বায়ুদূষণে বাড়ছে রোগবালাই

স্বাস্থ্য
বায়ুদূষণে বাড়ছে রোগবালাই

দূষিত শহরের তালিকায় ঘুরেফিরে বারবার আসছে রাজধানী ঢাকার নাম। ঢাকার বায়ুদূষণ ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। ফলে বছরজুড়ে নানা রোগব্যাধিতে ভুগছে নগরবাসী। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধরা বেশি ভুক্তভোগী। বায়ুদূষণের এ শহরে কীভাবে সুস্থ থাকবেন সে বিষয়ে জানাচ্ছেন ড. হেমন্ত রায় চৌধুরী

বিশ্বে বায়ুদূষণে অন্যতম ঢাকা। বায়ুদূষণের অন্যতম কারণ গাছ কমে যাওয়া, গাড়ি থেকে নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়া, শিল্পাঞ্চল, ইটভাটার কালো ধোঁয়া ও নাগরিক বর্জ্য। নির্মাণাধীন সড়ক, মেট্রোরেল, বিআরটি, এক্সপ্রেসওয়ে এবং অন্যান্য চলমান উন্নয়ন প্রকল্পসহ যে কোনো ভবন নির্মাণসামগ্রীর ধুলাবালি বাতাসকে উল্লেখযোগ্যভাবে দূষিত করছে। এ ছাড়া সিএনজিচালিত যানবাহন থেকে বের হওয়া ক্ষতিকারক বেনজিন প্রতিনিয়ত বাতাসে মিশছে। গাড়ির জ্বালানি তেলে ভেজাল ও ত্রুটিপূর্ণ ইঞ্জিনের কারণে গাড়ির ধোঁয়ার সঙ্গে কার্বন ডাইঅক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড, সালফার ডাইঅক্সাইড, অ্যালডিহাইডসহ সিসার নিঃসরণ বাতাসকে দূষিত করে। ট্যানারি শিল্পকারখানা থেকে হাইড্রোজেন সালফায়েড, অ্যামোনিয়া, ক্লোরিনসহ নানাবিধ রাসায়নিক নিঃসরণ হচ্ছে।

রোগের ঝুঁকি

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি প্রজন্ম যদি দীর্ঘসময় বায়ুদূষণের মধ্যে কাটিয়ে দেয়, তার মারাত্মক প্রভাব পড়ে পরবর্তী প্রজন্মের ওপর। মারাত্মক এসব দূষণের কারণে ঢাকা শহরের মানুষ প্রতিনিয়ত অ্যাজমা (হাঁপানি), ক্রনিক অবসট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ (সিওপিডি) ও ফুসফুসের ক্যান্সারের মতো মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। শ্বাসতন্ত্রের নানা ধরনের রোগের পাশাপাশি বায়ুদূষণের কারণে বাড়ছে স্ট্রোক, হৃদরোগ, স্তন ও মূত্রথলির ক্যান্সার, অ্যালার্জি, চর্মরোগ, চোখের অসুখ। এ ছাড়াও গর্ভাবস্থার ঝুঁকি, বন্ধ্যত্ব, শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া, ডিমেনশিয়া, আলঝেইমারস ও টাইপ-২ ডায়াবেটিসসহ বহু রোগের সঙ্গে বায়ুদূষণের সম্পর্ক রয়েছে বলে প্রমাণ পেয়েছেন গবেষকরা। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের মতে, শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে নগরবাসী যে পরিমাণ সিসা গ্রহণ করছে তা সহনীয় মাত্রার চেয়ে অন্তত ১০ গুণ বেশি। বায়ুদূষণের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশুরা। অতিরিক্ত সিসা শিশুর মানসিক বৃদ্ধিকে ব্যাহত করে।

বায়ুদূষণ রোধে

  • বেশি করে গাছ লাগাতে হবে। কারণ গাছ বায়ুদূষণ প্রতিরোধে জোরালো ভূমিকা রাখে। শহরে ছাদবাগানে উৎসাহিত করা।

