৫২ বছরেও শহীদ সন্তানদের খোঁজ নেয়নি কেউ

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে কেরানীগঞ্জের বীর শহীদদের স্মরণে স্মৃতিসৌধ
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে কেরানীগঞ্জের বীর শহীদদের স্মরণে স্মৃতিসৌধছবি : সংগৃহীত

কেরানীগঞ্জের জিঞ্জিরা ইউনিয়নের নজরগঞ্জের (মসজিদপাড়) সরদার বাড়ির একটি জীর্ণশীর্ণ ঘরে বাস করেন শহীদ ওবায়দুল হকের স্ত্রী-সন্তানরা। একাত্তরের ২ এপ্রিল ভোরে নজরগঞ্জের সরদার বাড়িতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঢুকে খাদ্য বিভাগে কর্মরত আওয়ামী লীগের কর্মী ওবায়দুল হক (৪৫), সুফী, আফজালুল হক, এরফানুল হক, ফায়েকুল হক ও এক শরণার্থীকে লাইনে দাঁড় করিয়ে হত্যা করে।

শহীদ ওবায়দুল হকের বড় মেয়ে নাজনীন পারভীন কালবেলাকে বলেন, ‘স্থানীয় শান্তিকমিটি ও রাজাকাররা পাকিস্তানি সেনাদের আমাদের ঘর দেখিয়ে দেয়। আমার চাচাতো ভাইয়ের মামাতো ভাই রাজাকার ছিলেন। আমার আব্বা আওয়ামী লীগের কর্মী ছিলেন। তারা আমার আব্বাকে হত্যা করতে চেয়েছিলেন।

‘আব্বার তিন চাচাতো ভাই পাকিস্তানি সেনাদের ভয়ে আমাদের ঘরে এসে লুকিয়ে ছিলেন। তারা জানতেন না তাদের ফুপাতো তিন ভাই আমাদের ঘরে। আব্বাকে যেদিন পাকিস্তানি সেনারা হত্যা করে, এর দুদিন আগে আব্বা নিরাপত্তার কথা ভেবে মা ও আমাদের বড় চাচা সাজেদুল হকের বাড়িতে রেখে এসেছিলেন। একাত্তরে আমার বয়স ছিল ৭ বছর। সবার ছোট ভাই শফিকুল হক তখন মায়ের গর্ভে। ওর জন্ম হয় একাত্তরের নভেম্বরে।

ও বাবাকে কোনো দিন চোখের দেখাও দেখতে পেল না। বাবাও ছেলের জন্মের কথা জানতে পারলেন না। চার ছেলে দুই মেয়েকে নিয়ে মা সেতারা বেগম বিধবা হলেন। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু ২ হাজার টাকার একটি চেক মায়ের কাছে পাঠিয়েছিলেন। এরপর কোনো সরকার আমাদের আর খোঁজ নেয়নি।’

তিনি বলেন, ‘দাদা বাড়ির যে ঘরটায় আমরা থাকতাম, সেই ঘর ছাড়া আর কিছুই নেই আমাদের। আম্মা অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছিলেন। সামান্য এ লেখাপড়ায় তার পক্ষে চাকরি করাও সম্ভব ছিল না। নানার বাড়ি থেকে আমাদের সামান্য সাহায্য এসেছে। তা দিয়েই খেয়ে না খেয়ে অনেক কষ্টে আম্মা আমাদের বড় করেছেন।’

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে কেরানীগঞ্জের বীর শহীদদের স্মরণে স্মৃতিসৌধ
জেল ছাড়ার আগে ‘নিজেদের’ টিভি বিক্রি করে আসে জঙ্গিরা

একাত্তরের ২৭ মার্চ ঢাকা শহরে কিছুক্ষণের জন্য কারফিউ তুলে দেওয়া হয়। সঙ্গে সঙ্গেই হাজার হাজার মানুষ বুড়িগঙ্গা নদী পার হয়ে কেরানীগঞ্জের জিঞ্জিরার দিকে ছুটতে থাকেন। নিরাপদ স্থান ভেবে সেখানে আশ্রয় নিয়েছিলেন। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কাছে সেই খবর দ্রুত পৌঁছে যায়। এ পথে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ভারতে যাচ্ছেন। একাত্তরের ২ এপ্রিল শুক্রবার মধ্য রাতে বুড়িগঙ্গা নদীর পাড়ে জিঞ্জিরা ঘাট, শামছুল্লাহ ঘাট, হাজী ঘাট, মসজিদ ঘাট, সোয়ারি ঘাট, মিটফোর্ড হাসপাতালের বালু ঘাটে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী অবস্থান নেয়। ফজরের নামাজের পরপরই ফায়ারিং শুরু হয়। পাকিস্তানি সেনাদের গুলির আওয়াজে জিঞ্জিরা ইউনিয়নের নজরগঞ্জ গ্রামের গ্রামবাসীরা দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটতে থাকেন।

নজরগঞ্জেরর পুকুরপাড়ের মনির হোসেন ও রহমততুল্লাহ দুই ভাই পাকিস্তানি সেনাদের গুলিতে শাহাদতবরণ করেন। মতিউর রহমানের শরীরে তিনটি গুলি লাগে। ঢাকার চকবাজারে তার ক্রোকারিজের দোকান ছিল। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাদের সেই নির্মমতা-নৃশংসতার কথা কালবেলাকে বললেন নজরগঞ্জের অধিবাসী হাজী মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন।

