীবন সংগ্রাম করেছেন। আমার একটাই লক্ষ্য ছিল, বাংলাদেশের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। সেই লক্ষ্য নিয়েই কাজ করে যাচ্ছি। তিনি আরও বলেন, আপনাদের ভোটে নির্বাচিত হয়েই বারবার ক্ষমতায় এসেছি। আর ক্ষমতায় এসেছি বলেই এত উন্নয়ন করা সম্ভব হয়েছে।’

রিজার্ভ নিয়ে সমস্যা নেই : শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি দেখি কেউ কেউ রিজার্ভ নিয়ে কথা বলে। রিজার্ভের কোনো সমস্যা নাই। অনেকে বলে ব্যাংকে টাকা নাই। কেউ কেউ ব্যাংক থেকে টাকা তোলে। ব্যাংকের টাকা তুলে ঘরে রাখলে তো চোরে নিয়ে যাবে। চোরের জন্য সুযোগ করে দেওয়া। কিন্তু ব্যাংকে টাকা নেই—এই কথাটা মিথ্যা।’

সরকারপ্রধান বলেন, ‘আমি বাংলাদেশ ব্যাংকের গর্ভনরসহ তাদের সঙ্গে মিটিং করেছি। আমাদের এ বিষয়ে কোনো সমস্যা নেই। প্রতিটি ব্যাংকে যথেষ্ট টাকা আছে। আমাদের রেমিট্যান্স আসছে, বিদেশ থেকে বিনিয়োগ আসছে। আমদানি-রপ্তানি আয়, ট্যাক্স কালেকশন বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ বিশ্বের অন্য দেশ যেখানে হিমশিম খাচ্ছে, নিজেরা অর্থনৈতিক মন্দায় ভুগছে। সেখানে বাংলাদেশ এখনো যথেষ্ট শক্তিশালী আছে। করোনাভাইরাসের কারণে সারা পৃথিবীতে আজ অর্থনৈতিক মন্দা। কিন্তু বাংলাদেশে আমরা অর্থনীতিকে এখনো শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছি।’

রিজার্ভ নিয়ে সমালোচনার জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ‘রিজার্ভ কোথাও যায়নি। মানুষের কাজে লেগেছে। জ্বালানি তেল কিনতে হয়েছে, খাদ্যশস্য কিনেছি। বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছি। করোনার টিকা ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করেছি। এসব কাজে রিজার্ভ থেকে খরচ করতে হয়েছে আমাদের। কারণ, আমরা সবসময় মানুষের কথা চিন্তা করে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চালাচ্ছি।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বারবার আমাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল, সাতক্ষীরায় হামলা করেছিল, গ্রেনেড হামলা করেছিল, তখনো আমি বেঁচে গেছি, জানি না আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এই আঘাত থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে, বোধ হয় আমার ওপর দায়িত্ব দিয়েছে বাংলার জনগণের ভাগ্য পরিবর্তন করবার জন্য।’

তিনি বলেন, ‘ইনশাআল্লাহ এই বাংলাদেশ দরিদ্র থাকবে না, এই বাংলাদেশ উন্নত সমৃদ্ধ হবে। এই বাংলাদেশকে উন্নত করে জাতির পিতার স্বপ্ন পূরণ করব।’

পদ্মা সেতু ও মধুমতী সেতু হওয়ায় এই অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে ঢাকার যোগাযোগ ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তনের কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি যশোর বিমানবন্দরকে আরও আধুনিকায়ন করার কথাও জানান।

যশোর স্টেডিয়াম নতুন করে ১১ স্তরবিশিষ্ট করে নির্মাণ করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বলেন, ছাত্র-যুবা সবাইকে খেলাধুলা ও সংস্কৃতি চর্চা করতে হবে। মাদক থেকে দূরে থাকতে হবে। জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাস থেকে দূরে থাকতে হবে।

করোনাকালে বাইরে জনসভা করতে পারি নাই উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজ আমার প্রথম জনসভা যশোরে। যে মাটিতে আমার নানা শুয়ে আছেন, যে যশোর মুক্তিযুদ্ধের সময় বিরাট অবদান রেখেছে। খেজুরের গুড়ের যশোর, ফুলের যশোর, উন্নয়নের দৃষ্টান্ত।

যশোরের সঙ্গে নাড়ির টান রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমার নানা শেখ জহিরুল হক, তিনি যশোরের চাকরি করতেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, আমার মায়ের বয়স যখন মাত্র তিন বছর তখন তার বাবা (আমার নানা) এখানে মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু তখন রাস্তাঘাট এত খারাপ ছিল যে, তার লাশ টুঙ্গিপাড়া নিয়ে যেতে পারে নাই। এই যশোরের মাটিতেই তাকে কবর দেওয়া হয়েছিল।

মঞ্চে বসে দুরবিন ব্যবহার

সভাস্থলের চারপাশে লাখো লাখো মানুষের উপস্থিতি প্রধানমন্ত্রীকে উদ্বেলিত করে। মঞ্চ থেকে দূরে যারা দাঁড়িয়ে ছিলেন তাদের দেখার জন্য প্রধানমন্ত্রী মঞ্চে বসে দুরবিন দিয়ে বারবার দেখতে থাকেন।

বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘দূরে যারা আছেন তাদের হয়তো দেখতে পাচ্ছি না, কিন্তু আপনারা আছেন আমার হৃদয়ে।’

এ প্রসঙ্গে তিনি তখন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার চরণ উদ্ধৃত করে বলেন, ‘নিঃস্ব আমি রিক্ত আমি, দেবার কিছু নাই, আছে শুধু ভালোবাসা, দিলাম আমি তাই।’

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.
kalbela.com