শর্ত মেনে মেলায় থাকতে পারবে আদর্শ প্রকাশনী

শর্ত মেনে মেলায় থাকতে পারবে আদর্শ প্রকাশনী

আলোচিত বই প্রদর্শন না করে আদর্শ প্রকাশনী স্টল বরাদ্দের জন্য পুনরায় আবেদন করলে বিবেচনা করবে বাংলা একাডেমির অমর একুশে বইমেলা পরিচালনা কমিটি-২০২৩। তবে অমর একুশে বইমেলা-২০২৩ নীতিমালা ও নিয়মাবলি অনুযায়ী আলোচিত-সমালোচিত বই প্রদর্শন করলে কোনো অবস্থাতেই স্টল পাবে না আদর্শ প্রকাশনী। এদিকে বাংলা একাডেমির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, একুশে বইমেলা শুধু বাংলা একাডেমির বইমেলা নয়। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পুলিশ বাহিনী, বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি, বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন। এসব অংশীদার সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিদের নিয়ে মেলা পরিচালনার জন্য ৩১ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি রয়েছে। কমিটি থেকেই আদর্শ প্রকাশনীর ফাহাম আব্দুস সালামের আলোচিত ‘বাঙালির মিডিয়োক্রিটির সন্ধানে’ বইটির বিষয়ে আপত্তি তোলা হয় এবং বইটি মেলায় প্রদর্শন না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। 

বিষয়টি নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক মুহম্মদ নূরুল হুদা। তিনি একাডেমি পরিচালক ও অমর একুশে বইমেলা পরিচালনা কমিটি-২০২৩ এর সদস্য সচিব মাহাবুব রহমানের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। পরে সদস্য সচিব মাহাবুব রহমান কালবেলাকে বলেন, আমাদের বইমেলা নীতিমালা ও নিয়মাবলি মেনে যদি আদর্শ প্রকাশনী আবেদন করে তাহলে বিবেচনায় নেওয়া হবে। আমি সদস্য সচিব হিসেবে বিষয়টি উত্থাপন করব পরিচালনা কমিটিতে। কমিটিই সিদ্ধান্ত নেবে। তিনি আরও বলেন, অনেক অংশীজনকে নিয়েই অমর একুশে বইমেলার পরিচালনা কমিটি করা হয়েছে। সেই কমিটিই আদর্শ প্রকাশনীর বিতর্কিত ‘বাঙালির মিডিয়োক্রিটির সন্ধানে’ বইটি মেলায় প্রদর্শন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখানে এককভাবে বাংলা একাডেমির করার কিছু নেই।

এ বিষয়ে কথা বলতে আদর্শ প্রকাশনীর প্রকাশক মাহাবুব রহমানের একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি। এমনকি প্রকাশনাটির বিপণন বিভাগের প্রধান কাওসার হামিদের সঙ্গে যোগাযোগ হলে তিনি প্রকাশকের সঙ্গে কথা বলে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন বলে জানালেও এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তিনি যোগাযোগ করেননি।

পরিচালনা কমিটির একাধিক সদস্য জানান, আদর্শ প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত লেখক ফাহাম আব্দুস সালাম রচিত ‘বাঙালির মিডিয়োক্রিটির সন্ধানে’ বইটি নিয়ে বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা হলে অমর একুশে বইমেলা পরিচালনা কমিটি বইটি সংগ্রহ করে। বইটি পাঠ করে দেখা যায়, অমর একুশে বইমেলা-২০২৩ ‘নীতিমালা ও নিয়মাবলি’-এর ১৪নং অনুচ্ছেদের উপ-অনুচ্ছেদ ১৪.১৪, ১৪.১৫-এ শর্তাবলির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এজন্য এ বিষয়ে ‘আদর্শ’-এর প্রকাশক মাহাবুব রহমানের বক্তব্য শোনার জন্য বাংলা একাডেমির পরিচালক ও বইমেলা পরিচালনা-২০২৩ কমিটির সদস্য সচিব ডা. কে এম মুজাহিদুল ইসলাম মোবাইল ফোনে তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পাশাপাশি বই নিয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিরসনের জন্য তাকে আহ্বান জানানো হয়। এ সময় বইমেলার সদস্য সচিব বইটি বইমেলায় প্রদর্শিত হবে না–এই মর্মে একটি লিখিত বক্তব্য প্রদান এবং আসন্ন বইমেলার নীতিমালা অনুসরণ করতে মাহাবুবকে আহ্বানও জানান। এর উত্তরে মাহাবুব রহমান এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন না বলে তার অবস্থান ব্যক্ত করেন।

