নির্বাচনকালীন সরকার জটিলতা

নির্বাচনকালীন সরকার জটিলতা

নির্বাচনের সময় যত এগিয়ে আসছে, রাজনীতিতে জটিলতা তত বাড়ছে। বর্তমান সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে না যাওয়ার ব্যাপারে অনড় মাঠের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলন করছে। তবে সরকারের দিক থেকে স্পষ্ট করে বলে দেওয়া হয়েছে, সংবিধানের বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনকালীন সরকারের অধীনেই আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সাদা চোখে দেখলে মনে হবে, দুদলই পয়েন্ট অব নো রিটার্নে। সমঝোতার কোনো সুযোগ নেই। আরও একটি নির্বাচন করার মতো সামর্থ্য বিএনপির আছে কি না, তা নিয়েও রাজনীতিতে আলোচনা আছে। বিএনপি একটি ক্ষমতামুখী নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল। বারবার নির্বাচন বয়কট করলে তাদের নেতাকর্মীদের ধরে রাখা মুশকিল হবে। আবার ২০১৪ ও ’১৮ সালের দুটি প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগের পক্ষে বিএনপিকে বাইরে রেখে আরও একটি নির্বাচন করা রাজনৈতিক বিবেচনায় যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ। তাই সাধারণে ধারণা, আগামী নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেবে। তবে সেই পরিবেশ সৃষ্টিতে কে কতটুকু ছাড় দেবে, সেটা নিয়েই এখন ভাবনা।

একটা কথা পরিষ্কার, বর্তমান বাস্তবতায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার সুযোগ নেই বললেই চলে। বিএনপি দাবি জানালেই আওয়ামী লীগ তা মেনে নেবে, এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। অতীতে আওয়ামী লীগ আন্দোলন করে বিএনপির কাছ থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আদায় করেছিল। কিন্তু ১৪ বছরে বিএনপি মাঠে এমন কোনো আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি, যা দিয়ে আওয়ামী লীগের কাছ থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আদায় করা সম্ভব। নিকট ভবিষ্যতেও তেমন আন্দোলন গড়ে তোলার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। তাই আওয়ামী লীগ কতটুকু ছাড় দেয়, বিদেশি শক্তিগুলো চাপ দিয়ে কতটুকু ছাড় আদায় করতে পারবে; সে আশায়ই বিএনপিকে বসে থাকতে হবে। একটি কথা বলে নেওয়া ভালো, আমি বরাবরই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার বিপক্ষে। যাদের হাতে আমরা পাঁচ বছরের জন্য দেশের দায়িত্ব ছাড়তে পারি, সেই রাজনীতিবিদদের আমরা মাত্র তিন মাসের জন্য বিশ্বাস করতে পারি না, এ বড় দুর্ভাগ্যজনক। অগণতান্ত্রিক সরকারের কাছে গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার প্রত্যাশা আসলে দুরাশা। আমি চাই, গণতন্ত্রই গণতন্ত্রের রক্ষাকবচ হোক। কিন্তু বিএনপি আমলে মাগুরা উপনির্বাচন ঘিরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি প্রবল হয় এবং বিএনপি সেটা মেনে নিতে বাধ্য হয়। আবার তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ধ্বংস করার দায়িত্বও বিএনপিকে নিতে হবে। বিচারপতিদের অবসরের বয়স বাড়িয়ে নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার আত্মঘাতী কৌশলটা বিএনপিরই বানানো। আর তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার কফিনে শেষ পেরেকটাও ঠুকেছিলেন বিএনপি মনোনীত রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ। নিজেই নিজেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান বানিয়ে ১/১১ সরকার ডেকে এনেছিলেন তিনি। আওয়ামী লীগ এই উদাহরণগুলো সামনে রেখে আদালতের রায়ের অজুহাতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে দেয়। নির্বাচিত সরকারের ধারাবাহিকতা রক্ষা আমাদের সাংবিধানিক চেতনা। নৈতিকভাবে আমি তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার বিপক্ষে হলেও একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনকালীন সরকার এবং শক্তিশালী নির্বাচনকালীন সরকার ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন যে সম্ভব নয়, সেটাও বারবার প্রমাণিত। তাই প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করা, বিচারব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। এরশাদের পতনের পর বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার থেকেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার ধারণাটি এসেছে। বিশ্বের কোনো গণতান্ত্রিক দেশেই এ ধরনের অগণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থা প্রচলিত নয়, গ্রহণযোগ্যও নয়। পাশের দেশ ভারত, আমাদের যারা নিয়মিত সবক দেয় সেই যুক্তরাষ্ট্র বা আমরা যাদের সরকারব্যবস্থা অনুসরণ করি সেই যুক্তরাজ্য—কোথাও কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নেই।

