ফুটপাত আটকে ট্রাফিক বক্স, বৈধতা নিয়ে দ্বন্দ্ব

ফুটপাত আটকে ট্রাফিক বক্স, বৈধতা নিয়ে দ্বন্দ্ব

রাজধানীর বিভিন্ন মোড়ে ফুটপাত ও সড়কে ‘অপরিকল্পিত’ভাবে ট্রাফিক পুলিশ বক্স তৈরি করা হয়েছে। এতে ফুটপাতে হাঁটতে গিয়ে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন পথচারীরা। এসব ‘অবৈধ’ স্থাপনা উচ্ছেদে বিভিন্ন সময় সরব হচ্ছে ঢাকা দক্ষিণ ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। যদিও ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) ও সিটি করপোরেশনের সমন্বয়ে ট্রাফিক পুলিশের জন্য বক্স তৈরির কথা বলা হচ্ছে কয়েক বছর ধরে। তবে এখনো কোনো সমাধানে পৌঁছাতে পারেনি সংস্থাগুলো। ফুটপাত আগলে তৈরি করা স্থাপনা উচ্ছেদ নিয়ে তাই মাঝেমধ্যেই মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে দুই সিটি করপোরেশন। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার আসাদগেট এলাকার রাস্তায় একটি নির্মাণাধীন পুলিশ বক্স উচ্ছেদ করতে গিয়ে পুলিশের ব্যাপক বাধার মুখে পড়ে উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)।

ওই জায়গায় আগে শেডের তৈরি একটি পুলিশ বক্স ছিল। সেটি ভেঙে নতুন করে পাকা স্থাপনা তৈরি করা হচ্ছে। সেখানেই উচ্ছেদ অভিযানে গিয়ে পড়তে হয় পুলিশের বাধার মুখে। পরে বাধ্য হয়ে ফিরে যান সিটি করপোরেশনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও কর্মকর্তারা। তখন পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, ডিএমপি কমিশনারকে আগে চিঠিতে জানিয়ে তবেই পুলিশ বক্স উচ্ছেদ করতে পারে সিটি করপোরেশন।

সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, যত্রতত্র অপরিকল্পিতভাবে পুলিশ বক্স করায় নগরের সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে। ট্রাফিক পুলিশের জন্য সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে নান্দনিক বক্স নির্মাণ করে দেওয়া হবে। প্রতিটি পুলিশ বক্সে বিশ্রামের জায়গাসহ বাথরুমের ব্যবস্থা থাকবে। এ প্রজেক্টটি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এখন পুলিশ ডিজাইন দেখে সম্মতি দেওয়ার অপেক্ষা। আজ এসব বিষয় নিয়ে ডিএমপির ট্রাফিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনায় বসবেন দুই সিটি করপোরেশনের প্রকৌশলীরা। সেখানে এ প্রজেক্ট নিয়ে শেষ পর্যায়ের কথাবার্তা হবে।

সিটি করপোরেশন জানায়, এক যুগ ধরে কোনো আইন-কানুনের তোয়াক্কা না করে, রাজধানীজুড়ে পুলিশ ইচ্ছেমতো বক্স নির্মাণ করে যাচ্ছে। এতে ফুটপাত দখল ও শহরের সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে। জনসাধারণের হাঁটতে ভোগান্তি পোহাতে হয়। এ ছাড়া এসব পুলিশ বক্স নির্মাণ করে বিজ্ঞাপন দিচ্ছে বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠান। এতে সিটি করপোরেশন রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এজন্য সিটি করপোরেশনের নিজস্ব অর্থায়নে পুলিশ বক্স করার উদ্যোগ নেয়।

ফুটপাত আটকে ট্রাফিক বক্স, বৈধতা নিয়ে দ্বন্দ্ব
ফেনীতে ১৮ মাস ধরে বেতন পাচ্ছেন না শিক্ষকরা

সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক বিভাগের তথ্যমতে, হিসাব অনুযায়ী রাজধানীতে ১০৭টি ট্রাফিক বক্স রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ৪৫টি এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় রয়েছে ৬২টি। এ ছাড়া বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে বিভিন্ন এলাকায় ট্রাফিক বক্স তৈরি করা হয়েছে। সবমিলিয়ে ঢাকায় ট্রাফিক বক্সের সংখ্যা দেড় শতাধিক হবে।