জানা গেছে, পরে আদর্শ প্রকাশনীর প্রকাশক মেলা পরিচালনা কমিটিকে জানান, অমর একুশে বইমেলার বিদ্যমান নীতিমালা বাংলাদেশের সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে তিনি বিশ্বাস করেন। তিনি বইমেলার এই নীতিমালা মানেন না বলে স্পষ্টভাবে জানান। পাশাপাশি তিনি স্টল বরাদ্দ না পেলে আদালতের শরণাপন্ন হবেন। প্রয়োজনে তিনি বিদেশি সহযোগিতা গ্রহণের কথাও বলেন, যা গত রোববার বাংলা একাডেমি থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতেও উল্লেখ করা হয়েছে।

জানা গেছে, ‘আদর্শ’-এর আলোচিত বইটির ১৫নং পৃষ্ঠায় বাঙালি জাতিসত্তা; ১৬নং পৃষ্ঠায় বিচার বিভাগ, বিচারপতিগণ, বাংলাদেশের সংবিধান, বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের সদস্যবৃন্দ; ২০নং পৃষ্ঠায় বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ এবং ৭১নং পৃষ্ঠায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্পর্কে অশ্লীল, রুচিগর্হিত, কটাক্ষমূলক বক্তব্য প্রদান করা হয়েছে। এসব বক্তব্য বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯(২) অনুচ্ছেদে বর্ণিত মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, যুক্তিসংগত বিধিনিষেধ সাপেক্ষে বাক ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতার অধিকারের পরিপন্থি।

সংবিধানে বলা আছে ‘৩৯(২) রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশি রাষ্ট্রসমূহের সহিত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, শালিনতা বা নৈতিকতার স্বার্থে কিংবা আদালত অবমাননা, মানহানি বা অপরাধ সংঘটনে প্ররোচনা সম্পর্কে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসংগত বাধানিষেধ সাপেক্ষে (ক) প্রত্যেক নাগরিকের বাক ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতার অধিকারের এবং (খ) সংবাদ ক্ষেত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হইল।’ এ ছাড়া বইটি অমর একুশে বইমেলা-২০২৩-এর ‘নীতিমালা ও নিয়মাবলি’-এর অনুচ্ছেদ ১৪.১৪ ও ১৪.১৫-এর পরিপন্থি। নীতিমালার ১৪.১৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, অশ্লীল, রুচিগর্হিত, জাতীয় নেতাদের প্রতি কটাক্ষমূলক, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়–এমন বা জননিরাপত্তার জন্য বা অন্য যে কোনো কারণে বইমেলার পক্ষে ক্ষতিকর কোনো বই বা কোনো পত্রিকা বা অন্য কোনো দ্রব্য অমর একুশে বইমেলায় বিক্রি, প্রচার ও প্রদর্শন করা যাবে না।

একাডেমি বা বইমেলা পরিচালনা কমিটি যদি বইমেলায় কোনো বই, ম্যাগাজিন, লিফলেট বা এ জাতীয় অন্য কোনো দ্রব্য বিশেষ কারণে বা উদ্ভূত পরিস্থিতিতে প্রচার বা প্রদর্শন বা বিক্রি করা বাঞ্ছনীয় বিবেচনা না করে তাহলে কোনো অংশগ্রহণকারী তা প্রদর্শন বা প্রচার বা বিক্রি করতে পারবেন না। একাডেমি বা বইমেলা পরিচালনা কমিটি কর্তৃক প্রদত্ত নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এ ধরনের দ্রব্যাদি অংশগ্রহণকারী তার স্টল থেকে সরিয়ে ফেলবেন। এ বিষয়ে একাডেমি বা বইমেলা পরিচালনা কমিটির সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে এবং এর বিরুদ্ধে কোনো আপত্তি তোলা যাবে না। এ সিদ্ধান্ত কোনো অংশগ্রহণকারী যদি মানতে ব্যর্থ হন তাহলে তার স্টল বরাদ্দ বাতিল হবে, তার জমা দেওয়া টাকা ফেরত দেওয়া হবে না এবং ভবিষ্যতে তিনি মেলায় অংশগ্রহণ করতে পারবেন না।

আর ১৪.১৫ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ক. বইমেলায় অমর একুশে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ ও সামাজিক মূল্যবোধের পরিপন্থি  কোনো বই/পত্রিকা/ক্যাসেট/সিডি/ ডিভিডি/পোস্টার ইত্যাদি সংরক্ষণ, প্রদর্শন বা বিক্রি করা যাবে না। খ. দেশি-বিদেশি কোনো পাইরেটকৃত বই প্রদর্শন বা বিক্রি করা যাবে না।

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.
logo
kalbela.com