দেশ ভালোবাসার বিষয়

এটিএন নিউজের বার্তাপ্রধান প্রভাষ আমীন।
এটিএন নিউজের বার্তাপ্রধান প্রভাষ আমীন।পুরোনো ছবি

বাংলাদেশের মানুষ রাজনীতি সচেতন, তবে সবাই রাজনীতি করেন না। যারা রাজনীতি করেন, তারা অন্যরকম। একসময় মানুষ দেশের জন্য, মানুষের জন্য রাজনীতি করত। রাজনীতি করতে গিয়ে দেশের জন্য, মানুষের জন্য সব বিলিয়ে দিত। রাজনীতি মানে রাজা হওয়ার নীতি নয়, নীতির রাজা। কিন্তু এখন দিন বদলেছে। রাজনীতিবিদরা এখন আর রাজনীতি করে নিঃস্ব হন না। রাজনীতি এখন ক্ষমতায় যাওয়ার অস্ত্র, আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার হাতিয়ার। রাজনীতিবিদরা যেমনই হোন, তারাই আমাদের শেষ আশ্রয়, তারাই দেশ শাসন করেন, আমাদের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করেন। আমরা জনগণ যেটা করতে পারে, ভোট দিয়ে ভালো রাজনীতিবিদদের হাতে দেশের দায়িত্ব তুলে দিতে পারেন। কিন্তু অনেক দিন হলো, জনগণের ভোট দেওয়ারও সুযোগ নেই। সব দল নির্বাচনে অংশ নেয় না, নিলেও জনগণের ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকে না। এখন আর তাই রাজনীতির সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক নেই। রাজনীতিবিদরা নিজেরাই নিজেদের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করেন।

জনগণকে উপেক্ষা করে রাজনীতিবিদরা নিজেদের ভাগ্য নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছেন ভালো কথা; জনগণের কথা না ভাবুন, দেশের কথা তো অন্তত ভাবতে পারেন। কিন্তু রাজনীতিবিদদের হুমকি-পাল্টা হুমকিতে আমাদের ত্রাহি দশা। কথায় বলে না, পাটা-পুতায় ঘষাঘষি, মরিচের মরণ। আমরা জনগণ হচ্ছি সেই মরিচ। রাজনীতিবিদরা আমাদের পিষে মারেন। নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজপথ আবার উত্তপ্ত। সমাবেশ-পাল্টা সমাবেশ চলছে। রাজপথে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সমস্যা নেই। সমস্যা হলো রাজনীতিবিদদের কথায়, আচরণে, হুমকি-পাল্টা হুমকিতে। ২০১৮ সালে বিএনপি বর্তমান সরকারের অধীনেই নির্বাচনে গেছে। তবে সে নির্বাচনে ভরাডুবি থেকে শিক্ষা নিয়ে বিএনপি এবার তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচনে না যাওয়ার পর অনড়। তবে শেষ পর্যন্ত বিএনপি নির্বাচনের বাইরে থাকতে পারবে কিনা, সে ব্যাপারে সন্দেহ আছে। আবার আওয়ামী লীগও বিএনপিকে ছাড়া আরেকটি প্রহসনের নির্বাচনের ঝুঁকি নেবে বলেও মনে হয় না। আওয়ামী লীগ নেতারা খুব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই বলছেন, গাধা যেমন ঘোলা করে পানি খায়, বিএনপিও ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে নির্বাচনে আসবে। তবে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন এখন সবার আকাঙ্ক্ষা। কে ক্ষমতায় আসবে, সেই সিদ্ধান্ত যেন জনগণ নিতে পারে। টানা ১৬ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপির জন্য অস্তিত্বের সংকট তৈরি করেছে। দলটি তাদের ৪৪ বছরে অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়েছে। কিন্তু এখনকার মতো অস্তিত্বের সংকটে কখনো পড়েনি। আওয়ামী লীগ ২১ বছর পরও দাপটের সঙ্গে ক্ষমতায় ফিরে আসতে পেরেছিল তাদের তৃণমূলে বিস্তৃত সাংগঠনিক সক্ষমতার জোরে। বিএনপির জনসমর্থন থাকলেও সংগঠন তত মজবুত নয়। বিএনপি এখন তাই মাঠে নেমেছে অস্তিত্বের লড়াইয়ে। আর মাঠে গণতান্ত্রিক আন্দোলন করার, সভা-সমাবেশ করার অধিকার সংবিধানেই স্বীকৃত। আবার সরকারি দল নির্বিঘ্নে বিরোধী দলকে মাঠ দখল করতে দেবে, এতটা গণতান্ত্রিকও আমরা হয়ে উঠতে পারিনি। তবে জাতীয়-আন্তর্জাতিক চাপে আওয়ামী লীগ আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে অনেক গণতান্ত্রিক আচরণ করবে, এমনটা প্রত্যাশিত ছিল। এটা অনেকটা টোপের মতোও বটে—বিএনপিকে সভা-সমাবেশ করতে দিয়ে গণতান্ত্রিক বাতাবরণ তৈরি করে তাদের নির্বাচনে আনার মতো পরিবেশ তৈরি করা।