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, প্রায় প্রতিটি ট্রাফিক সিগন্যালে পুলিশ বক্স রয়েছে। কোথাও অস্থায়ী শেডের তৈরি, কোথাও বা স্থায়ী পাকা ছাদ করা বক্স। এর মধ্যে রাস্তার মধ্যে ১৫টি, ফুটপাতে ১৮টি ও ডিভাইডারের ওপর ১৪টি পুলিশ বক্স গেছে। শাহবাগ, বাংলামটর মোড়ের ইস্কাটন রোড, ধানমন্ডি, গুলশান, বনানী, মহাখালী, বকশীবাজার মোড়, কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউ সংযোগ পয়েন্টে ফুটপাতের ওপর রয়েছে পুলিশ বক্স। এ ছাড়া সার্ক ফোয়ারা মোড়, টেকনিক্যাল মোড়, পান্থপথ, রাসেল স্কোয়ার, আড়ং ক্রসিং, গণভবন ক্রসিং, কাকরাইল তাবলিগ মসজিদ মোড়, নীলক্ষেতে ডিভাইডারের মধ্যে পুলিশ বক্স নির্মাণ করা হয়েছে।

ধানমন্ডি ১৫ নম্বর কেএফসির বিপরীত পাশের ফুটপাতেও একটি পুলিশ বক্স রয়েছে। সেখানে সিটি কলেজের শিক্ষার্থী শারমির আক্তার ও তার সহপাঠীদের সঙ্গে কালবেলার কথা হয়। তারা জানান, পুলিশ বক্সের কারণে ফুটপাত দিয়ে হাঁটা যায় না। পুলিশ বক্সের কাছে এসে মেইন রাস্তা নেমে হাঁটতে হয়। এতে অনেক সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. মুনিবুর রহমান কালবেলাকে বলেন, ট্রাফিক পুলিশ অনেক পরিশ্রম করে, রাস্তায় থেকে কাজ করে। এজন্য তাদের বিশ্রাম নেওয়া ও জরুরি জিনিসপত্র রাখার জন্য পুলিশ বক্সের প্রয়োজন। একটি বাহিনীকে চালাতে হলে তাদের সুবিধা-অসুবিধাও আমাদের দেখতে হবে। এ সুবিধা না দিতে পারলে তো তারা বাসায় চলে যাবে। তিনি আরও বলেন, সিটি করপোরেশনকে আমার গত বছরের জুলাই মাসে কোথায় কোথায় বক্স করতে হবে, তার একটি তালিকা দিয়েছিলাম। কিন্তু একটিও তৈরি করা হয়নি। তারা ডিমান্ড পূরণ করলে তো আমাদের নিজেদের পুলিশ বক্স বানাতে হয় না।

পুলিশ বক্সে বিজ্ঞাপনের বিষয়ে জানতে চাইলে মুনিবুর রহমান বলেন, প্রথম দিকে নিজস্ব অর্থায়নে কাজ করার সক্ষমতা ছিল না। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান মানবিক বিবেচনায় ট্রাফিকদের জন্য পুলিশ বক্স তৈরি করে দিয়েছে। তাই আমরা শুভেচ্ছাস্বরূপ তাদের নাম দিয়ে রেখেছি।

ফুটপাত আটকে ট্রাফিক বক্স, বৈধতা নিয়ে দ্বন্দ্ব
পদোন্নতি পেলেন ৪ অতিরিক্ত ডিআইজি

ফুটপাতে পুলিশ বক্স তৈরি বৈধ কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ট্রাফিক পুলিশের যেখানে বক্স হলে সুবিধা, সেখানেই বানাতে হবে। ফুটপাত হলে ফুটপাত, ডিভাইডারের মাঝখানে হলে মাঝখানে। বিভিন্ন শহরে মূলত ফুটপাতেই পুলিশ বক্স হয়ে থাকে। কিন্তু আমরা জনগণের সুবিধার কথা চিন্তা করে যেখানে সুযোগ আছে, সেখানে ডিভাইডারে স্থানান্তর করেছি।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সেলিম রেজা কালবেলাকে বলেন, ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ আমাদের যে চাহিদা দিয়েছে, সে অনুযায়ী আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি। পুলিশ বক্স তৈরির ডিজাইনের কাজ শেষ হয়েছে, প্রজেক্ট চূড়ান্ত পর্যায়ে আছে। তিনি আরও বলেন, খালি জায়গায় পুলিশের জন্য বক্স নির্মাণ করে দেওয়া হবে। যেখানে খালি যায়গা পাওয়া যাবে না, সেখানে ফুটপাত খালি রেখে দোতলা নান্দনিক বক্স করা হবে। এতে মানুষ ফুটপাত দিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে হাঁটতে পারবে। তবে ফুটপাতে পথচারীদের সমস্যা সৃষ্টি করে পুলিশ বক্স নির্মাণ করতে দেওয়া হবে না।

এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আবু নাছের কালবেলাকে বলেন, সিটি করপোরেশন ও ডিএমপির সঙ্গে এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা অব্যাহত আছে। তবে অযাচিতভাবে যেন কোনো স্থানে পুলিশ বক্স তৈরি করা না হয়, সে বিষয়ে দক্ষিণের মেয়রের নির্দেশনাও দেওয়া আছে তাদের। বিভিন্ন সময় ফুটপাত ও রাস্তা থেকে পুলিশ বক্স ভাঙাও হয়েছে।

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.
logo
kalbela.com