মানুষের জীবনের গল্পগুলো কখনো কখনো সিনেমার চেয়ে বেশি সিনেম্যাটিক হয়ে ওঠে। সেইসব গল্প যখন বাস্তবতার রঙে আঁকা হয়, তখন তার রেশ থেকে যায় অনেক দূর পর্যন্ত। দেশীয় শোবিজের গুণী অভিনেত্রী রুনা খান। কালবেলার সঙ্গে একান্ত আলাপে সরল অথচ গভীর কথাগুলো বলেছেন। লিখেছেন রাজু আহমেদ।
২৩তম ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রিমিয়ার হওয়া চলচ্চিত্র ‘নীলপদ্ম’ যেন এক নিঃশব্দ আহ্বান। যৌনকর্মীদের জীবনের রূঢ় বাস্তবতাকে ঘিরে এই ছবিটি তৈরি হয়েছে। প্রতিটি দৃশ্য যেন বাস্তবতার এক কঠিন আয়না। এই সিনেমা কেমন সাড়া পেল? রুনা খানের কণ্ঠে ফুটে উঠল গর্ব আর তৃপ্তির মিশেল।
‘সত্যি বলতে, এমন উষ্ণ সাড়া পাব ভাবিনি। প্রথম প্রদর্শনীটি ছিল জাতীয় জাদুঘরে, আর দ্বিতীয়টি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মিলনায়তনে। সেখানে শিক্ষার্থীদের উৎসাহ আমাকে ছুঁয়ে গেছে। নতুন প্রজন্ম যখন এমন একটি স্পর্শকাতর গল্পকে গ্রহণ করে, তখন মনে হয়, সমাজ বদলাচ্ছে।’
ছবিটি এখনো প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায়নি। পরিচালক তৌফিক এলাহী আন্তর্জাতিক কিছু উৎসবে ছবিটি প্রদর্শন করতে চান, তারপর দেশের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির পরিকল্পনা আছে।
‘এই চলচ্চিত্রের শুটিং করতে গিয়ে আমি এমন একটি অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছি, যা আমার ভেতরের মানুষটাকেই বদলে দিয়েছে। দৌলতদিয়ার সেই নারীরা, যাদের ভালোবাসা আমাকে ঋদ্ধ করেছে—তাদের হাসির আড়ালে লুকানো বেদনা আমাকে নাড়িয়ে দিয়েছে।’
রুনা খান সেই বাস্তবতার কথা শোনালেন, যাদের জীবনের গল্প আমরা প্রায়ই শুনেও না শোনার ভান করি। ‘ওরাও আমাদের মতোই পেশাজীবী। তবে আমাদের সমাজ তাদের গায়ে এক অদৃশ্য অমানবিকতার ছাপ এঁকে দেয়। মৃত্যুর পরও সেই অবহেলার রেশ থেকে যায়। একসময় ওদের কবর দেওয়ারও অধিকার ছিল না। এখন কবর দেওয়ার জায়গা পেলেও, সম্মান আজও অধরা।’
রুনা খানের কাজের প্রতি নিষ্ঠা, চরিত্র বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে তার সংবেদনশীলতা বরাবরই প্রশংসিত। কেন তিনি এই কঠিন গল্পের অংশ হতে চাইলেন?
‘পরিচালক তৌফিক এলাহীর সঙ্গে এর আগে কখনো কাজ করিনি। এক পরিচিতজন সজল ভাই গল্পটি শোনালেন। গল্পটি পড়েই যেন মন থেকে একটা তাগিদ অনুভব করলাম। এই চরিত্রটা কেবল অভিনয়ের নয়, বরং এক ধরনের দায়বদ্ধতার কাজ। নিজের ভেতরের শক্তিকে ছুঁয়ে দেখার একটি অভিজ্ঞতা।’
এই সিনেমার জন্য তাকে যেতে হয়েছিল দৌলতদিয়ার যৌনপল্লিতে। এমন একটি জায়গায় দিনের পর দিন থেকে শুটিং করা সহজ ছিল না। কিন্তু তার অভিজ্ঞতার কথা শুনে বোঝা যায়, কতটা মানবিক এই নারীদের গল্প।
‘সেখানে থেকে কোনো বেদনা পাইনি। বরং ওরা আমাকে মায়ায় জড়িয়ে ফেলেছিল। আমার জন্য খাবার নিয়ে এসেছে, গল্প করেছে। সেই সময়টুকু যেন এক অনন্য অভিজ্ঞতা। আড্ডা আর হাসিতে ভরা সেই সময়গুলো আমাকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে। কিন্তু সেই হাসির আড়ালে ছিল এক অন্যরকম নীরব বেদনা। অসমাপ্ত স্বপ্ন আর অব্যক্ত কষ্টের গল্প যেন প্রতিটি চোখে লুকিয়ে ছিল।’
রুনা খানের কণ্ঠে ধ্বনিত হয় এক অনাড়ম্বর সত্য। ‘মানুষ হিসেবে মানবিক হওয়াটাই আমাদের আসল কাজ। এই চলচ্চিত্র যদি কাউকে একটুও ভাবায়, তাকে যদি একটু সহানুভূতিশীল করে তোলে, তবে সেটাই হবে আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।’