এখন চলছে অস্ট্রেলিয়ায় টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের জমজমাট আসর। কিন্তু ক্রিকেট খেলার চেয়ে রাজনীতির মাঠের খেলাকেই বেশি চিত্তাকর্ষক মনে হচ্ছে। ‘খেলা হবে’ স্লোগানে দুপক্ষই মাতোয়ারা। কে, কার চেয়ে ভালো খেলোয়াড়, তা নিয়েই তর্ক হচ্ছে। জনগণের জন্য কারও কোনো মাথাব্যথা নেই।

‘পলিটিক্যাল রেটোরিক’ বলে একটা কথা আছে। রাজনীতিবিদরা যা ইচ্ছা তাই বলে এই ‘রেটোরিক’ দিয়ে পার পেয়ে যান। রাজনীতির মাঠে যেন যা ইচ্ছা তাই বলার স্বাধীনতা আছে। কিন্তু যারা দেশ চালান, তারা যা ইচ্ছা তাই বলবেন কেন? তাদের কথার মধ্যে, চলার মধ্যে দায়িত্বশীলতা থাকতে হবে। বলা হয়, সংসদ আর পল্টন ময়দানের বক্তৃতা এক নয়। এখন আর পল্টন ময়দান নেই। তবে পল্টনী বক্তৃতার স্টাইল রয়ে গেছে। কিন্তু দেশ চালানোর দায়িত্ব যাদের হাতে, তারা একেক জায়গায়, একেক কথা বলবেন কেন? তাদের তো মুখে আর মনে একই কথা থাকবে। কিন্তু তারা মুখে রাজা-উজির সব মেরে ফেলেন। কাজের সময় লবডঙ্কা। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের আর বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কথার লড়াই বেশ জমজমাট ইদানীং। মির্জা ফখরুল বলছেন, আওয়ামী লীগ সর্বভুক, দেশ খেয়ে ফেলেছে। আর ওবায়দুল কাদের বলছেন, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে দেশ গিলে খাবে। পাল্টাপাল্টি এ বক্তব্য শুনতে আমার কাছে অশ্লীল লেগেছে। এ কেমন কথা। দেশ তো ভালোবাসার বিষয়। দেশ কীভাবে গিলে খাওয়া যায়। দেশ কীভাবে খাওয়া যায়? ক্ষমতায় যেই থাকুক, দেশ তো চলে যাবে না। দেশ একটা ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ থাকুক, বিএনপি থাকুক; দেশ কেউ গিলে খেতে পারবে না। সুশাসনের ঘাটতি থাকলে উন্নয়নের গতি কম হবে। কিন্তু দেশ তো হারিয়ে যাবে না, গিলেও খাওয়া যাবে না। সাধারণ মানুষ দেশকে ভালোবাসে। রাজনীতিবিদরাও যদি একটু ভালোবাসতেন, তাহলে দেশ আরও এগিয়ে যেত।

তবে বর্তমানে দুপক্ষের ‘এই খেলা হবে’ টাইপ অস্থিরতার মাঝে একটি সুস্থ পরিবেশ তৈরিতে সরকারি দলের দায়ই বেশি। মাঠ দখলে রাখা মানে প্রতিপক্ষের সমাবেশে হামলা করা নয়। বিএনপির সমাবেশের কাউন্টার হিসেবে আওয়ামী লীগ তার চেয়ে বড় সমাবেশ করতে পারে, আরও বড় মিছিল করে নিজেদের শক্তি দেখাতে পারে। সরকারি দল হিসেবে আওয়ামী লীগের দায়িত্বও বেশি। নিজেদের স্বার্থেই তাদের রাজপথ স্থিতিশীল রাখতে হবে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে এমনিতে অর্থনীতি প্রবল চাপের মুখে আছে। সব জায়গায় শোনা যাচ্ছে গোটা বিশ্বে মন্দার সম্ভাবনার কথা। বাংলাদেশও সেই তালিকায় যে আছে, তা অন্যান্য সূত্রসহ প্রধানমন্ত্রীর কণ্ঠেও সেই শঙ্কা পরিষ্কার। সুতরাং নতুন করে রাজপথে অস্থিতিশীলতা নেওয়ার মতো সক্ষমতা এই মুহূর্তে বাংলাদেশের অর্থনীতির নেই। রাজনীতিবিদরা মাঠ দখলের যে খেলায় মেতেছেন, সেটা তাদের জন্য খেলা হতে পারে; কিন্তু সাধারণ মানুষের জন্য তা মৃত্যুসম। আমরা একটি অংশগ্রহণমূলক, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চাই। মানুষের প্রতিবাদ করার, রাজপথে বিক্ষোভ করার অধিকার চাই। কিন্তু কোনোভাবেই আর হানাহানি, সংঘাত, হরতাল, অবরোধের রাজনীতিতে ফিরে যেতে চাই না।

লেখক : বার্তাপ্রধান, এটিএন নিউজ

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.
kalbela.com