দাঁতের স্বাস্থ্য

দাঁতের সুরক্ষা জানতে হলে জানতে হবে দাঁতে সাধারণত কোন রোগগুলো হয় এবং কেন হয়। -ডা. তানজিনা আফরিন
দাঁতের স্বাস্থ্য

দাঁতের রোগ

দন্তক্ষয় (ডেন্টাল ক্যারিস) : দাঁতের কিছু অংশ ক্ষয় বা কখনো পুরো দাঁতই কালো হয়ে যায় এতে। অনেকে প্রাথমিক অবস্থায় এটাকে অবহেলা করে, যা একদমই উচিত নয়। ছোট একটুখানি ক্ষয় থেকেও দন্ত মজ্জার প্রদাহ (Pulpitis) হতে পারে। পরে যা জীবাণু দ্বারা সংক্রমিত হয়ে দাঁতের গোড়ার কোষ পর্যন্ত ছড়িয়ে যেতে পারে (Periapical Abscess)। সময়মতো চিকিৎসা না নিলে এ সংক্রমণ চোয়ালের হাড় থেকে গলা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে। প্রাণঘাতী কয়েকটি রোগও এতে দেখা দিতে পারে। যেমন—Cellulitis, Ludwig’s Angina, Alveolar abscess (চোয়ালের হাড়ের ভেতর পুঁজ জমে যাওয়া) ইত্যাদি।

মাড়ির প্রদাহ (Gingivitis): এ রোগে দাঁতের গোড়া বা মাড়ি থেকে রক্ত বের হওয়া, দাঁতে শিরশিরে অনুভূতি, ঠিকমতো খাবার চিবুতে না পারা ইত্যাদি লক্ষণ দেখা যায়। চিকিৎসকের পরামর্শ না নিলে দাঁতের গোড়া ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে দাঁত নড়েও যেতে পারে। এর পর সেটা হয় ফেলে দিতে হবে বা নিজেই পড়ে যাবে। আর এভাবে একটি দাঁত হারালে পরে বাকি দাঁতও সামঞ্জস্য হারায় এবং দাঁতের শ্রেণিবিন্যাস নষ্ট হয়। দাঁত ও মাড়ির রোগের আরও কিছু লক্ষণ হলো মুখে দুর্গন্ধ, গোড়ায় প্লাক বা কালো/বাদামি স্তর জমে যাওয়া, তীব্র ব্যথা বা শিরশিরে অনুভূতি এবং কখনো গাল ফুলে যাওয়া।

কারণএসব রোগের প্রধান কারণ হিসেবে পরিসংখ্যানে এসেছে ঠিক নিয়মে এবং ঠিক সময়ে দাঁত ব্রাশ না করার প্রবণতা, দাঁতের যত্নে অবহেলা, উদাসীনতা এবং সচেতনতার অভাব। শিশু বয়সে সুষম খাদ্য গ্রহণে অনীহা থেকেও এসব রোগ দেখা দেয়।

শিশুকালে খাবার ঠিকমতো চিবিয়ে না খাওয়া, পুষ্টিহীনতাও এসব রোগে ভূমিকা রাখে। সেই সঙ্গে খাদ্য তালিকায় ভিটামিন সি, ডি, ক্যালসিয়াম, প্রোটিন জাতীয় খাবার না থাকা। শাকসবজি, মাছ, মাংস ও বিভিন্ন খনিজ লবণের ঘাটতি ইত্যাদি।

খাদ্য গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে মুখে জমে থাকা খাবার পরিষ্কার না করা হলে সেখান থেকেও দাঁতের ক্ষয় এবং মাড়ির ইনফেকশন হয়।

প্রতিরোধ ও প্রতিকার

মুখের স্বাস্থ্য রক্ষার প্রক্রিয়া বা পরিষ্কার রাখার ব্যাপারটি শিশুকাল থেকেই চর্চা করা উচিত। শিশুর মুখে দাঁতের আবির্ভাব ঘটে ৬ থেকে ৮ মাসে। তখন থেকেই দুধ দাঁতের যত্ন করা উচিত। এ ক্ষেত্রে সিলিকন টুথব্রাশ ব্যবহার করা যায়। দুধদাঁতের বয়সভেদে বিভিন্ন পেস্ট ও ব্রাশ ব্যবহার করতে হবে।

সঠিক নিয়মে ব্রাশ করার পদ্ধতি জানতে দন্ত চিকিৎসকের কাছে একবার হলেও যাওয়া উচিত। দিনে দুবার খাবার পর ব্রাশ করতে হবে, বিশেষ করে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে। মুখে খাবার জমিয়ে রাখা যাবে না। খাবার খাওয়ার পর ডেন্টাল ফ্লস ব্যবহার করতে হবে। কখনো ইন্টারডেন্টাল টুথব্রাশ ব্যবহারেরও প্রয়োজন হতে পারে। এর পর হালকা গরম পানিতে লবণ মিশিয়ে ভালোভাবে কুলকুচি করতে হবে।

ফ্লুরাইডযুক্ত টুথপেস্ট ব্যবহার করতে হবে। বছরে অন্তত দুবার দাঁতের চিকিৎসকের কাছে দাঁত পরিষ্কার করে নিলেও সুস্থ থাকা সম্ভব।

ফ্লুরাইডযুক্ত মাউথ ওয়াশ চার থেকে ছয় সপ্তাহ ব্যবহার করা উচিত। এটি দন্তক্ষয় এবং মাড়ির রোগ অনেকটা প্রতিরোধ করবে।

পুষ্টিকর ও সুষম খাবার গ্রহণও জরুরি। শ্বেতসার ও শর্করা জাতীয় খাবার যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলতে হবে। আঠালো চিনি জাতীয় খাবারে দন্তক্ষয় বেশি হয়। এগুলো খেলেও ব্রাশ বা অন্তত কুলি করার অভ্যাস করাতে হবে শিশুকে।

অনেক সময় শিশুদের দাঁতে সাপ্লিমেন্ট ফ্লুরাইড এবং পিটস অ্যান্ড ফিশার সিলেন্ট প্রয়োগ করার দরকার হয়। এতে শিশুর দাঁতে ক্যারিজ কম হয়।

লেখক : সিনিয়র কনসালট্যান্ট, ল্যাবএইড স্পেশালাইজড ডেন্টাল ক্লিনিক

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.
logo
kalbela.com