জামিনে গিয়ে জঙ্গি ছিনতাই পরিকল্পনায় অংশ নেয় অমি

একাধিক মামলার আসামি মেহেদী হাসান অমি।
একাধিক মামলার আসামি মেহেদী হাসান অমি।ছবি : কালবেলা

ব্লগার হত্যাসহ জঙ্গিবাদী তৎপরতার একাধিক মামলার আসামি মেহেদী হাসান অমি ওরফে রাফি। বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার হলেও ছিল জামিনে। এ অবস্থাতেই নিজের সংগঠন নিষিদ্ধ ঘোষিত আনসার আল ইসলামের সহযোগী জঙ্গিদের ছিনিয়ে নিতে শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে পরিকল্পনায় অংশ নেয় সে।

গত রোববার পুরান ঢাকার আদালত এলাকায় সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দেয় সামনে থেকে। দুই জঙ্গিকে ছিনিয়ে নেওয়ার পর তাদের হাত খরচ হিসেবে ৭ হাজার করে টাকাও তুলে দেয় এই অমি।

দুর্ধর্ষ জঙ্গি অমিকে কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের সদস্যরা গ্রেপ্তারের পর এসব তথ্য বেরিয়ে আসে। গত বুধবার রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গতকাল বৃহস্পতিবার তাকে আদালতে হাজির করে জঙ্গি ছিনতাইয়ের মামলায় সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।

সিটিটিসি কর্মকর্তারা বলছেন, এই অমি এক সময় আরেক নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হিযবুত তাহরীরের সদস্য ছিল। সেখান থেকে পলাতক জঙ্গি সৈয়দ জিয়াউল হক ওরফে মেজর জিয়ার হাত ধরে যোগ দেয় আনসারুল্লাহ বাংলাটিমে (এবিটি)। পরে সে সংগঠনটি রূপ নেয় আনসার আল ইসলাম নামে। অমি সংগঠনটির সিলেট অঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা ছিল। তার বাড়িও ওই এলাকায়।

গতকাল অমিকে গ্রেপ্তারের তথ্য জানাতে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলন করেন সিটিটিসির কর্মকর্তারা। সেখানে সংস্থাটির প্রধান ও ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মো. আসাদুজ্জামান বলেন, একটি মামলায় জামিনে থেকে অমি আনসার আল ইসলামের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে আসছিল। পরে আদালত চত্বর থেকে চার জঙ্গিকে ছিনিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করে। আর ঘটনার দিন প্রধান সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করে সে।

সিটিটিসি প্রধান বলেন, ‘তারা চার জঙ্গিকে ছিনিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল। তবে প্রধান লক্ষ্য ছিল আরাফাত রহমান কিন্তু তাকে নিতে পারেনি। যে দুজনকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়, অমি তাদের পরবর্তী দিনগুলোতে চলাচল ও খরচ মেটানোর জন্য বেশকিছু টাকাও দেয়। এই টাকাগুলো কোথা থেকে এসেছে, সে তথ্যও পুলিশ জানতে পেরেছে।’

এজলাস থেকে নামানোর ফাঁকে টাকাগুলো দেওয়া হয় বলে জানান এই কর্মকর্তা। তবে কত টাকা দেওয়া হয়, সে বিষয়ে সে কিছু বলেনি। তবে সিটিটিসি সূত্র কালবেলাকে জানায়, প্রতিজনকে সাত থেকে আট হাজার করে টাকা করে দেওয়ার তথ্য মিলেছে। তবে এ বিষয়ে অমিকে রিমান্ডে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

সিটিটিসি প্রধান বলেন, অমি সংগঠনের শীর্ষস্থানীয় নেতা ও বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার-দণ্ডিত জঙ্গিদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করত। জঙ্গিদের যখন কারাগার থেকে আদালতে আনা হতো, তখন তাদের সঙ্গে সে যোগাযোগ করত। সংগঠনের পরিকল্পনার কথা বন্দিদের জানাত। দুই জঙ্গি ছিনতাইয়ের সে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, অমি আনসার আল ইসলামের শীর্ষ নেতা জিয়ার সঙ্গে সমন্বয় করে ‘আসকারি’ বিভাগের সদস্য নিয়োগ করত। সে ২০১৩ সালে হিযবুত তাহরীর থেকে সংগঠনটিতে যোগ দেয়। ২০১৬ সালে তাকে গ্রেপ্তার করা হলেও মোহাম্মদপুর থানার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় ২০১৭ সাল থেকে জামিনে ছিল। তার বিরুদ্ধে মোহাম্মদপুর ছাড়াও সূত্রাপুর, বাড্ডায় ৩টি এবং সিলেটে দুটি মামলা রয়েছে।

দুই জঙ্গি ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা এবং জামিনে থেকে জঙ্গি ছিনতাইয়ে পরিকল্পনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মনিটরিংয়ের ঘাটতি ছিল কিনা—এমন প্রশ্নে সিটিটিসিপ্রধান আসাদুজ্জামান বলেন, ‘মনিটরিং করা হয় কিন্তু ঘরে বসেও প্রযুক্তি ব্যবহার করে যোগাযোগ রাখে এরা। দুজন চিকিৎসককে আমরা ধরেছি। তারাও তো ঘরে বসেই জঙ্গিবাদের সঙ্গে জড়িত ছিল। সুতরাং মনিটরিং করা হয়। তবে সবাইকে এক সঙ্গে মনিটরিং করা যায় না সব সময়।’

ছিনিয়ে নেওয়া দুই জঙ্গিকে ধরা যাচ্ছে না কেন—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘জঙ্গিরা অন্য অপরাধীদের চেয়ে ভিন্ন…। জঙ্গিরা বিশেষ করে, আনসার আল ইসলামের সদস্যরা ‘কাটআউট’ সিস্টেমে থাকে। তাই তাদের ধরতে অনেক বেগ পেতে হয়।’ ছিনিয়ে নেওয়া দুই জঙ্গির অবস্থান সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে বলেও জানান তিনি।

সাত দিনের রিমান্ডে অমি

এদিকে গতকাল কড়া নিরাপত্তার মধ্যে অমিকে আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ড চায় সিটিটিসি। তবে শুনানি শেষে আদালত সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন বলে জানিয়েছেন ডিএমপির প্রসিকিউশন বিভাগের ডিসি জসীম উদ্দিন।

আদালত সূত্র জানায়, আদালতে অমির পক্ষে কোনো আইনজীবী ছিলেন না। ওই সময় বিচারক তাকে জিজ্ঞাসা করেন, সে আইনজীবী চায় কি না—তার কোনো বক্তব্য আছে কি না। তখন অমি বলে, ‘ব্লগার নাজিমুদ্দিন হত্যা মামলায় আমি জামিনে ছিলাম। ওই মামলায় আমি হাজিরা দিতে আদালতে এসেছিলাম। আমি জঙ্গি ছিনতাইয়ের ঘটনা সম্পর্কে কিছু জানি না। অথচ আমাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আমি একজন আইনজীবী নিতে চাই।’

গত রোববার পুরান ঢাকার আদালতপাড়া থেকে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই জঙ্গি মইনুল হাসান শামীম ওরফে সামির ওরফে ইমরান এবং আবু সিদ্দিক সোহেল ওরফে সাকিব ওরফে সাজিদ ওরফে শাহাবকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়। একই দিন আদালতে হাজিরা দিতে যায় অমি। পরে জঙ্গি ছিনতাইয়ের ঘটনায় পুলিশ যে মামলা করে, তাতে অমিকেও আসামি করা হয়।

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.
kalbela.com