ডিএনসিসি কর্মকর্তাদের বেঁধে রাখার হুমকি পুলিশের

পুলিশ বক্স উচ্ছেদে গিয়ে বাধার মুখে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ভ্রাম্যমাণ আদালত
পুলিশ বক্স উচ্ছেদে গিয়ে বাধার মুখে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ভ্রাম্যমাণ আদালত

রাজধানীর আসাদগেট এলাকার সড়কে নির্মাণাধীন পুলিশ বক্স উচ্ছেদে গিয়ে বাধার মুখে পড়েছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ভ্রাম্যমাণ আদালত।

আজ মঙ্গলবার সকালে এ অভিযানে ট্রাফিক পুলিশের সদস্যদের বাধায় ঘণ্টাখানেক অপেক্ষা করেও উচ্ছেদ না করেই ফিরে যেতে চান নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটসহ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এ সময় পুলিশ সদস্যরা অভিযানে যাওয়া কর্মকর্তাদের রশি নিয়ে বেঁধে রাখা ও গ্রেপ্তারের হুমকি দেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে পুলিশ এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের পশ্চিম মুখে আড়ংয়ের বিপরীতে রাস্তার মাঝখানে ছোট একটি একতলা পাকা ভবন করা হচ্ছে। চারজন রাজমিস্ত্রি ও সহকারীকে কাজ করতে দেখা গেছে। এখানে আগে শেডের একটি পুলিশ বক্স ছিল, সেটি ভেঙে পাকা পুলিশ বক্স করা হচ্ছে। সেখানে কর্তব্যরত ট্রাফিক পুলিশের একাধিক সদস্য জানিয়েছেন, ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা সারা দিন রাস্তায় থাকেন। তাদের জামাকাপড়, জিনিসপত্র রাখার জন্য বক্সটি করা হচ্ছে। এখানে আগেও বক্স ছিল, কিন্তু ডিএনসিসি হঠাৎ করে আজকে নতুন করা বক্সটি ভাঙতে আসে।

অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোতাকাব্বির আহমেদ। তিনি কালবেলাকে বলেন, ‘সেখানে রাস্তার মাঝখানে কে বা কারা একটি অবৈধ একতলা ভবন নির্মাণ করছে- এমন খবর পেয়ে আমরা সেখানে উচ্ছেদ অভিযানে যাই। গত ১৫ দিন আমরা কারওয়ান বাজার এলাকায় অভিযান অব্যাহত রেখেছি। ফুটপাত মুক্ত করেছি। আজকেও প্রতিদিনের মতো মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে আমরা উচ্ছেদে গিয়েছিলাম। রাস্তার মাঝে কোনো অবৈধ ভবন হতে পারে না। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পর পুলিশ আমাদের উচ্ছেদে বাধা দিয়েছে। এরপর আমরা চলে আসি।’

ম্যাজিস্ট্রেট বলেন, ‘পুলিশের বাধার বিষয়টি আমি আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। তারা এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। কোথাও পুলিশের বক্স করতে হলে অবশ্যই সিটি করপোরেশনকে জানাতে হবে। না জানিয়ে রাস্তায় কোনো স্থাপনা করা যাবে না।’

অভিযানে যাওয়া কর্মকর্তাদের অভিযোগ, পুলিশের সদস্যরা উচ্ছেদের কাজে তাদের শুধু বাধা দিয়েই ক্ষান্ত থাকেননি। কর্মকর্তাদের বেঁধে রাখা ও তাদের গ্রেপ্তার করে অভিযানে ব্যবহৃত ডাম্প ট্রাক ও পে-লোডার জব্দ করে ডাম্পিংয়ে পাঠানোর হুমকি দেন।

তবে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার শাহেদ আল মাসুদ বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের গাড়ির কাগজপত্র নেই। আমাদের সদস্যরা গাড়ির চালকের কাগজপত্র দেখতে চাইলে তারা পালিয়েছে। তারা একটি ইস্যু সৃষ্টি করেছে।’

পুলিশের এ কর্মকর্তা বলেন, কোনো কিছু উচ্ছেদ করতেই পারে সিটি করপোরেশন, কিন্তু সেটা ডিএমপি কমিশনারকে চিঠি দিয়ে জানাতে হবে। তা ছাড়া হাজার হাজার পুলিশ বক্স সারা দেশে, সেগুলোর বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত তাদের? হঠাৎ করে এটিতে কেন তাদের নজর?

