বঙ্গবন্ধু পরিবারের নাম ভাঙ্গিয়ে জমির দালাল থেকে কোটিপতি মনসুর

কোটি টাকার প্রতারণা করেন সাইফুল-মনসুর, পরিচয় দিতেন বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্য
র‍্যাবের হাতে প্রেপ্তার প্রতারক চক্রের মূলহোতা মনসুর আহমেদ
র‍্যাবের হাতে প্রেপ্তার প্রতারক চক্রের মূলহোতা মনসুর আহমেদছবি : কালবেলা

মনসুর আহমেদ। বয়স ৩৩ বছর। গ্রামের বাড়ি চাঁদপুর সদরে। নিজেকে পরিচয় দিত বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্য। রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের সাথে তার সুসম্পর্ক রয়েছে- এমনটাই দাবি করে, তাদের নাম ও পরিচয় ভাঙিয়ে সরকারি বিভিন্ন উন্নয়ন ও নির্মাণ প্রকল্পের কাজ পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন ঠিকাদারি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন চক্রের মনসুর আহমেদ।

সংক্ষেপে

তারা প্রতারণার জন্য বিভিন্ন সময় নতুন নতুন কৌশল ব্যবহার করত। প্রথমত তারা নতুন মোবাইল সিম কিনে বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নামে সেভ করত এবং নিজেরা ওই ব্যক্তি সেজে নিজেদের প্রতারণা চক্রের সদস্যদের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চ্যাটিং করত।

জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) সূত্রে জানা যায়, মুনসুরের রয়েছে একটি প্রতারক ও জালিয়াতি চক্র। এই চক্র প্রতারণার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে বলে এনএসআই গোয়েন্দা পর্যালোচনার মাধ্যমে জানতে পারে।

এরই ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার (১৭ মে) রাতে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) ও র‍্যাব-৩ একটি অভিযান পরিচালনা করে রাজধানীর পল্টন এলাকায়। অভিযান চালিয়ে প্রতারক চক্রের মূলহোতা মনসুর আহমেদ (৩৩) এবং তার সহযোগী মো. মহসিন চৌধুরী কে (৫৫) গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

এই যৌথ অভিযানে, উদ্ধার করা হয় প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন দলিল ও ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট।

সংশ্লিষ্টরা জানায়, এই চক্রে ৫-৭ জন সদস্য রয়েছে। চক্রের মূলহোতা গ্রেপ্তারকৃত মুনসুর। চক্রটি বিগত প্রায় ৩-৪ বছর যাবৎ বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ পাইয়ে দেওয়ার নাম করে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে প্রতারিত করে আসছে।

তারা প্রতারণার জন্য বিভিন্ন সময় নতুন নতুন কৌশল ব্যবহার করত। প্রথমত তারা নতুন মোবাইল সীম ক্রয় করে বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নামে সেভ করত এবং নিজেরা ঐ ব্যক্তি সেজে নিজেদের প্রতারণা চক্রের সদস্যদের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চ্যাটিং করত।

চক্রের সদস্যদের বিভিন্ন মোবাইল নম্বর চক্রের মূলহোতা ও সহযোগীর মোবাইলে বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যদের নাম ও ছবি দিয়ে সেভ করে। পরবর্তীতে তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে নিজেদের মধ্যে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ পাইয়ে দেয়ার ব্যপারে চ্যাটিং করে।

এই চ্যাটিং কন্টেন্ট তারা এমনভাবে তৈরি করে যাতে যেকোন ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মনে করে তারা ইতোপূর্বে অনেক কাজ অর্থের বিনিময়ে পাইয়ে দিয়েছে এবং তাদের বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যদের সাথে খুবই সু-সম্পর্ক রয়েছে।

মনসুর প্রথমে স্থানীয় এলাকায় জমির দালালি করত। পরবর্তীতে সে ঢাকায় একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেয়। সেখানে কর্মরত থাকাকালীন এভাবে প্রতারণার বিষয়টি তার মাথায় আসে।

র‍্যাবের লিগ্যাল এন্ড মিডিয়া উইং এর পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন

এই চক্রের একজন সদস্য সাইফুল বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাতে রয়েছে। যে নিজেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের জয়েন্ট সেক্রেটাররি পরিচয় দিত এবং সেখানে বসে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ পাইয়ে দেওয়ার মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিত।

র‍্যাব জানায়, নিজেদের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রমান করার জন্য তারা বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে তাদের ছবি ওই সকল আগ্রহী ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে দেখাত। নিজেদের কোম্পানিকে প্রতিষ্ঠিত ও স্বনামধন্য হিসেবে উপস্থাপন করার লক্ষ্যে তারা হাজার হাজার কেটি টাকার ভুয়া ব্যাংক গ্যারান্টি দেখাত। তারা কোন অফিসে মিটিং এর সময় বেশভুষা পরিবর্তন করে দামী গাড়ি ও বডিগার্ড নিয়ে নিজেদের উপস্থাপন করত। নিজেদেরকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে উপস্থাপন করার জন্য তারা ইতোমধ্যে বিভিন্ন দেশে কাজের জন্য ভ্রমণ করেছেন বলেও বিভিন্ন ছবি দেখাত।

তারা সরকারি কোন চলমান প্রকল্প সমূহের কাজ পাওয়ার যোগ্য এমন সব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে খুঁজে বের করত এবং তাদেরকে ১০% কমিশনের বিনিময়ে ঐ কাজ পাইয়ে দেয়ার প্রলোভন দেখাত। তারা নিজেদের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রমানের জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের ভাড়া করা অফিসে মিটিং করত। অথবা নিজেরা ভাড়া করা গাড়ি নিয়ে ঐ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অফিসে যেত। সেখানে বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ আছে বলে মিথ্যা রেফারেন্স ব্যবহার করত।

র‍্যাবের লিগ্যাল এন্ড মিডিয়া উইং এর পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন জানান, মনসুর প্রথমে স্থানীয় এলাকায় জমির দালালি করত। পরবর্তীতে সে ঢাকায় একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেয়। সেখানে কর্মরত থাকাকালীন এভাবে প্রতারণার বিষয়টি তার মাথায় আসে। পরবর্তীতে ওই এজেন্সির এক কর্মচারীর মাধ্যমে সাইফুলের সাথে পরিচয় হয়। এরপর সে প্রতারণার জন্য এই চক্রটি গড়ে তোলে।

তিনি আরও জানান, গ্রেপ্তারকৃত মহসিন প্রথমে ঢাকার মালিবাগে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির ব্যবসা করত। পরবর্তীতে ব্যবসায়িক ক্ষতির কারণে তার ফ্যাক্টরিটি বিক্রি করে দেয়। পরবর্তীতে মতিঝিলে মনসুরের সাথে পরিচয়ের মাধ্যমে এই প্রতারক চক্রের সাথে যুক্ত হয়।

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.
kalbela.com