অভিবাসীদের মানবাধিকার লঙ্ঘনে জবাবদিহি জরুরি : সিয়োভান মুলালি

সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দিচ্ছেন মানবপাচারবিষয়ক বিশেষ দূত সিয়োভান মুলালি।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দিচ্ছেন মানবপাচারবিষয়ক বিশেষ দূত সিয়োভান মুলালি।ছবি : কালবেলা

অভিবাসী কর্মীদের প্রতি সংঘটিত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা জবাবদিহিতার আওতায় আনা জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা সফররত জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের মানবপাচারবিষয়ক বিশেষ দূত সিয়োভান মুলালি। তিনি বলেন, নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত ও অভিবাসী কর্মীদের অধিকার সুরক্ষায় নিয়োগকারী দেশগুলোর পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে আরও মনোযোগী হতে হবে এবং তদারকি বাড়াতে হবে।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরে মানবপাচারের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের সুরক্ষা জোরদারের পরামর্শ দিয়ে জাতিসংঘের এ বিশেষ দূত বলেন, দেশের অভ্যন্তরে যৌন নির্যাতন, বাল্যবিয়ে এবং জোরপূর্বক শ্রমের জন্য পাচারের শিকারদের অধিকার ও সুরক্ষা ব্যবস্থা বাড়াতে হবে। দেশের অভ্যন্তরের পাশাপাশি ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত অঞ্চলে এবং বিদেশে কর্মী অভিবাসনের ক্ষেত্রে বড় আকারের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

১০ দিনের ঢাকা সফরে শেষে রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে আজ বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। সিয়োভান মুলালি তার প্রথম বাংলাদেশ সফর এবং সফরকালে মানবপাচারবিষয়ক মানবাধিকারের ইস্যুগুলো পর্যবেক্ষণের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।

সিয়োভান মুলালি বলেন, বিশেষ করে অভিবাসী নারী কর্মীদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতে সংশ্লিষ্টদের বেশি মনোযোগ দেওয়া দরকার। একই সঙ্গে পাচার প্রতিরোধে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি কোনো বৈষম্য ছাড়া সহায়তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

জাতিসংঘের এই মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ নিরাপদ ও বৈধ অভিবাসন নিশ্চিতে নিয়োগ প্রক্রিয়ার সব পর্যায়ে জোরালো নজরদারির ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, আজকের বিশ্বে অভিবাসন জরুরি। তবে অবশ্যই গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিনিময়ে নয়।

তিনি বিদেশে চাকরির সুযোগ, কারা নিয়োগ দিচ্ছে, কর্মীদের সংকটের সুরাহা এবং সুরক্ষা নিশ্চিতে কর্মী পাঠানো দেশ, গ্রহণকারী দেশ, দূতাবাস, কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টদের মনিটরিং করার আহ্বান জানান। বৈধ অভিবাসন নিশ্চিত ও মানবপাচার প্রতিরোধে বাংলাদেশের নানা পদক্ষেপের প্রশংসা করে তিনি বলেন, উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন ও মনিটরিং করা গুরুত্বপূর্ণ।

যৌন নিপীড়ন, বাল্যবিয়ে ও জোরপূর্বক শ্রমের উদ্দেশ্যে দেশের বাইরে ও ভেতরে মানবপাচার প্রতিরোধে আরও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, পাচারের শিকারদের বৈষ্যমের ঊর্ধ্বে উঠে সহযোগিতা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশে শিশুপাচার উল্লেখজনক ঝুঁকিতে রয়েছে। এসব প্রতিরোধে জন্ম নিবন্ধন সহায়ক ভূমিকা রাখে। তিনি বিভিন্ন লিঙ্গ পরিচয়ের ব্যক্তিদের যৌন নিপীড়নের জন্য পাচার প্রতিরোধের বিষয়টিও গুরুত্বে সঙ্গে দেখার আহ্বান জানান।

