জঙ্গিবাদে মা, ছেলেকেও পাঠিয়েছেন হিজরতে

র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়ার সদস্যরা।
র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়ার সদস্যরা।ছবি : কালবেলা

নারায়ণগঞ্জ থেকে আবু বক্কর ওরফে রিয়াসাদ রাইয়ান নামক এক তরুণ গত মার্চ মাসে নিরুদ্দেশ হয়। এই ঘটনায় তার পরিবার সংশ্লিষ্ট থানায় একটি জিডি দায়ের করেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনির নিরুদ্দেশ ৫৫ জনের তালিকাতেও এই আবু বক্করের নাম রয়েছে।

কিন্তু গত ৩ নভেম্বর র‌্যাব নতুন জঙ্গি সংগঠন ‘জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া ‘ মহিলা শাখার বিষয়ে জানতে পারে। একজন মা উগ্রবাদে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন। শুধু তাই নয়, প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্যের নামে তার সন্তানকেও তথাকথিত হিজরতে পাঠিয়েছেন তিনি।

এমন তথ্যের ভিত্তিতে, নিজ সন্তানকে প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্যে তথাকথিত হিজরতের নামে প্রেরণের সঙ্গে জড়িত আম্বিয়া সুলতানা ওরফে এমিলিকে গত ৫ নভেম্বর উদ্ধার করে র‌্যাব। এরপর তাকে পরিবারের সান্নিধ্যে রেখে গত ৪ দিন ধরে ডি-রেডিকালাইজেশনের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়ার মধ্যে রাখা হয়। আম্বিয়া সুলতানা ওরফে এমিলি একটি স্বনামধন্য এয়ারলাইন্সে চাকরি করতেন। আর নিখোঁজ আবু বক্কর ওরফে রিয়াসাদ রাইয়ান তারই ছেলে। 

র‌্যাব জানায়, তার ছেলের শিক্ষক আল আমিনের মাধ্যমে তিনি ও তার ছেলে আবু বক্কর ২০২১ সালের প্রথম দিকে জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে ওই সংগঠনে যোগদান করে। পরবর্তীতে আবু বক্কর ২০২২ সালের মার্চ মাসে আল আমিনের নির্দেশনায় প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্যে তথাকথিত হিজরতের নামে বাড়ি থেকে বের হয়ে আর বাড়িতে ফিরে আসেনি। অন্যান্য প্রশিক্ষণ শেষে গত সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝিতে পাহাড়ে প্রশিক্ষণের জন্য আবু বক্করকে বান্দরবানে নিয়ে যায়।

আম্বিয়া সুলতানা ওরফে এমিলি তার ছেলে নিরুদ্দেশ হওয়ার কারণ ও অবস্থান সম্বন্ধে জানলেও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের কাছে তা গোপন করে এবং আবু বক্করের পিতা থানায় তার ছেলের নিখোঁজের জিডি করাসহ ছেলের সন্ধানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শরণাপন্ন হন। আবু বক্কর পাহাড়ে প্রশিক্ষণে যাওয়ার পর সন্তানের কোনো খোঁজখবর না পেয়ে তিনি সন্তানের চিন্তায় হতবিহ্বল হয়ে পড়েন এবং ভুল বুঝতে পেরে অনুশোচনা করতে থাকেন। পরবর্তীতে র‌্যাব সদস্যরা তার সন্ধান পেলে সন্তানকে ফিরে পেতে ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে আগ্রহ প্রকাশ করেন।

র‌্যাব গত ৪ দিন ধরে ডি-রেডিকালাইজেশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আম্বিয়া সুলতানা ওরফে এমিলিকে ডি-রেডিকালাইজড করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে তার পরিবারের কাছে রাখা হয়।

এ সময় তার দেয়া তথ্য মতে র‌্যাব রনি নামের একজন সম্পর্কে জানতে পারে এবং রনিই তার ছেলে আবু বক্করকে বাসা থেকে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে রনিকে খুঁজে বের করতে র‌্যাব গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করে এবং গত রাতে রনিসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব।

