কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে

খাদ্য মজুত নজিরবিহীনভাবে কমেছে, বেড়েছে চালের দাম। কাজেই সংগ্রহ অভিযানে প্রাধান্য দিতে হবে প্রকৃত কৃষককে; মিলারদের নয়। এতে চালের দাম যেমন স্থিতিশীল থাকবে, তেমনি কৃষকও ফসলের দাম পাবেন
কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে

সরকার চলতি আমন মৌসুমে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে আট লাখ টন ধান ও চাল কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি সরকারি মজুত বৃদ্ধি করা যে এ ক্রয়নীতির লক্ষ্য, তা সহজেই অনুমেয়।

১ নভেম্বর সচিবালয়ে খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির সভা শেষে খাদ্যমন্ত্রী বলেছেন, এ বছর পাঁচ লাখ টন চাল ও তিন লাখ টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ হয়েছে। এ বছর আমন মৌসুমে ২৮ টাকা কেজি দরে ধান ও ৪২ টাকা কেজি দরে চাল কেনবে সরকার। ধান ও চালের দাম নির্ধারণে কৃষকের স্বার্থ সংরক্ষণে তিন-চার বছর ধরে মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে কোনো ধান কেনা হচ্ছে না। অ্যাপের মাধ্যমে কৃষকদের থেকে ধান ক্রয় করা হচ্ছে। কৃষকের তালিকা ধরে লটারির মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয় ধান-চাল। টাকাও সরাসরি তাদের ব্যাংক হিসাবে চলে যায়। এখানে মধ্যস্বত্বভোগীদের কোনো সুযোগ নেই।

চলতি বছরের আমন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ও উৎপাদন পরিস্থিতি সম্পর্কে কৃষিমন্ত্রী বলেছেন, একসময় আমন উৎপাদন বেশি হতো। এখন আমনের চেয়ে বোরো উৎপাদন অনেক বেশি হয়। বছরে দুই কোটি টন বা এর বেশি বোরো উৎপাদন হয়। আর আমন উৎপাদন হয় ১ কোটি ৫০ টনের মতো। এ বছর শ্রাবণ মাসে এক দিন বৃষ্টি হয়েছে। ফলে আমন উৎপাদন নিয়ে খুবই উৎকণ্ঠার মধ্যে ছিলেন সবাই, কারণ আমন হলো ফটোসেনথেটিক। দিন ছোট হয়ে এলে আমন ধানে ফুল এসে যায়। ফুল এলে উৎপাদন কমে যায়। ধান বড় হতে পারে না। কৃষকরা সেচ দিয়ে আমন উৎপাদন করে সে সমস্যার মোকাবিলা করেছেন। কৃষিমন্ত্রীর আশাবাদ, প্রকৃতি সহায়ক হলে বোরো উৎপাদন ভালো হবে। আবহাওয়ার পরিবর্তন এবং বিশ্বমন্দার কারণে ২০২৩ সালে দুনিয়াজুড়ে খাদ্যসংকটের আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ দুঃসময়ের মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী শুধু নিজেদের প্রয়োজন মেটানো নয়, খাদ্য রপ্তানির লক্ষ্য নিয়ে উৎপাদন বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন। তা বাস্তবায়নে সরকারকে সর্বক্ষেত্রে কৃষকবান্ধব নীতি গ্রহণ করতে হবে।

যেসব বিষয় সরকারকে অনেক বছর ধরে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন থেকে ধান-চাল সংগ্রহ এবং মূল্য নির্ধারণে প্রভাবিত করে আসছে সেগুলোর মধ্যে অন্যতম—ধান কাটা ও ঘরে তোলার মৌসুমে বাজারে ধানের দাম স্থিতিশীল রাখা; যাতে ধানচাষিরা, বিশেষ করে ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও ভূমিহীন চাষিরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হন এবং অধিক পরিমাণে ধান উৎপাদনে উৎসাহিত হন। এর কারণ, ফসল উৎপাদনের মূল চালিকাশক্তি এসব চাষি ধারদেনা করে ফসল ফলান। ধারদেনা পরিশোধ এবং সংসারের নানা অভাব-অনটন মেটাতে ধান কাটা-মাড়াই মৌসুমের শুরুতেই তাদের ধান বিক্রি করতে হয়। ধানকে চালে রূপান্তর করে কাটা-মাড়াই মৌসুম শেষে সময়-সুযোগ বুঝে উচ্চমূল্যে চাল বিক্রি করে লাভবান হওয়ার মতো আর্থিক সামর্থ্য তাদের নেই। সব দেশেই রাষ্ট্রীয়ভাবে খাদ্যশস্য সংগ্রহ কর্মসূচি রয়েছে। কিছু দেশে কার্যকর সরকারি খাদ্যশস্য সংগ্রহ প্রক্রিয়া বিদ্যমান। যেমন আমাদের পাশের দেশ ভারত। দেশটির কৃষকরা একটি মিনিমাম সাপোর্ট প্রাইসে (এমএসপি) সরকারের কাছে নিজেদের পণ্য, প্রধানত ধান ও গম বিক্রি করতে পারেন, যা পর্যায়ক্রমিকভাবে প্রতিবছর নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। এমএসপির আওতায় ভারতের কৃষক রাজ্য নির্ধারিত কেন্দ্রগুলোয় ধান, চাল, গম সরবরাহ করে থাকেন। ন্যায্য দাম পাওয়ার কারণে কৃষক আগ্রহের সঙ্গে সরকারের কাছে খাদ্যশস্য বিক্রি করেন। ফলে বরাবরই দেশটিতে মৌসুমভিত্তিক সংগ্রহ অভিযান সফল হয়। পদ্ধতিটি আমলে নিয়ে আমাদের মতো করে দেশে এ ব্যবস্থা প্রবর্তন করা যেতে পারে। এ ছাড়া বিশেষজ্ঞরা ভবিষ্যতে চালের দাম স্থিতিশীল রাখতে হলে সরকারকে অটো রাইস মিলে বিনিয়োগের কথা বলছেন, যা বিবেচনাযোগ্য।

