চিরদিনের সেই আমি…

ম্যারডোনা আসলে একটা স্মৃতির মালা, এবার খারাপ লাগছে তিনি নেই বলে। ছিয়াশি বিশ্বকাপের নায়ক চিরতরে হারিয়ে গেছেন ২০২০ সালের ২৫ নভেম্বর। আজ তার দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী …
চিরদিনের সেই আমি…

ম্যারডোনা আসলে একটা স্মৃতির মালা, যা আমরা নিজের মতো করে যত্নে, ভালোবেসে গলায় পরে বসে আছি। বিশ্বকাপ এলেই সে মালা বুকের কাছে দোলে। টান পড়ে। ভালোও লাগে। এবার খারাপ লাগছে তিনি নেই বলে। ছিয়াশি বিশ্বকাপের নায়ক চিরতরে হারিয়ে গেছেন ২০২০ সালের ২৫ নভেম্বর। আজ তার দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী …

তখনো আমরা বিয়া ফিরিয়েতো বস্তির নাম শুনিনি। ‘পেলুসা’কেও চিনি না। ইভা পেরনের বিপ্লবও দূরের দিগন্ত। আর সিরিলোও অচেনা। হাফপ্যান্ট পরা সেই বয়সে দিয়েগো ম্যারাডোনাকে প্রথম দেখলাম টেলিভিশনের পর্দায়। আগেও তাকে দেখেছিলাম টি-শার্টে কিংবা দৈনিক কাগজের পাতায়। স্থির। নিশ্চল। চুরানব্বইয়ে প্রথম আমার ম্যারাডোনা বল পায়ে দৌড়ালেন। মধ্যরাতে। গ্রিসের বিপক্ষে আর্জেন্টিনা সেদিন মাঝরাতেই খেলেছিল। ম্যারাডোনা গোলও করেছিলেন। তারপর ক্যামেরার দিকে ছুটে গিয়ে সে কী হুঙ্কার।

তখন তিন গাঁও মিলে একটা টেলিভিশন থাকত। ভরা বর্ষার সময় বিশ্বকাপ হতো। সাপের ভয়, মারের ভয় উপেক্ষা করে মাঝরাতে আমরা ফুটবল অভিসারে বেরোতাম। টেলিভিশনওয়ালা বাড়িতে বিদ্যুৎ না থাকলে কষ্ট বেড়ে হতো দ্বিগুণ। মফস্বল শহরে অন্য কার বাড়িতে টেলিভিশন আছে—খোঁজ লাগাও। রাতের মধ্যে খুঁজে পেতেই হবে যে। ম্যারাডোনাকেও দেখতেই হবে। সেসব দিন এখন আর নেই। বিশ্বকাপ এখন শুয়েবসে দাঁড়িয়ে যেভাবে খুশি দেখতে পারবেন। চাইলে পুরোনো ম্যারাডোনাকেও দেখে নিতে পারেন। লিখতে গিয়ে কী ভুলটাই না করে ফেললুম দেখুন তো। চিরনতুন ম্যারাডোনাকে পুরোনো বলে ফেলেছি। স্মৃতি যতই মলিন হোক, ছিয়াশি মলিন হবে না কোনোদিন। পুরোনো হওয়ারও তাই প্রশ্ন নেই।

লেখা শুরু করেছিলাম আমেরিকান বিশ্বকাপে ম্যারাডোনা দেখার কৈশোর স্মৃতিচারণে। সে স্মৃতি বুকে অমলিন থাক। এবার গল্পে ঢুকে পড়ি। আপনারা কী ভাবেন জানি না, তবে আমার মনে হয় ম্যারাডোনা আসলে একটা স্মৃতির মালা। যা আমরা নিজের মতো করে যত্নে, ভালোবেসে গলায় পরে বসে আছি। বিশ্বকাপ এলেই সে মালা বুকের কাছে দোলে। টান পড়ে। ভালোও লাগে।

এবার খারাপ লাগছে তিনি নেই বলে। ছিয়াশি বিশ্বকাপের নায়ক চিরতরে হারিয়ে গেছেন ২০২০ সালের ২৫ নভেম্বর। বিয়া ফিরিয়েতো বস্তির ছেলেটা আর কোনোদিন অভিমান করবে না। নেশা করবে না। ফুটবল পায়ে অমর কাব্যও লিখবে না। কাকা সিরিলো হাজারবার ডাকলেও সাড়া দেবে না। বুয়েনাস আয়ার্সের বিয়া ফিরিয়েতো বস্তির বাতাসে কান পাতলে যে ডাক হয়তো এখনো শোনা যায়। ঝড়-বৃষ্টির রাতে ছোট্ট খুপরিটা যখন ভেসে যেত, তখন ফুলের মতো তুলতুলে ‘পেলুসা’ কাকার কোলে চড়ে আশ্রয় খুঁজতেন। বাদাম, বস্তা, নেকড়া যা পেতেন তা দিয়ে বল বানিয়ে সারাদিন খেলতেন। সন্ধ্যায় ঘুমিয়ে পড়তেন নর্দমার পাশে ময়লার স্তূপে হেলান দিয়ে। প্রায়ই খুঁজে পাওয়া যেত না। তখনই বিয়া ফিরিয়েতোর অন্ধকার বস্তির পথে শোনা যেত সিরিলোর গলা, ‘দিয়েগো কোথায় আছিস...মাথাটা তোল।’

ম্যারাডোনার জন্ম হয়েছিল ইভা পেরনের নামাঙ্কিত হাসপাতালে। বস্তির ছোট্ট ঘরে পেরনের ছবিও টানানো ছিল। বাবা-মা ছিলেন পেরন-ভক্ত। সিনিয়র ম্যারাডোনা ফরাসি শরণার্থী হয়ে আর্জেন্টিনায় এসেছিলেন। স্প্যানিশ শরণার্থী দালমা সালভাদোরাকে বিয়ে করেন। তখন এমন শরণার্থীতে ভরা ছিল দেশ। ঊনবিংশ শতাব্দীর বিশের দশকে আর্জেন্টিনাকে বলা হতো অভিবাসীদের স্বর্গরাজ্য। এমন দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের সেরা ব্যক্তিত্বের নাম ইভা পেরন। ‘ম্যারাডোনার মতো অতি দারিদ্র্য থেকে উঠে এসছিলেন। তার প্রেমিক এবং স্বামী খুয়ান পেরন ছিলেন আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট। মাত্র তেত্রিশে ক্যান্সারে মারা যাওয়ার আগে ছয় বছরে ইভা আমূল পাল্টে দিয়েছিলেন আর্জেন্টিনার ভাবনা। গরিব, শ্রমিক, নারীদের অধিকার নিয়ে সোচ্চার সে দেশে তার আগে কেউ হয়নি। গান্ধীবাদ, মার্কসবাদের মতো আর্জেন্টিনাতেও একটা মতবাদ রয়েছে—পেরনইজম।’ লেখক রূপায়ণ ভট্টাচার্যের চমৎকার লেখা থেকেই জানতে পারি ম্যারাডোনার পেরন-প্রীতি। (চলবে)

-লিখেছেন জগন্নাথ বিশ্বাস

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.
kalbela.com