সিয়োভান মুলালি আরও বলেন, জলবায়ুজনিত ক্ষতিসহ দেশের ভেতরেও যারা বাস্তুচ্যুতির কারণে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তরিত হয় তাদের ক্ষেত্রে ভয়ঙ্কর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে। বিশেষ ক্ষেত্রে নারীদের ক্ষেত্রে যৌন হয়রানি এবং শিশুদের ক্ষেত্রে জোড়পূর্বক শ্রমের ঘটনা ঘটে। এছাড়া দেশের অভ্যন্তরে যৌনকর্মীদের অনেকভাবে নির্যাতন করা হয়। পথশিশুরা সুরক্ষিত নেই, তাদের জোড়পূর্বক শ্রমে বাধ্য করা হয়। এসব ঘটনা উদ্বেগের। এসব পরিস্থিতির উন্নতিতে জরুরি ভিত্তিতে উদ্যোগ নিতে হবে।

নারী অভিবাসীদের প্রতি বৈষম্য ও হয়রানি প্রতিরোধে জাতিসংঘের এই বিশেষজ্ঞ দক্ষ শ্রমিক পাঠানোর ওপর জোর দিয়ে বলেন, প্রশিক্ষণ, তথ্য সরবরাহসহ নারী অভিবাসীদের সব ধরনের সুযোগ নিশ্চিত করে তাদের বর্তমান পরিস্থিতি উন্নয়নের পদক্ষেপ নিতে হবে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কিছু দেশে নারী কর্মীদের যৌন হয়রানি ও নির্যাতন হচ্ছে। এর সুরাহা করা দরকার। আন্তর্জাতিক আইনে নিয়োগকারী দেশগুলোর কিছু বাধ্যবাধকতা রয়েছে। যেসব দেশে কর্মী পাঠানো হয় সেখানে কর্মীদের সঙ্গে যে নেতিবাচক আচরণ করা হয় বা সে জায়গার প্রতিবন্ধকতা নিয়ে জাতিসংঘ বিভিন্ন সময়েই তাদের সঙ্গে কথা বলে, জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রকাশিত নথিতে তা উল্লেখও করা হয়।

সিয়োভান মুলালি আরও বলেন, বিদেশ থেকে কর্মীরা দেশে ফিরে আসার পরও নির্যাতনের শিকার হয়। বিশেষ করে নারী কর্মীরা ভয়াবহ সামাজিক নির্যাতন মোকাবিলা করে। তাই বিদেশফেরত কর্মীদের সুরক্ষায়ও পদক্ষেপ নিতে হবে।

সিয়োভান মুলালি এক মিলিয়ন মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশ সরকারের প্রশংসা করেন। তিনি ভুক্তভোগীদের মানবাধিকার নিশ্চিত করা এবং পাচারের কার্যকর প্রতিরোধের প্রধান চ্যালেঞ্জগুলোর প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান।

সিয়োভান মুলালি বলেন, ঢাকা, কক্সবাজার ও সিলেট ভ্রমণ করেছেন। বিভিন্ন সরকারি সংস্থার প্রতিনিধি, জাতিসংঘের কর্মকর্তা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, সুশীল সমাজের সদস্য এবং মানবপাচার বিষয়ে ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলেছেন।

সিয়োভান মুলালি বলেন, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর আশ্রয় শিবিরগুলোতে সঠিক ও শিক্ষার পরিবেশ না থাকায় এবং সেখানে পর্যাপ্ত কাজের সুযোগ না থাকায় সেখানে মানবপাচার, যৌন নির্যাতন এবং জোড়পূর্বক শিশুশ্রমের ঘটনা ঘটছে। যা প্রচণ্ড উদ্বেগের বিষয়।

গত ৩১ অক্টোবর থেকে বাংলাদেশ সফর করছেন জাতিসংঘের এই বিশেষ দূত। তার বাংলাদেশ সফরের অভিজ্ঞতার আলোকে ২০২৩ সালের জুন মাসে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলে উপস্থাপন করবেন। আগামীকাল সকালে তার জেনেভার উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করার কথা রয়েছে।

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.
kalbela.com