বলছিলাম নির্বাচন এগিয়ে আসার কথা। ভোটগ্রহণের জন্য আরও সাত মাসেরও কিছু বেশি সময় বাকি আছে বটে। তবে নির্বাচনকালীন সরকারের জটিলতা নিরসনে খুব বেশি সময় হাতে নেই। তপশিল ঘোষণার আগেই এ বিষয়ে একটা সিদ্ধান্ত হতে হবে। কদিন আগে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, নির্বাচনে আসার ঘোষণা দিলে বিএনপিকে নির্বাচনকালীন সরকারে আমন্ত্রণ জানানো হতে পারে। তবে সোমবারের সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন, আমরা ওয়েস্টমিনস্টার ডেমোক্রেসি ফলো করি। ব্রিটেনে কীভাবে ইলেকশন হয়, তারা কীভাবে করে, আমরা সেভাবেই করব। এর মধ্যে একটু দেখাতে পারি—পার্লামেন্টে সংসদ সদস্য যারা আছেন, তাদের মধ্যে কেউ যদি ইচ্ছা প্রকাশ করে যে নির্বাচনকালীন সময়ে তারা সরকারে আসতে চায়, আমরা নিতে রাজি আছি। এর আগে আমরা নিয়েছি। এমনকি ২০১৪ সালে তো খালেদা জিয়াকেও আমি আহ্বান করেছিলাম, তারা আসেনি। এখন তো তারা পার্লামেন্টেও নেই। কাজেই তাদের নিয়ে চিন্তারও কিছু নেই। তিনি বিএনপিকে আলোচনার ডাকার সম্ভাবনাও নাকচ করে দিয়েছেন। তবে বিএনপিও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া অন্য কোনো ইস্যুতে সরকারের সঙ্গে আলোচনায় অনাগ্রহ প্রকাশ করেছে। এমনকি নির্বাচনকালীন সরকারের ব্যাপারে ওবায়দুল কাদেরের প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করেছে বিএনপি।

২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে বিএনপিকে নির্বাচনকালীন সরকারের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। এমনকি তাদের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছিল। অবশ্য তখন তারা সংসদে ছিল। তাই তাদের আমন্ত্রণ জানানোর সুযোগও ছিল। কিন্তু বিএনপি সে আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করে নির্বাচন বয়কট এবং প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়েছিল। বয়কট করতে পারলেও প্রতিহত করতে পারেনি বিএনপি। সেই থেকে তাদের রাজনৈতিক পতন শুরু। অনেকেই মনে করেন, ২০১৪ সালের নির্বাচন বয়কটের ঘোষণা ছিল বিএনপির সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ভুল। এমনকি বিএনপি নেতাকর্মীরাও এটা বিশ্বাস করেন। ২০১৮ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণের আগে ইঙ্গিতে সে ভুলের কথা স্বীকারও করেছিলেন বিএনপি নেতারা। সে ভুলের মাশুল এখন তাদের দিতে হচ্ছে পদে পদে। নির্বাচনকালীন সরকারে গিয়ে ২০১৪ সালের নির্বাচনে অংশ নিলে বিএনপি ক্ষমতায় চলে আসত, এমন নাও হতে পারত। কিন্তু দল হিসেবে বিএনপি আরও অনেক শক্তিশালী অবস্থানে থাকতে পারত। দেশের গণতান্ত্রিক চিত্রও অন্যরকম থাকত।

সংসদের বাইরের কাউকে নির্বাচনকালীন সরকারে রাখার সুযোগ নেই, প্রধানমন্ত্রীর এ ঘোষণার পরও আমি মনে করি নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে জটিলতা নিরসনের সুযোগ এখনো শেষ হয়ে যায়নি। ওবায়দুল কাদের যেমনটি বলেছিলেন, নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিলে নির্বাচনকালীন সরকারে বিএনপির অন্তর্ভুক্তির সুযোগ আছে। সাংবিধানিকভাবেই এটা সম্ভব। প্রধানমন্ত্রী চাইলে মন্ত্রিসভার এক-দশমাংশ সদস্য সংসদ সদস্য নন এমন ব্যক্তিদের মধ্য থেকে মানে টেকনোক্র্যাট কোটায় নিতে পারবেন। তাই সংসদে না থাকলেও প্রধানমন্ত্রী চাইলে নির্বাচনকালীন সরকারের থাকার সুযোগ আছে বিএনপির। তবে প্রশ্ন হলো, বিএনপি সেই সুযোগটা নেবে কি না।

এখন পর্যন্ত যা রাজনৈতিক অবস্থান, তাতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া অন্য কোনো ব্যবস্থায় আগ্রহী নয় বিএনপি। যদি বিএনপি সত্যি নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকে, তাহলে তাদের সামনে একটাই পথ—প্রবল গণআন্দোলন গড়ে তুলে দাবি মানতে সরকারকে বাধ্য করা। কিন্তু নির্বাচনের আগে যেটুকু সময় বাকি আছে, তাতে বর্ষা, ঈদ, পরীক্ষা সামাল দিয়ে তারা তেমন আন্দোলন গড়ে তুলতে পারবে, এমনটা মনে করার লোকের সংখ্যা খুব বেশি নেই। বিদেশিরা আগামীতে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ব্যাপারে আগ্রহী হলেও এখনো কেউই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথা বলেনি। তবে এটা ঠিক, নির্বাচন শুধু অংশগ্রহণমূলক হলেই হবে না; সেটা অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হতে হবে। যাতে মানুষ স্বাধীনভাবে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পায়। নির্বাচনের যেটুকু সময় বাকি আছে, সবাই মিলে সে উপায়ই বের করতে হবে। গণতন্ত্রে আলাপ-আলোচনা, ছাড় দেওয়ার মানসিকতা থাকতে হবে সবারই। গোঁ ধরে থাকলে সেটা কারও জন্যই সুফল বয়ে আনবে না।

লেখক : হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.
logo
kalbela.com