তবে সরকারের কর্মসূচি বাস্তবায়নে প্রথমেই গুদামগুলোকে উন্নত করতে হবে। খাদ্যশস্য মজুদের জন্য সরকারের তরফ থেকে খাদ্যগুদামের সংকটের কথাও বলা হয়; যা স্বল্পমেয়াদি নয়, দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা। সরকারি গুদামে ছোট কৃষকদের ফসল সংরক্ষণ করার সুযোগ করে দিতে হবে যেন ফসলের সঙ্গে সঙ্গে কৃষককে অল্প দামে ফসল বিক্রি না করতে হয়। সরকারের ধান-চাল মজুত করার সক্ষমতা কম হওয়ায় কারণে বেশিরভাগ সময়ই সরকারের পক্ষে বাজার প্রভাবিত করার সুযোগ থাকে না। এ ছাড়া তুলনামূলক ছোট কৃষকের কাছ থেকে ধান সংগ্রহে জোর দিতে হবে। কারণ ছোট ও মাঝারি কৃষকের টিকে থাকার সক্ষমতা কম।

বিদ্যমান ধান-চাল সংগ্রহ প্রক্রিয়ায় মিলারদের প্রভাব অত্যধিক। নানা অজুহাতে তারা যখন চাল সরবরাহ করেন না, তখন শেষ মুহূর্তে সরকারের কিছুই করার থাকে না। ফলে লক্ষ্য অনুযায়ী মজুত বাড়ানো ব্যাহত হয়। মিলারদের ওপর সরকারের অতিনির্ভরতার এহেন কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করার সময় এসেছে। সমস্যা সমাধানে বিশেষজ্ঞরা ধান সংগ্রহের নির্ধারিত একটি নয়, দুটি মূল্যকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। একটি কৃষকের কাছ থেকে সরকারি গুদামে সংগ্রহের জন্য, অন্যটি কৃষকের কাছ থেকে বেসরকারি অটোরাইস মিলে ক্রয়ের জন্য। চালকলগুলোকে পরিবর্তিত সরকারি নীতিমালা মেনে কৃষকের কাছ থেকে নির্ধারিত মূল্যে ধান কিনতে হবে, অন্যথায় ওইসব মিলের উৎপাদিত চাল সরকারি গুদামে কোনো অবস্থাতেই ক্রয় করা যাবে না। চুক্তি না মানলে কালো তালিকাভুক্ত করাসহ আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে তাদের বিরুদ্ধে। প্রয়োজনে ট্রেড লাইসেন্স বাতিলের মতোও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা বিদ্যমান। চলমান ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ সংকটকে বাড়িয়ে তুলেছে। নিত্যপণ্য মূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে আমাদের জনজীবনে হিমশিম অবস্থা। জলবায়ু পরিবর্তনসহ আগামীতে প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কা বাড়তি উদ্বিগ্নতা নিয়ে হাজির হয়েছে। সুতরাং ধান-চালের মজুত না বাড়ালে আপৎকালীন পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হতে পারে। এমনটি হলে খাদ্যসংকটের শঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সংগ্রহ অভিযান ব্যর্থতায় সরকারি মজুতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। খাদ্য মজুত নজিরবিহীনভাবে কমেছে, বেড়েছে চালের দাম। কাজেই সংগ্রহ অভিযানে প্রাধান্য দিতে হবে প্রকৃত কৃষককে; মিলারদের নয়। এতে চালের দাম যেমন স্থিতিশীল থাকবে, তেমনি কৃষকও ফসলের দাম পাবেন। কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত ও রাষ্ট্রীয় সংগ্রহ পরিকল্পনা সফল করতে জোর পদক্ষেপ নিতে হবে কৃষি ও খাদ্য মন্ত্রণালয়কে।

লেখক : সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের উপদেষ্টা ও

সাবেক চেয়ারম্যান, রাজউক

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.
kalbela.com