মায়ের নাম থাকলেই শিশুর জন্মনিবন্ধন করা যাবে : পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী

বুধবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের একনেক সম্মেলন কক্ষে চাইল্ড পার্লামেন্ট অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বুধবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের একনেক সম্মেলন কক্ষে চাইল্ড পার্লামেন্ট অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়েছে।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের একনেক সম্মেলন কক্ষে সেভ দ্য চিলড্রেন ইন বাংলাদেশ ও প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের আয়োজনে বুধবার সকাল ১১টায় ২১তম চাইল্ড পার্লামেন্ট অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়েছে।

এই অধিবেশনে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম ও সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী আশরাফ আলী খান খসরু, সেভ দ্য চিলড্রেনের শিশু সুরক্ষা বিষয়ক পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন, সেভ দ্য চিলড্রেন ও প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা।

৩০টি জেলার চাইল্ড পার্লামেন্টের ৫২ শিশু সদস্য তাদের নিজ নিজ এলাকার শিশু সমস্যা বিষয়ক প্রশ্ন ও সুপারিশগুলো অধিবেশনে তুলে ধরে। অধিবেশন পরিচালনা করে স্পিকার প্রপা মজুমদার, ডেপুটি স্পিকার মাইশা আহমেদ।

অধিবেশনে শিক্ষা, সুরক্ষা, বিনোদন ইত্যাদি বিষয়ক তারকা চিহ্নিত ও সম্পূরক প্রশ্ন উত্থাপন করে মানিকগঞ্জের এ কে মো. জাহিদুল হক, কুমিল্লার ফাতেমা, কুষ্টিয়ার তাসনিম, মেহেরপুরের নওরিন জাহান, রাজবাড়ীর সেতু আক্তার, জুলেখা আখতার, মৌলভীবাজারের চয়ন চাষা, বাগেরহাটের নাইমুল ইসলাম, পাবনার সালমান রশিদ, লক্ষ্মীপুরের নাহিয়ান, নরসিংদীর শারমিন সরকার, খুলনার শ্রাবণী, নড়াইলের মুনিরা জাহান, মাদারীপুরের সাইফুল ইসলাম প্রমুখ। সহযোগিতায় ছিলেন কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট তিশা বৈদ্য।

প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বলেন, যৌনকর্মীর শিশুরা কেন জন্মনিবন্ধন করতে পারবে না; এটা ঠিক নয়। মায়ের নাম থাকলেই তার জন্মনিবন্ধন করা যাবে। কারা এটিতে বাধা দিচ্ছেন তা খতিয়ে দেখা হবে।

শিক্ষা বিষয়ক তারকা ও সম্পূরক প্রশ্নে শিশু সদস্যরা স্পিকার বরাবর কয়েকটি সমস্যা তুলে ধরে। পাশাপাশি সুপারিশও তুলে ধরে। তারা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত উপকরণের ব্যবস্থায় সরকারের পদক্ষেপ, শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে সরকারের উদ্যোগ, অনলাইনে যৌন হয়রানি বন্ধে পরিকল্পনা, শিশু ও তরুণদের আত্মহত্যা প্রবণতা নিয়ে ভাবনা ও উদ্যোগ, বেদে পল্লীর শিশু, যৌন কর্মে নিয়োজিত মায়েদের শিশু, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও চরাঞ্চলের শিশুদের নিয়ে সরকারের বিশেষ উদ্যোগ ইত্যাদি।

শিশুদের অংশগ্রহণ ও মতামতের ভিত্তিতে বাজেট প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়নের জন্য সরকারের পরিকল্পনার বিষয়েও আলোচনা করে তারা। চরাঞ্চলের শিশুদের জন্য বিদ্যালয় স্থাপনে বাজেট বরাদ্দ, প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ, বিদ্যালয়ের বাথরুম পরিষ্কার না থাকা ইত্যাদি।

প্রতিমন্ত্রী আশরাফ আলী খান খসরু বলেন, সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের নিয়ে আমাদের মন্ত্রণালয়ে বিভিন্ন প্রকল্প রয়েছে। তবে এই অধিবেশন আমাদের আরও ভাবতে সাহায্য করবে। শিশু ও তরুদের সুস্থ-স্বাভাবিক জীবন নিশ্চিতকরণে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ আগেও নিয়েছে এবং নিচ্ছে। কিন্তু শিশুকে সঠিক শিক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব প্রধানত পরিবারের। আর শিক্ষাক্ষেত্রে অগ্রগতির জন্য সরকারের সকল পরিকল্পনা এখন বাস্তবায়ন হচ্ছে। কোনো বিদ্যালয়ই আর টিনের ঘর থাকবে না।

