অনিরাপদ ক্যাম্প রোহিঙ্গাদের ঠেলছে ঝুঁকির সাগরপথে

রোহিঙ্গা ক্যাম্প।
রোহিঙ্গা ক্যাম্প।ছবি : সংগৃহীত

দেশে দমন-নিপীড়নের শিকার হয়ে ২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে দলে দলে বাংলাদেশে এসেছিল রোহিঙ্গারা। তাদের আশ্রয় হয়েছে কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকার ক্যাম্পে। এরপর পার হয়ে গেছে দীর্ঘদিন। সংকটের কোনো সুরাহা হয়নি। সম্প্রতি এসব ক্যাম্পে বেড়ে গেছে হত্যা, অপহরণ, ধর্ষণ, ডাকাতি, মানব পাচার এবং মাদক চোরাচালানের মতো অপরাধমূলক ঘটনা। এ ছাড়া ক্যাম্পে শিক্ষা ও চাকরির সুযোগের অভাব এবং সেনাশাসিত মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার ক্ষীণ সম্ভাবনার কারণে হতাশ হয়ে পড়েছে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা। ফলে জীবনঝুঁকি উপেক্ষা করে এখন তারা বিপজ্জনক নৌকায় সাগরপথে মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়া যাওয়ার পথ বেছে নিচ্ছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের বিশেষ এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এসব তথ্য।

বাংলাদেশ পুলিশের বরাতে সংবাদ সংস্থাটি জানায়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ক্যাম্পে হত্যা, অপহরণ, ধর্ষণ, ডাকাতি, মানব পাচার এবং মাদক চোরাচালানের মতো অপরাধ নথিভুক্তির ঘটনা বেড়েছে। শুধু ২০২২ সালেই হত্যার ঘটনা ঘটেছে ৩১টি, যা গত পাঁচ বছরে সর্বোচ্চ।

গত বছরের এপ্রিল থেকে অক্টোবরের মধ্যে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বন্দুকধারীরা মোহাম্মদ ইসমাইলের চার আত্মীয়কে খুন করে। সেপ্টেম্বরে অপহরণ করা হয় তাকে। এরপর বাম হাত ও পা কাটার পর তাকে ফেলা হয় খালে। কুতুপালং শরণার্থী ক্যাম্পে একটি প্লাস্টিকের মাদুরের ওপর বসে তিনি বলেন, তারা বারবার আমার কাছে জানতে চাইছিল, কেন আমি তাদের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পুলিশকে দিয়েছি। বললাম, তোমাদের সম্পর্কে আমার জানা নেই এবং আমি কোনো তথ্য দিইনি।

পা হারানো ইসমাইল এখন বাবা-মা, স্ত্রী ও ভাইয়ের সঙ্গে থাকেন। তিনি তার জীবন নিয়ে যথেষ্ট শঙ্কিত। পাশাপাশি তিনি অনুধাবন করতে পারেন কেন রোহিঙ্গারা বাংলাদেশ থেকে পালাচ্ছে। তিনি বলেন, সন্ত্রাসীদের হাতে মরা অথবা মৃত্যু ভয়ে দিন পার করার চেয়ে সাগরে মরাটাই বহুগুণ শ্রেয়।

দিল মোহাম্মদ নামে এক রোহিঙ্গা নেতা বলেন, ক্যাম্পে হত্যার ঘটনা বাড়ছে। বাদ যাচ্ছেন না নেতারাও। এ কারণে বাড়ছে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিষয়ে ভয় ও উদ্বেগ। ক্রমাগত বেড়ে চলা সহিংসতার লাগাম টেনে ধরতে ব্যর্থ হচ্ছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। রোহিঙ্গাদের বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রার পেছনে এটি একটি প্রধান কারণ।

ইসমাইলের স্বজন হারানো বা শরণার্থী ক্যাম্পের অন্যান্য বিষয় নিয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে পুলিশ।

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের তথ্য মতে, ২০২২ সালে অন্তত ৩৪৮ রোহিঙ্গা সাগরে নিহত হয়েছে। গত বছর প্রায় ৩ হাজার ৫৪৫ রোহিঙ্গা বঙ্গোপসাগর এবং আন্দামান সাগর পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করেছে। ২০২১ সালে এ সংখ্যা ছিল ৭০০-এর মতো।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, ক্যাম্পে অপরাধ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে সরকার। এমনকি সেখানে আলাদা পুলিশ ব্যাটালিয়ন মোতায়েন করা হয়েছে। কিন্তু যখনই আমরা অভিযান চালাতে যাই তখনই সন্ত্রাসীরা সীমান্ত পেরিয়ে পালিয়ে যায়। আমার মতে, আরসা এসব ঘটনার মূল। এ গোষ্ঠী এখন মাদক চোরাচালান ও চাঁদাবাজির ওপর নির্ভরশীল। তাদের কোনো দেশ নেই, সমাজ নেই; তাদের কেউ স্বীকৃতি দেয় না। তাই তারা অপরাধে জড়িত হয়েছে এবং তাদের কাছে জীবনের কোনো গুরুত্ব নেই।

এ কর্মকর্তা মনে করেন, এ সংকটের ‘একমাত্র সমাধান’ রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো। কিন্তু দেশটির জান্তা সরকার যারা কিনা ক্ষমতা দখল করেছে দুই বছর আগে, তারা রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে তেমন একটা আগ্রহ দেখাচ্ছে না।

এ বিষয়ে জানতে মিয়ানমার সরকারের মুখপাত্রের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে রয়টার্স।

এদিকে, অপরাধের পাশাপাশি শিক্ষা ও চাকরির সুযোগের অভাবের কারণেও হতাশ রোহিঙ্গারা।

বেসরকারি সংস্থা ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাকশন গ্রুপের বার্মা ভাষার জ্যেষ্ঠ প্রশিক্ষক খায়ের উল্লাহ বলেন, অপরাধের ঘটনায় উদ্বেগের পাশাপাশি ৯০ শতাংশ শরণার্থীর শিক্ষা ও চাকরির যথেষ্ট সুযোগ নেই বলে তারা হতাশ। তারা তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত। তারা তাদের বৃদ্ধ বাবা-মাকে সহায়তা করতে পারছে না। এর বাইরে তাদের সংসারে যদি বাচ্চা হয় তখন কী হবে? এ ছাড়া বড় বিষয় হচ্ছে, এখান থেকে প্রত্যাবাসনের কোনো আশা দেখা যাচ্ছে না। ফলে বাধ্য হয়েই ক্যাম্প থেকে অবৈধভাবে পালানোর চেষ্টা করছেন তারা।

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.
logo
kalbela.com