আজ ৯ নভেম্বর রাজধানীর কাওরান বাজারে এক সংবাদ সম্মলনে এসব কথা জানান র‍্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উয়ংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন। তিনি জানান, নতুন জঙ্গি সংগঠন ‘জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া’ অন্যতম অর্থ সরবরাহকারী ২ সদস্যসহ ৩ জনকে নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গত রাতে র‌্যাব সদর দপ্তর গোয়েন্দা শাখা ও র‌্যাব-১১ এর অভিযানে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।

তারা হলেন—নতুন জঙ্গি সংগঠন ‘জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া’-এর অন্যতম অর্থ সরবরাহকারী আব্দুল হাদি ওরফে সুমন ওরফে জন (৪০) ও মো. আবু সাঈদ ওরফে শের মোহাম্মদ (৩২) এবং দাওয়াতি কার্যক্রমে জড়িত মো. রনি মিয়াকে (২৯) গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। জব্দ করা হয় ৩টি উগ্রবাদী বই, ৯টি লিফলেট এবং ২টি ব্যাগ।

কমান্ডার খন্দকার আল মঈন জানান, গ্রেপ্তারকৃত আব্দুল হাদি ওরফে সুমন ওরফে জন সুনামগঞ্জের একটি মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করত। তিনি এক থেকে দেড় বছর পূর্বে সংগঠনের শূরা সদস্য সৈয়দ মারুফ ওরফে মানিকের মাধ্যমে ‘জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া’র আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়। তিনি ওই শাখার প্রধান রাকিবকে সাংগঠনিক কার্যক্রমের জন্য ৯ লাখ টাকা প্রদান করেন। এছাড়াও, তিনি প্রতি মাসে ২০ হাজার টাকা সংগঠনে চাঁদা প্রদান করতেন। তিনি ২ মাস পূর্বে হিজরতের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হন এবং অন্যান্য প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে পাহাড়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নেন। কিন্তু পাহাড়ে র‌্যাবের অভিযান চলতে থাকায় তিনি চট্টগ্রামসহ বেশ কয়েকটি জায়গায় কিছু দিন অবস্থান করে নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ডে এসে রনির মাধ্যমে পার্বত্য অঞ্চলে হিজরতে যাওয়ার পরিকল্পনা করছিলেন।

গ্রেপ্তার মো. আবু সাঈদ ওরফে শের মোহাম্মদ অনলাইন শরিয়াহ গ্র্যাজুয়েশন ইনস্টিটিউট নামক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা ও তত্ত্বাবধানের কার্যক্রমে জড়িত ছিলেন। তিনি এক থেকে দেড় বছর পূর্বে শূরা সদস্য ও অর্থ শাখার প্রধান রাকিবের মাধ্যমে উগ্রবাদে অনুপ্রাণিত হয়। তিনি এক মাস পূর্বে পাহাড়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হন। কিন্তু পাহাড়ে অভিযান চলমান থাকায় তিনি রনির মাধ্যমে বিভিন্ন কৌশলে পার্বত্য অঞ্চলে যাওয়ার জন্য একত্রিত হয়।

এ ছাড়াও গ্রেপ্তারকৃত মো. রনি মিয়া সম্পর্কে র‌্যাব জানায়, রনি স্থানীয় একটি বিদ্যালয় থেকে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করে। পরবর্তীতে তিনি নারায়ণগঞ্জে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ব্যবসা করত। তিনি এক বছর পূর্বে ছোটবেলার বন্ধু আল আমিন ওরফে আব্দুল্লাহর মাধ্যমে ‘জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়ার’ আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়। আল আমিনের নির্দেশে তিনি গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে আবু বক্করকে বান্দরবানে পৌঁছে দেয়। পাহাড়ে যেতে না পারায় তারা বিভিন্ন কৌশলে পার্বত্য অঞ্চলে পৌঁছে দেয়ার জন্য রনির শরণাপন্ন হয়ে নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকায় একত্রিত হয়েছিল বলেও জানিয়েছে র‌্যাব।

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.
kalbela.com