ভর্তুকি বাড়লে বিদ্যুতের দাম বাড়বে না

ভর্তুকি বাড়লে বিদ্যুতের দাম বাড়বে না
প্রতীকী ছবি

চলতি অর্থবছরে (২০২২-২৩) বিদ্যুৎ খাতে সরকার ভর্তুকি বাড়ালে বিদ্যুতের পাইকারি দাম বাড়ানো হবে না। তবে এই বিষয়ে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। এ কারণে পাইকারি বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে ভর্তুকি বিষয়ে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের বিষয়ে অপেক্ষা করছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)।

বিইআরসির সংশ্লিষ্টরা কর্মকর্তারা জানান, সরকার যদি বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে পাইকারি বিদ্যুতেদর দাম বাড়ানোর কোনো প্রয়োজন পড়বে না। তবে খাত সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ মুহূর্তে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর কোনো প্রয়োজন নেই।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান আব্দুল জলিল এ প্রসঙ্গে কালবেলাকে বলেন, ‘আমাদের হাতে সময় কম। আমরা আমাদের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে ফেলেছি। এখন ভর্তুকি নিয়ে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছি। ভর্তুকি কিছুটা বাড়ানো হলেও দাম বাড়ানোর প্রয়োজন পড়বে না।’

ভর্তুকি কত বাড়ানো হলে দাম বাড়ানোর প্রয়োজন পড়বে না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটা নিয়ে আলোচনা চলছে। আগামী সপ্তাহে আশা করছি সব ঠিক হয়ে যাবে।’

ভতুর্কি না বাড়লে পাইকারি বিদ্যুতের দাম কী পরিমাণ বাড়তে পারে এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘দাম বাড়লেও সামান্য বাড়বে।’

বিইআরসির সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, সরকার যদি ভর্তুকি না বাড়ায় তাহলে পাইকারি বিদ্যুতের দাম ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তুতি নিয়ে রাখা হয়েছে। আগামী সপ্তাহে এই বিষয়টি চূড়ান্ত হয়ে যাবে। এ ছাড়া দাম বাড়ানোর বিকল্পও খোঁজা হচ্ছে। এই কর্মকর্তা বলেন, বিদ্যুতের পাইকারি দাম বাড়ানো হলে খুচরা দামেও প্রভাব ফেলবে। বর্তমান বাজারে ভোক্তারা এমনিতেই আর্থিক চাপে আছে। তাই নতুন করে চাপ না তৈরিরও চেষ্টা করা হচ্ছে।

জ্বালনি বিশেষজ্ঞ কনজুমার্রস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সিনিয়ন সহসভাপতি অধ্যাপক ড. শামসুল আলম পাইকারি বিদ্যুতের দাম বিষয়ে এই প্রতিবেদককে জানান, এখন অত্যাধিক ব্যয়বহুল বলে ডিজেলনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রয়েছে। বেশি দামে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানিও বন্ধ রয়েছে। ফলে পাইকারি বিদ্যুতের দামতো কমবে, বাড়বে কেন?

বিইআরসি আইনে উল্লেখ করা আছে, গণশুনানির পর ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে আদেশ দিতে হবে। গত ১৮ মে পাইকারি বিদ্যুতের গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়। এই হিসেবে আগামী ১৪ অক্টোবরের মধ্যে আদেশ দেওয়া বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

গণশুনানিতে, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) বর্তমান মূল্য ইউনিট প্রতি ৫ দশমিক ১৭ টাকা থেকে ৬৬ শতাংশ বাড়িয়ে ৮ দশমিক ৫৮ টাকা করার আবেদন করে। ওই প্রস্তাবের বিপরীতে বিইআরসি টেকনিক্যাল কমিটি ভর্তুকি ছাড়া ৮ দশমিক ১৬ টাকা করার মতামত দেয়। অতীতে কখনো এত বেশি পরিমাণে দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব দেওয়ার নজির নেই। সর্বশেষ ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বিদ্যুতের পাইকারি দাম ইউনিট প্রতি ৫.১৭ টাকা নির্ধারণ করে।

বিপিডিবির পাইকারি মূল্য বৃদ্ধির প্রস্তারে উল্লেখ করা হয়েছে, চাহিদামতো গ্যাস সরবরাহ না পাওয়ায় তেল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে গিয়ে খরচ বেড়ে গেছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে বিদ্যুতের গড় উৎপাদন খরচ ছিল ২ দশমিক ১৩ টাকা, ২০২০-২১ অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ১৬ টাকায়।

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, কয়লার মূসক বৃদ্ধির কারণে ২০২২ সালে ইউনিট প্রতি উৎপাদন খরচ দাঁড়াবে ৪ দশমিক ২৪ টাকা। পাইকারি দাম না বাড়লে ২০২২ সালে ৩০ হাজার ২৫১ কোটি ৮০ লাখ টাকা লোকসান হবে। এখানে উল্লেখ্য, পিডিবি বিদ্যুতের একক পাইকারি বিক্রেতা। পাঁচটি বিতরণ কোম্পানির কাছে পাইকারি দরে বিক্রির পাশাপাশি নিজে ময়মনসিংহ, সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের শহরাঞ্চলে বিদ্যুৎ বিতরণ করে কোম্পানিটি।

বিদ্যুৎ বিভাগের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে বিদ্যুৎ খাতে সর্বোচ্চ ভর্তুকি দিয়েছে সরকার। এর পরিমাণ দুই হাজার ৯৬৮ কোটি টাকা। এর আগে আর কখনো দুই মাসে এত টাকা ভর্তুকিতে ব্যয় করা হয়নি। বিদ্যুৎ খাতে যে ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে এর অধিকাংশ দেওয়া হয়েছে বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের।

চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বাজেট বরাদ্দ প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা কমেছে। গেল অর্থবছরে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দুটি বিভাগে ২৭ হাজার ৪৮৪ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। চলতি অর্থবছরে এই বরাদ্দ নেমে এসেছে ২৬ হাজার ৬৬ কোটি টাকায়, যা আগের বছরের তুলনায় এক হাজার ৪১৮ কোটি টাকা কম। মোট বরাদ্দের মধ্যে বিদ্যুৎ খাতে ২৪ হাজার ১৩৯ কোটি টাকা এবং জ্বালানি খাতে এক হাজার ৭৯৮ কোটি টাকা।

পিডিবির দৈনিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিবরণী থেকে জানা গেছে, ২১ সেপ্টেম্বর সারা দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ধরা হয়েছে ১৩ হাজার ৪৩৭ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে উৎপাদন ১৩ হাজার ৪৯ মেগাওয়াট। আর সারা দেশে লোডশেডিং হবে ৩৮৮ মেগাওয়াট।

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.
kalbela.com