অভিযানে থাকা ডিএনসিসির উপবর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মফিজুর রহমান ভূঁইয়া কালবেলাকে বলেন, ভাষা শহীদ আসাদ সরণির স্মৃতিস্তম্ভ বরাবর সড়কে প্রবেশ করতেই (বিজয় ল্যান্ড) ওপরে ৬-৭ ফুট পাশে ৮-৯ ফুট লম্বা একটা কনক্রিটের ভবন করা হয়েছে। যেখানে একতলার একটা রুম করা হয়েছে। স্থাপনাটি তৈরিতে সিটি করপোরেশন থেকে অনুমতি নেওয়া হয়নি। সোমবার বিষয়টি নজরে আসার পর যানজট হওয়ার আগেই মঙ্গলবার সকালে অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত হয়। সিটি করপোরেশন ভেঙে দিতে পারে এমন শঙ্কা থেকে পুলিশ সোমবার থেকেই ওখানে অস্থান করতে থাকেন। আমরা অভিযান শুরু করার আগেই ১০-১২ জন অফিসার ঘটনাস্থলে আসেন। কিছু সময়ের মধ্যে আরও কয়েকজন অফিসার আসেন।

ডিএনসিসি কর্মকর্তা বলেন, ‘অফিসাররা উপস্থিত হতেই আমাদের অকথ্য ভাষায় গালাগাল করতে থাকেন। বলতে থাকেন- পুলিশের অফিসাররা নির্দেশনা দিয়েছিলেন, আমাদের (সিটি করপোরেশনের) গাড়িগুলো জব্দ করার জন্য। গাড়িগুলো ডাম্পিং করা হবে। এ সময় উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা রশি নিয়ে আমাদের বাঁধতে আসেন। বলে, আমরা চুরি করতে এসেছি। আমাদের বলতে থাকে- এরা জামায়াত-শিবির, এরা দেশের শত্রু। এদের মারলি না কেন? এমন বলতে থাকে অধীনস্ত পুলিশ সদস্যদের। আমাদের কেটে টুকরো টুকরো করার নির্দেশ দেয় অফিসাররা।’

মফিজুর রহমান বলেন, ‘একপর্যায়ে আমি প্রতিবাদ জানিয়ে বলি- এসব বাজে কথা বলবেন না। তখন পুলিশের ঊর্ধ্বতন অফিসার আমাকে রশি দিয়ে বাঁধার নির্দেশ দেন। আমি বারবার সিটি করপোরেশনের পরিচয় দিয়েও তাদের তোপের মুখে পড়তে হয়। আমাদের মেয়র মহোদয়ের নির্দেশে আমরা এসেছি বললেও তারা তেড়ে আসেন। পুলিশ অফিসাররা কারও সঙ্গেই কথা বলতে রাজি ছিলেন না। আমিসহ সিটি করপোরেশনকে অকথ্য ভাষায় যা ইচ্ছে, তাই বলেছে।’

তিনি বলেন, ‘পুলিশ অফিসাররা বলছিলেন- এ নির্মাণে পুলিশ কমিশনারের অনুমতি রয়েছে। সিটি করপোরেশনের অনুমতির বিষয়টি তারা শুনতেই রাজি ছিলেন না। এমন স্থাপনা ভাষা শহীদদের স্মৃতিস্তম্ভকে আড়াল করে ফেলছে- এমন কথা বলার পরও তারা তেড়ে আসছিলেন। একপর্যায়ে আমাদের জোনাল এক্সিকিউটিভ স্যার আমাদের ফোন করে চলে আসতে বলেন। আমরা চলে আসি। খারাপ আচরণ করা পুলিশের মধ্যে ছিলেন- মো. ইমরুল এবং মো. আরিফি নামে দুইজন সদস্য। তারা বারবার তেড়ে আসছিলেন। বারবার বলছিলেন- কমিশনার স্যারের অর্ডার আছে কথা বললে তোদের শোয়ায়ে (মেরে) ফেলব।’

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা মকবুল হোসাইন কালবেলাকে বলেন, সিটি করপোরেশনের অনুমতি ছাড়াই ফুটপাতে ট্রাফিক পুলিশ বক্স নির্মাণ করা হয়েছে। উচ্ছেদ অভিযানে বাধা এসেছে। দ্রুত সার্বিক প্রস্তুতি নিয়ে সেখানে আবারও অভিযান পরিচালনা করে ফুটপাত দখলমুক্ত করা হবে।

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.
logo
kalbela.com