মামুন চমৎকার!

দুই দশক ধরে প্রকৃতি ও মানুষের জন্য একনিষ্ঠ চিত্তে কাজ করে চলেছেন একজন মামুন। তার জীবনের দিকে তাকালে মনে হবে যেন, আরে এই তো তারুণ্য! লিখেছেন আরাফাত আহমেদ রিফাত
মামুন চমৎকার!

ভোরের আলো ফুটতেই সাইকেলে চড়ে বের হন। সঙ্গে থাকে গাছের চারা, প্ল্যাকার্ড আর ঝুড়িভর্তি বই। বাড়ি বাড়ি গিয়ে দিয়ে আসেন বই। পড়া শেষে আবার বদলে দেন সেটা। কেউ আবার বই পড়ে খুশি হলে তাকে পুরস্কার হিসেবে দেন চারা। উঠানে বৈঠক করে শিশু ও বৃদ্ধদের বই পড়েও শোনান তিনি। বেলা গড়ালে বেরিয়ে যান বাজারের দিকে। সেখান থেকে নিজের খামারের হাঁস-মুরগির জন্য খাবার সংগ্রহ করেন। এরপর শুরু হয় পরিচ্ছন্নতা অভিযান। সন্ধ্যা নামলে তার বাড়িতেই হাজির হয় পাড়ার দরিদ্র শিক্ষার্থীরা। তাদের বিনেপয়সায় পাঠদান করান তিনি। বলছিলাম তেঁতুলিয়ার মাহমুদুল ইসলাম মামুনের কথা। প্রকৃতি ও মানুষের প্রতি ভালোবাসার তাগিদে গত দুই দশক ধরে এ কাজ করে যাচ্ছেন এই তরুণ।

মামুনের বাড়ি পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়া উপজেলার আজিজনগর গ্রামে। রংপুর কারমাইকেল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর পাস করেছেন। চাকরি না করে করছেন খামার। আর যখনই সময় পান, ছুটে যান প্রকৃতি ও মানবসেবায়।

মাহমুদুল ইসলাম মামুন জানান, ‘ছোটবেলায় টুকটাক গাছ লাগাতাম। বুঝতে পারি আমাদের দ্বারাই নানাভাবে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। তখন থেকেই পরিবেশ নিয়ে কিছু করার ইচ্ছা জাগে। এদিকে আবার বই পড়ার নেশা ছিল। দুটো মিলে এভাবেই চলছে।’

এখন পর্যন্ত মামুন তার নিজের খরচেই তেঁতুলিয়া উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে অগণিত চারা বিতরণ করেছেন। বাড়িতে হাঁস-মুরগি পালন ও সবজি চাষ করে যা আয় হয় তাতেই চারা ও বই কেনেন।

মামুন জানান, স্নাতকোত্তরের পর চাকরি না করে চারাগাছ ও বই বিতরণ করেন বলে অনেকে তাকে আদর করেই ‘পাগল’ বলে। অবশ্য মামুন তাতে খুশিই হন। কারণ তাকে পাগল বলা মানুষগুলোই আবার তার সেবা নেয়। তবে যে যাই বলুক, মা ও বড়ভাই তার এসব কাজে শুরু থেকেই উৎসাহ দিয়ে আসছেন।

মামুনের মা মাহমুদা বললেন, ‘আমার পিতৃহারা ছেলেটা শৈশব থেকেই মানুষকে সবজির বীজ বিতরণ করে যাচ্ছে। ভ্রাম্যমাণ পাঠাগারও চালাচ্ছে। আমি শুরু থেকেই ওর কাজকে ভালোবেসেছি এবং উৎসাহ দিয়েছি।’

ভবিষ্যতে আর কী করার ইচ্ছা জানতে চাইলে মাহমুদুল ইসলাম মামুন বলেন, ‘একটা সুন্দর দূষণমুক্ত পৃথিবীর স্বপ্ন দেখি। সেই স্বপ্ন পূরণে আমৃত্যু কাজ করে যেতে চাই।’

মামুন সম্পর্কে জানতে চাইলে তেঁতুলিয়া সরকারি কলেজের শিক্ষক মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘মামুন আমাদের গ্রামের কৃতী সন্তান। ছোট থেকেই সে গাছপালা ভালোবাসে। মাস্টার্স পাস করার পরও সে চারাগাছ বিতরণ, দরিদ্রদের পাঠদান, বই পড়ানোর কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। আমরা সবাই তার মঙ্গল কামনা করি।’

মামুনের কাজের প্রশংসায় তেঁতুলিয়ার মাথাফাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আলমগীর হোসেন বলেন, ‘আমাদের মামুন বিনামূল্যে পরিবেশের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। মামুনের কার্যক্রম দেখে স্কুলের ছাত্রছাত্রীরাও পরিবেশ রক্ষায় সচেতন হচ্ছে।’

আজিজনগর গ্রামের শাহিনা বেগম বলেন, ‘মামুন ভাই আমাকে পেঁপে গাছ, আম গাছ, পেয়ারা গাছ দিয়েছেন। আমরা সেই গাছের ফল খাচ্ছি। বিক্রিও করছি। তিনি আমার সন্তানকে লেখাপড়াও শেখাচ্ছেন।’

এমনকি দেশবরেণ্য কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেনও একবার মামুনের কাজের প্রশংসা করে তার ভ্রাম্যমাণ পাঠাগারের জন্য বই উপহার দিয়েছিলেন।

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.
kalbela.com