  • নতুন রাস্তাঘাট, ব্রিজ, ড্রেন নির্মাণ ও মেরামতকালে নিয়মিত পানি স্প্রে করতে হবে। সব ধরনের নির্মাণসামগ্রীসহ বর্জ্য ও ক্ষতিকর পদার্থ সবসময় ঢেকে পরিবহন ও সংরক্ষণ করতে হবে।

  • ক্লোরোফ্লারো কার্বন (সিএফসি) যন্ত্রপাতি ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। পলিথিনের ব্যবহার ও পোড়ানো সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে হবে।

  • পরিবেশবান্ধব শিল্পকারখানা স্থাপন করতে হবে। ইটভাটাসংক্রান্ত আইন সম্পূর্ণরূপে অনুসরণ করতে হবে।

  • ক্ষতিকর ধোঁয়া নির্গমনকারী যানবাহন চলাচল বন্ধ করতে হবে। ফিটনেসবিহীন যানবাহন বায়ুদূষণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। নিয়মিত সার্ভিসিং করা, সারানো বা ধোঁয়ামুক্ত করলে নিজের পরিবার ও শহরবাসী রক্ষা পাবে।

যা করতে হবে

  • ঋতু পরিবর্তনের এ সময়ে বাতাসের আর্দ্রতা কমে বাতাস শুষ্ক হয়, বাতাসে ধূলিকণার মাত্রা বেড়ে যায়, নানা জীবাণু ভেসে বেড়ায়। এ সময় হাঁচি, কাশিসহ শ্বাসযন্ত্রের নানা রোগ তথা অ্যাজমা, সিওপিডির মাত্রাও বেড়ে যায় বলে একটু সতর্কতার সঙ্গে চলতে হয়। শিশু ও শ্বাসকষ্টের রোগীদের বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে বের হতে দেওয়া উচিত নয়।

  • বাইরে বের হলে অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। শিশুকে নিয়ে বাইরে বেরোনোর সময় অবশ্যই তাকে মাস্ক পরান। বাতাসে থাকা ধূলিকণা, দূষিত পদার্থ, ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসকে আটকে দেবে মাস্ক।

  • বাড়িতে নবজাতক থাকলে, তাদের দূষণ থেকে রক্ষার জন্য বাড়িতে এয়ার পিউরিফায়ার মেশিন বসান। এটি বাতাস থেকে সব দূষিত পদার্থ পিউরিফাই করে বাতাসকে শুদ্ধ করে তোলে।

  • ফুসফুসের কর্মক্ষমতা বাড়াতে প্রতিদিন ৩০-৪০ মিনিট শারীরিক ব্যায়াম করুন, রোদে হাঁটুন বা সাঁতার কাটুন। হাঁটার জন্য ভোরবেলা আদর্শ সময় কারণ ভোরে বাতাস তুলনামূলক কম দূষিত থাকে। হাঁটা বা ব্যায়ামের সময় মাস্ক ব্যবহার না করাই নিরাপদ।

  • ধূমপায়ীদের মধ্যে ক্ষতির ঝুঁকি বেশি। তাই ধূমপান প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যা-ই হোক না কেন, অবশ্যই পরিত্যাজ্য।

  • দূষণজনিত ফুসফুসের রোগ থেকে সুস্থ থাকতে ভিটামিন সি-সমৃদ্ধ ফলমূল ও শাকসবজি খান। ভিটামিন ‘সি’র কার্যকারিতা ২৪ ঘণ্টার বেশি থাকে না। তাই প্রতিদিন একটু হলেও লেবু, আমলকী, আনারস, জাম্বুরা, আমড়া, পেয়ারা, কাঁচা মরিচ, জলপাই, টমেটো, কমলালেবু ইত্যাদি গ্রহণ করুন।

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.
logo
kalbela.com