তিনি আরো বলেন, পিছিয়ে পড়া বেদে, হিজড়া জনগোষ্ঠীকে শিক্ষা বৃত্তি দেওয়া হয়। প্রতিবন্ধী শিশুদের প্রতিবন্ধী ভাতা দেওয়া হয়। প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য বিদ্যালয়ে র‌্যাম করা হচ্ছে। অনেক বিদ্যালয়ে লিফটের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। নেত্রকোণা থেকে একজন প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। তার চলাফেরার জন্য একটি হুইল চেয়ার দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া শিক্ষা ও সমাজকল্যাণ কর্মকর্তার মাধ্যমে খোঁজখবর নিয়ে সমস্যা নিরসনের চেষ্টা করা হচ্ছে।

সুরক্ষা বিষয়ক প্রশ্নপর্বে শিশু সদস্যরা জলবায়ু পরিবর্তনে উপকূলীয় অঞ্চলের মেয়েশিশুরা কোন ধরনের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ঝুঁকিতে থাকে, অধিকার বঞ্চিত হওয়ার দিকগুলো তুলে ধরে। বাল্যবিয়ে, অনলাইন কার্যক্রমে বয়স সীমা নির্ধারণ না থাকায় শিশুর বিভিন্ন সেক্টরে অনুপ্রবেশ করায় মানসিক স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, উপকূলীয় অঞ্চলে সুপেয় পানির সমস্যা, যৌনকর্মীর শিশুদের অনিরাপদ আবাসস্থল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন নির্যাতন প্রতিরোধ, যৌন নির্যাতনের কারণে বিদ্যালয়গামী শিশুর আত্মহত্যা, নদী ভাঙ্গন, প্রাকৃতিক দুর্যোগে উপকূলীয় অঞ্চলের শিশুদের বাসস্থান হারিয়ে ছিন্নমূল শিশুতে পরিণত ইত্যাদি বিষয়গুলো তুলে ধরে। বিনোদনমূলক প্রশ্নপর্বে শিশুদের জন্য খেলার মাঠ ও পার্ক, উপকরণ ও নিরাপত্তা প্রদানের বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়।

প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম প্রশ্ন পর্ব উত্তরে বলেন, সকল শিশু ও তাদের পরিবারকে উদ্বুদ্ধ করতে উপবৃত্তি বৃদ্ধি, বিনামূল্যে বই বিতরণ, বিদ্যালয়ের নতুন ভবন তৈরি ইত্যাদি কার্যক্রমের সাথে সাথে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়েও সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ ও পরিকল্পনা আছে।

তিনি আরও বলেন, শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন এখন জরুরি বিষয়। তবে পরিবারে অস্থিতিশীলতা, বিদ্যালয়গুলোতে পরীক্ষাভীতি, লেখাপড়ার প্রতিযোগিতা, শিক্ষকদের চাপ শিশুদের ওপর অনেক প্রভাবিত করে। স্কুলগুলোকে আনন্দকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। পরিবারে শৃঙ্খলা রক্ষা করতে হবে, শিশুদের জীবনকে সুন্দর করার দায়িত্ব সবার।

এ ছাড়া তিনি বলেন, সরকার বাজেটে শিশু সুরক্ষা কার্যক্রম শক্তিশালী করার উদ্যোগও নিয়েছে। নদীভাঙ্গন একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ। ৫০ থেকে ৫৫ হাজার পরিবার বাড়িঘর হারিয়ে অন্যত্র সরে যায়। এই সমস্যা নিরসনেও সরকার একটি প্রারম্ভিক পরিকল্পনা নিয়েছে।

সেভ দ্য চিলড্রেনের শিশু সুরক্ষা বিষয়ক পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, যৌনকর্মীর সন্তান ও পথশিশুদের জন্মনিবন্ধন বাবার নাম ছাড়া হচ্ছে না। যৌনকর্মীর সন্তানদের মায়ের ঠিকানা লেখা থাকে যৌনকর্মী পল্লীর। এটা বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এই অধিবেশনে যে শিশুরা অংশগ্রহণ করেছে তারাই স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত করেছে। ওরা নিজেরাই জরিপ করে তাদের সমস্যাগুলো তুলে ধরেছে। আগামী দিনের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য তাদের তৈরি করা হচ্ছে।

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.
kalbela.com