রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আশ্রয়ে ছিল দুই শীর্ষ জঙ্গি

কক্সবাজারের কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্প সংলগ্ন এলাকা থেকে দুই জঙ্গি গ্রেপ্তার।
কক্সবাজারের কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্প সংলগ্ন এলাকা থেকে দুই জঙ্গি গ্রেপ্তার।ছবি : সংগৃহীত

নতুন জঙ্গি সংগঠন ‘জামা’আতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া’র জঙ্গিরা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছে। গতকাল সোমবার কক্সবাজারের কুতুপালং ক্যাম্পে চিরুনি অভিযানে সংগঠনটির শীর্ষ দুই নেতাকে গ্রেপ্তারের পর এ তথ্য জানিয়েছে র‌্যাব। ওই অভিযানে অস্ত্রধারীদের সঙ্গে র‌্যাবের দীর্ঘক্ষণ গুলি বিনিময়ও হয়।

গ্রেপ্তার দুজনের মধ্যে মাসিকুর রহমান ওরফে রণবীর ওরফে মাসুদ সংগঠনটির সামরিক শাখার প্রধান ও শূরা সদস্য এবং আবুল বাশার ওরফে আলম বোমা বিশেষজ্ঞ বলে র‌্যাব কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। চিরুনি অভিযানে ওই জঙ্গিদের কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, পিস্তলের তিনটি ম্যাগাজিন, ১০ রাউন্ড গুলি, একটি খালি কার্তুজ, দুটি একনলা (দেশীয়) বন্দুক, ১১টি ১২ বোরের কার্তুজ, ১০০ রাউন্ড পয়েন্ট টুটু বোরের গুলি, ২ লাখ ৫৭ হাজার টাকা উদ্ধারের কথাও জানানো হয়েছে।

দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কিছু তরুণ কথিত হিজরতের নামে ঘর ছেড়ে যায়। তাদের সন্ধান করতে গিয়েই গত বছরের অক্টোবরে নতুন ‘জামা’আতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া’র অস্তিত্ব পায় র‌্যাব। নতুন সংগঠনটি পাহাড়ের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্গে মিলে দুর্গম এলাকায় প্রশিক্ষণ ক্যাম্প গড়ে তোলার তথ্যও সামনে আসে। পাহাড়ি বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন কেএনএফ বা বোম পার্টির সদস্যরা এদের প্রশিক্ষণ দেয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা পাহাড়ি এলাকায় অভিযান চালিয়ে জামা’আতুল আনসারের বেশ কয়েক সদস্যকে গ্রেপ্তারও করে।  সর্বশেষ রোহিঙ্গা ক্যাম্পেই জামা’আতুল আনসারের সামরিক প্রধান রণবীরের আশ্রয় নেওয়ার তথ্য দেওয়া হলো। তবে তার বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি র‌্যাব কর্মকর্তারা।   

ভোর থেকে র‌্যাবের সঙ্গে জামা’আতুল আনসারের সদস্যদের তুমুল গোলাগুলির পর সকাল সাড়ে ১০টার দিকে কুতুপালং ৭ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকায় সংবাদ সম্মেলনে আসেন র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন। তিনি বলেন, বিভিন্ন সূত্রে গোয়েন্দা তথ্যে তারা নিশ্চিত হন যে, রণবীর ও বাশার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অবস্থান করছে। ওই তথ্যের ভিত্তিতে কুতুপালং ৭ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ‘এ’ ব্লক ঘিরে সোমবার ভোর ৫টায় যৌথ চিরুনি অভিযান শুরু করেন তারা। র‌্যাবের অবস্থান বুঝতে পেরে জঙ্গিরা পাশের পাহাড়ে চলে যায়। র‌্যাব ওখানে অভিযান শুরু করলে সশস্ত্র লোকজন র‌্যাবকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। আত্মরক্ষার্থে র‌্যাব সদস্যরাও পাল্টা গুলি চালায়। কিছুক্ষণ পর সেখান থেকে দুই জঙ্গি নেতাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, র‌্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখা, র‌্যাব-২, র‌্যাব-৩ এবং র‌্যাব-১৫-এর সদস্যরা এ অভিযানে অংশ নেন। নতুন জঙ্গি সংগঠনটির বিরুদ্ধে র‌্যাবের ধারাবাহিক অভিযানের কথা জানিয়ে সংস্থাটির মুখপাত্র খন্দকার মঈন বলেন, গত বছরের ২০ অক্টোবর পার্বত্য চট্টগ্রামের বিলাইছড়ি থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে পাহাড়ে লুকিয়ে থাকা অবস্থায় জামা’আতুল আনসারের সাত জঙ্গি এবং তাদের সহায়তাকারী তিনজন কেএনএফ (বম পার্টি) সদস্যকে আটক করা হয়। সেখানে গ্রেপ্তারদের মধ্যে জামা’আতুল আনসারের সামরিক শাখার উপ-প্রধান সৈয়দ মারুফ আহমেদ মানিকও ছিলেন। তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদে সংগঠনটির সামরিক শাখার প্রধান মাসুকুর রহমান রণবীরের কার্যক্রম এবং সম্ভাব্য অবস্থান সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়। ওই তথ্যের ভিত্তিতে র‌্যাব দেশের বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালায়। এরই ধারাবাহিকতায় রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকায় এই অভিযান চালানো হয়।

