পাকিস্তানে পাচার হওয়া নারী যেভাবে দেশে ফিরলেন

পাচার হওয়া বাংলাদেশের নারী জাহিদা খাতুন।
পাচার হওয়া বাংলাদেশের নারী জাহিদা খাতুন। ছবি : সংগৃহীত

পাকিস্তানের করাচির একটি মসজিদের মুয়াজ্জিন মো. ওয়ালি। মায়ের একটি উপদেশ থেকে নিজের জীবনের লক্ষ্য স্থির করেছেন তিনি।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে ওয়ালি বলেন, “২০১৮ সালে আমার মা আামকে বলেন, ‘তুমি মুঠোফোনে তোমার সময় অপচয় করছ। তার চেয়ে আমাদের প্রতিবেশী নারী, যিনি ৩০-৪০ বছর ধরে বাস করছেন, তার ঠিকানা ও বিস্তারিত তথ্য ফেসবুকে প্রকাশ করো। যাতে সে তার পরিবারকে পেতে পারে।’”

বাংলাদেশি নারী জাহিদা খাতুন তাদের প্রতিবেশী ছিলেন। দেশে তার দুটি সন্তান ছিল, যাদের মধ্যে একজন তখন নবজাতক ছিল। প্রায় ৩০ বছর আগে এক নারী তাকে শহর ঘুরিয়ে দেখানোর কথা বলে রাজধানীতে আনেন।

জাহিদা জানান, তিনি ঢাকায় পৌঁছানোর পর অজ্ঞান হয়ে পড়েন। তারপর কী হয়েছিল, তিনি জানেন না। জ্ঞান ফিরলে তিনি জানতে পারেন, তিনি পাকিস্তানের করাচিতে রয়েছেন।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, আমি কোথায়? তারা বলল, এটা পাকিস্তান, তোমাকে এখানে বিক্রি করা হয়েছে।
পাকিস্তানে পাচার হওয়া বাংলাদেশি নারী জাহিদা খাতুন।

এর পরের ঘটনা বর্ণনায় জাহিদা বলেন, “আমি জিজ্ঞেস করলাম, আমি কোথায়? তারা বলল, ‘এটা পাকিস্তান, তোমাকে এখানে বিক্রি করা হয়েছে।’ আমাকে একটি বাড়িতে রাখা হয় এবং সেখান থেকেই বিক্রি করা হয়। আমি কান্না শুরু করলে তারা আমাকে বলে, ‘কেঁদো না, আমরা তোমাকে বিয়ে দেব।’ তারা বলে, ‘তোমাকে ধোঁকা দেওয়া হয়েছে এবং বিক্রি করা হয়েছে।’ আমাকে পাঁচ দিন পর তাদের মামার সঙ্গে বিয়ে দেয়।”

বিয়ের পর পাকিস্তানের নাগরিকত্ব পান জাহিদা। কিন্তু তিনি আর দেশে ফিরতে পারেননি। ওয়ালি জাহিদার কাছ থেকে তথ্য নিয়ে তা ফেসবুকে প্রকাশ করেন।

মুয়াজ্জিন মো. ওয়ালি।
মুয়াজ্জিন মো. ওয়ালি।ছবি : সংগৃহীত

ওয়ালি বলেন, ‘হাসিবুল্লাহ নামে আমার এক বন্ধু চীনে পড়াশোনা করে। সে আমার এই পোস্ট দেখে তার বাংলাদেশি সহপাঠীদের পোস্টটি দেখায় এবং বাংলাদেশে একজন মুয়াজ্জিনের সঙ্গে কথা বলে। তিনি অনেক কষ্টে ওই ঠিকানা খুঁজে বের করেন।’

অবশেষে দীর্ঘ ৩৬ বছর পর জাহিদা তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সক্ষম হন। ওয়ালির জন্য পরবর্তী চ্যালেঞ্জ ছিল তাকে বাংলাদেশে থাকা তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থা করিয়ে দেওয়া। কূটনৈতিক নানা জটিলতা অতিক্রম করে ওয়ালি তা করেছেন।

পাচার হওয়া বাংলাদেশের নারী জাহিদা খাতুন।
নিজের শেষকৃত্যানুষ্ঠানে স্বজনদের সঙ্গে কথা বললেন মৃত নারী!

এ ঘটনার পর ভারত ও বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অনেক নারী ওয়ালির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাদেরই একজন হামিদা বানু, যাকে দুবাইয়ে পাঠানোর কথা বলে ২২ বছর আগে ভারত থেকে করাচিতে পাচার করা হয়েছিল। ওয়ালির মাধ্যমে তিনিও তার পরিবারের খোঁজ পান।

হামিদা বানু জানান, তার পরিবারের লোকেরা অসংখ্যবার পাচারকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও তারা হামিদার বিষয়ে কোনো তথ্য দেয়নি। শুধু এতটুকু জানিয়েছে, তিনি যেখানেই আছেন, ভালো আছেন। আর তার পরিবার ভেবে নিয়েছিল, তিনি হয়তো মারা গেছেন!

পাকিস্তানে পাচার হওয়া ভারতীয় নারী হামিদা বানু।
পাকিস্তানে পাচার হওয়া ভারতীয় নারী হামিদা বানু। ছবি : সংগৃহীত

পাকিস্তানে পাচার হওয়া এসব নারী জানিয়েছেন, তারা এ বিষয়গুলো নিয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন না। কারণ তাদের পাচার করে আনা হয়েছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই তাদের কাছে কোনো নথিপত্র নেই। এ বিষয়ে ওয়ালি বলেন, ‘এটা জটিল ও কঠিন কাজ। তা সত্ত্বেও আমি এটা চালিয়ে যেতে চাই।’

পাচার হওয়া বাংলাদেশের নারী জাহিদা খাতুন।
বাস্তবেও ছিলেন ‘মোগলি’, থাকতেন নেকড়ের দলে

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.
kalbela.com