‘শীতের আগুনে’ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত শিশুরা

বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিট।
বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিট।ছবি : সংগৃহীত

ঢাকা মেডিকেল কলেজের (ঢামেক) বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের শিশু ওয়ার্ডের চারতলা। ওয়ার্ডের একটি বেডে ৬ বছর বয়সী তাসলিম আখতারের নাক দিয়ে স্যালাইন চলছিল। বুক, বাম হাত ও ডান পায়ে ব্যান্ডেজ। সে গাইবান্ধা থেকে ঢাকার বাড্ডায় খালাবাড়িতে বেড়াতে এসেছিল। ৮ জানুয়ারি তার মা গোসল করাতে গিয়ে ভুলবশত গরম পানির সঙ্গে ঠান্ডা পানি না মিশিয়ে তার শরীরে ঢেলে দেয়। চিকিৎসকের রিপোর্টে জানা যায়, ওর বুকে ১০ শতাংশ, বাম হাত ৪ শতাংশ এবং ডান পায়ের ঊরু ২ শতাংশ ঝলসে গেছে। এ প্রসঙ্গে তার মা রুবিনা কালবেলাকে বলেন, মেয়ে গোসল করতে চাচ্ছিল না। ভুলে গরম পানি মগে নিয়ে তার শরীরে ঢেলে দিই। ও চিৎকার করায় বুঝতে পারি, ঠান্ডা পানি মেশানো হয়নি।

ব্লু ইউনিটের ৫ নম্বর বেডে শুয়ে কাতরাচ্ছে ঝিনাইদহের মহেশপুরের লামিয়া (৮)। ওর শরীরের ৩৫ শতাংশ পুড়ে গেছে। ওর বয়সী ফুপুর সঙ্গে মাঠে নারিকেলমালায় আগুন দিয়ে রান্নাবান্না খেলার সময় ফ্রকে আগুন ধরে যায়। আগুন দেখে সবাই ভয়ে পালিয়ে যায়। লামিয়ার বাবা মোহাম্মদ নূহ নবী বিপু কালবেলাকে বলেন, দোতলা থেকে একজন আগুন দেখে চিৎকার করলে তা নেভানোর চেষ্টা করা হয়। গত বছরের ১২ ডিসেম্বর এ ঘটনা ঘটে।

শীতকালে আগুন পোহানোসহ আগুনের এমন বহুবিধ ব্যবহারে বাড়ছে দগ্ধ শিশুর সংখ্যা। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বছরের এই সময়টায় শিশুদের অগ্নিদগ্ধ হওয়ার সংখ্যা বেড়ে যায়। ঢামেক বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের তথ্য মতে, চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারি ৩০০ শয্যার মধ্যে ২৫৮ জন বিভিন্ন ধরনের পোড়া রোগী ভর্তি হয়ে চিকিৎসাসেবা নিচ্ছেন। তাদের মধ্যে শিশু রয়েছে ৬০ জন।

ঢামেকের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের প্রধান ডা. বিধান সরকার কালবেলাকে বলেন, সারা দেশ থেকে পোড়া রোগী আসছে। শীতজনিত কারণে অগ্নিদগ্ধ রোগীর সংখ্যা বাড়ছে।

দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগুনে পোড়া মানুষ এখানে আনা হয় চিকিৎসার জন্য। পথে অনেকটা সময় ব্যয় হয়ে যায়। এ প্রসঙ্গে বিধান সরকার বলেন, পোড়ার পর ২৪ ঘণ্টা খুব গুরুত্বপূর্ণ। আগুনে শরীরের এডুকেট সম্পূর্ণ শেষ হয়ে যায়। যত শতাংশ পুড়ে গেছে সেই হিসাব অনুযায়ী যদি তখনি রোগীকে এডুকেট স্যালাইন দেওয়া যায়, তাহলে রোগীকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব; কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ওই রোগীগুলো দেশের দূর-দূরান্ত থেকে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পরে আমাদের কাছে এসে পৌঁছায়। এডুকেট স্যালাইন পেয়ে না আসার কারণে তাদের শরীরে এডুকেট স্যালাইন দিলেও সেটি পূরণ হয় না।

একই ইউনিটের ৮ নম্বর বেডের শিশু আয়শা সিদ্দিকা আগুন পোহাতে গেলে তার পোশাকে আগুন ধরে যায়। তার মা পোশাক শ্রমিক, বাবা রিকশাচালক। তাদের পক্ষে মেয়ের চিকিৎসার খরচ বহন করা সম্ভব না হওয়ায় প্রতিবেশীরা চাঁদা তুলে চিকিৎসার খরচ কিছুটা দিয়েছে। আয়শার মা বলেন, কোথা থেকে চিকিৎসার খরচ জোগাব, জানি না।

এ ধরনের রোগীদের চিকিৎসার বিষয়ে জানতে চাইলে বিধান সরকার বলেন, যাদের চিকিৎসা ব্যয় বহনের সামর্থ্য নেই, তাদের জন্য সমাজকল্যাণ ফরমে রোগীর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের কথা লিখে দিই। সমাজকল্যাণ থেকে একজন রোগীর জন্য চিকিৎসা ব্যয় সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত দিয়ে থাকে।

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.
logo
kalbela.com