র‌্যাব কর্মকর্তারা বলছেন, অক্টোবর মাসে র‌্যাব কথিত হিজরতের নামে বাড়িছাড়া যে ৫৫ জনের তালিকা প্রকাশ করেছিল, সেখানে আবুল বাশারের নামও ছিল। গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বাশার জানিয়েছেন, গত বছরের ৩ অক্টোবর র‌্যাব এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যৌথ অভিযান শুরু হওয়ার পর তিনি তার দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পাহাড় থেকে পালিয়ে সিলেটে যান। সেখানে সামরিক শাখার প্রধান রণবীরের কাছে আশ্রয় নেন। সেখান থেকে তারা দুজন বেশকিছু দিন আগে কুতুপালং ৭ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এসে আত্মগোপন করেন।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে কমান্ডার মঈন বলেন, ‘নতুন সংগঠনের সদস্যরা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কেন আশ্রয় নিল, তাদের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের যোগসূত্র কীভাবে, কারা তাদের আশ্রয় দিয়েছিল–সে তদন্ত চলছে।

এদিকে, রোহিঙ্গা ক্যাম্প ঘিরে জঙ্গি তৎপরতার খবরে উখিয়ার স্থানীয় লোকজনের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। তারা বলছেন, রোহিঙ্গাদের মধ্য থেকে একদল সন্ত্রাসীদের অপতৎপরতার পর ক্যাম্প ঘিরে জঙ্গি অস্তিত্ব তাদের আতঙ্কে ফেলেছে। কুতুপালং এলাকার বাসিন্দা ও রাজাপালং ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য হেলাল উদ্দিন কালবেলাকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে আমরা রোহিঙ্গা সন্ত্রাস থামাতে চিৎকার করে আসছিলাম। এখন নতুন করে যোগ হয়েছে জঙ্গি আতঙ্ক। বিয়ষটি স্থানীয়দের নতুন করে আতঙ্কে ফেলেছে।’

স্থানীয় পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী কালবেলাকে বলেন, ‘আমরা আগেই সন্দেহ করছিলাম রোহিঙ্গাদের সঙ্গে জঙ্গি কানেকশন রয়েছে। এবার এটি প্রমাণিত হলো।’

এদিকে র‌্যাব বলছে, তারা এখন পর্যন্ত জামা’আতুল আনসারের অন্তত ৩৮ জন সদস্যকে গ্রেপ্তার করতে পেরেছে। এর মধ্যে রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকা থেকে সংগঠনটির সামরিক শাখার প্রধান রণবীরকেও গ্রেপ্তার করা সম্ভব হলো। তবে ওই সংগঠনের প্রধান কে বা তার অবস্থান কী, তা এখনো জানানো হয়নি সংস্থাটি থেকে। যদিও ঢাকা মহানগর পুলিশের জঙ্গি দমন ইউনিট সিটিটিসির পক্ষ থেকে সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়েছিল, জামা’আতুল আনসারের মূল ব্যক্তি শামিন মাহফুজ। এই শামিন রংপুর ক্যাডেট কলেজ থেকে বহিষ্কৃত একজন সাবেক শিবির কর্মী। কেএনএফ বা বম পার্টির প্রধান নাথান বমের সঙ্গে এই শামিনের যোগাযোগের ভিত্তিতেই নতুন জঙ্গি সংগঠনটি পাহাড়মুখী হয়। ওই দুজনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন।

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.
logo
kalbela.com