প্রত্যক্ষদর্শী হাজী মোহাম্মদ মোক্তার হোসেনের মতে, রুহিতপুরের বাসিন্দা আব্দুল মালেক নামে এক ব্যক্তি জিঞ্জিরা বাজারে চাকরি করতেন। গুলির শব্দ শুনে সেখান থেকে আত্মরক্ষার জন্য পালিয়ে নজরগঞ্জ আসছিলেন। নজরগঞ্জ খালের পাড় দিয়ে পাকা ব্রিজের নিচে আসতেই খালের পাড়ে অবস্থানরত পাকিস্তানি সেনাদের ছোড়া গুলি তার ডান হাতে লাগে। তিনি লুঙ্গি ছিঁড়ে ক্ষত স্থান বেঁধে পালানোর জন্য দৌড়ে নজরগঞ্জ কবরস্থানের দিকে এগোতে থাকেন। কবরস্থানে অবস্থানরত পাকিস্তানি সেনারা তার পেটে গুলি করলে ডান পাশ দিয়ে ঢুকে বাঁপাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।

নজরগঞ্জের মাজেদা বেগম পাকিস্তানি সেনাদের গোলাগুলির শব্দ শুনে ১২ বছরের মিয়া চানকে নিয়ে মনু বেপারির ঢালে টিনের বড় বাড়িতে আশ্রয় নেন। বাকি ছয় ছেলেমেয়ে যে যেদিকে পারে ছুটে যায়। এ ঘরে আরও শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছিলেন। পাকিস্তানি সেনারা টিনের ঘর লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গোলাগুলি করলে মাজেদা বেগম ছেলেকে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে বস্তা দিয়ে ঢেকে দেন। ছেলেকে বাঁচাতে পারলেও তার পেটের বাঁপাশে, বাঁপায়ে, ডান হাতে গুলি লাগে। সঙ্গে সঙ্গে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।

মাজেদার বড় মেয়ে সুরাইয়া বেগম কালবেলাকে বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার কয়েক মাস আগে আমার কাবিন হয়েছে। ছোট ছোট ভাইবোন। ছোট বোন আজিজুন নাহার কোলে। মায়ের শহীদ হওয়ার খবর শুনে আব্বাও অসুস্থ হয়ে পড়েন। মায়ের শোকে আব্বা স্বাধীনতার কয়েক মাস পড়েই মারা গেলেন। আব্বা মারা যাওয়ায় বঙ্গবন্ধুর পাঠানো দুই হাজার টাকা আমাদের আর দেয়নি। আব্বা মারা যাওয়ার পর ব্যবসাও চলে যায়। শুধু বাড়িটা ছিল। সেটাও ধীরে ধীরে ভূমিদস্যুরা দখল করতে করতে এখন ৬ শতাংশ জায়গা আছে। দলিলপত্র থাকার পরও দখলি জমি উদ্ধার করতে পারিনি। কেউ আমাদের পাশে এসে দাঁড়ায়নি। অসহায় ভাইবোনদের বাবা-মায়ের স্নেহ, ভালোবাসা দিয়ে অনেক কষ্টে বড় করে তুলেছি। কেউ কোনো দিন আমাদের খবর নেয়নি। কীভাবে বেঁচে আছি তা-ও জিজ্ঞেস করেনি।’

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে কেরানীগঞ্জের বীর শহীদদের স্মরণে স্মৃতিসৌধ
বৈধ নৌযান ১৫ হাজার অবৈধ দুই লাখ!

মনু বেপারির ঢালে গণহত্যার প্রত্যক্ষদর্শী হাজি মর্জিনা বেগম বলেন, ‘নজরগঞ্জের মাজেদা বেগম আমাদের বাড়িতে ঢুকতেই পাকিস্তানি সেনাদের গুলিতে নিহত হন। তিনি আট মাসের গর্ভবতী ছিলেন। পেটে গুলি লাগলে বাচ্চা বেরিয়ে আসে। মনু বেপারির বাড়িতে অনেক লোক আশ্রয় নিয়েছিলেন। পাকিস্তানি সেনারা তার বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিলে একজন শরণার্থী নারী আগুনে পুড়ে মারা যায়।’

মনু বেপারির ঢাল গণহত্যা প্রসঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দা হাজি মুহম্মদ মহীউদ্দীন বলেন, ‘সকাল সাড়ে ৮টার দিকে পাকিস্তানি সেনারা এখানে আসে। আমার চাচির ঘরে ৭ থেকে ৮ জন, দাদির ঘরে ১০ থেকে ১২ জন শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছিলেন। পাকিস্তানি সেনারা ঘরের বেড়া খুলে দাদিরর ঘরে গুলি করে। এতে ছয় জন শহীদ হন। স্বজনরা তিনজন শহীদের লাশ নিয়ে যায়। তিনজনের লাশ চাতালে রেখে যায়। পুকুর পাড়ে ৭ থেকে ৮ জন শহীদ হন পাকিস্তানি সেনাদের গুলিতে।’

নজরগঞ্জ সামাজিক কবরস্থানে একটি কবরে ১১ জন, আরেকটি কবরে দুই ভাই, আরেকটি কবরে দুই বাচ্চা ও মাজেদা বেগম। কবর স্থানে ১১ শহীদের নাম পাওয়া গেলেও অন্য শহীদদের নাম জানা যায়নি। মনু বেপারির ঢালে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে কেরানীগঞ্জের বীর শহীদদের স্মরণে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হলেও সেখানেও শহীদদের সংখ্যা বা নাম-পরিচয় উল্লেখ নেই।

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.
kalbela.com