দোহায় ফুটবল: ঢাকায় লুডু-ডুডুর ধুম

দাপটের শিখরে আজীবন থাকার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করতেও উঠে পড়ে লাগে। হাল চিত্র আরও ভিন্ন। বৈশ্বিক পরাশক্তির দ্বন্দ্ব ও স্থানিক সাপ-লুডু-হাডুডু, দাবায় দেশে দেশে স‍রকার পরিবর্তনের ঢেউ বইছে
দোহায় ফুটবল: ঢাকায় লুডু-ডুডুর ধুম

কথা কেউ মাটিতে পড়তে দেন না। এখানে এখন বোবার মুখে কেবল কথা নয়, বোবা তর্ক করতেও জানে। তা বাদ যাচ্ছে না ‘বিশ্বকাপ খেলা টেলিভিশনে দেখি আর ভাবি, কবে আমাদের ছেলেমেয়েরা এই বিশ্ব আসরে খেলবে’—বিশ্বকাপ নিয়ে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর এ বাক্যটি নিয়েও। তার বক্তব্যের মধ্যে আফসোস-আক্ষেপ আছে। আকাঙ্ক্ষাও আছে। এ দুটোর যোগফলই বাংলাদেশের জন্য আশা জাগানিয়া। কিন্তু সেদিকে না গিয়ে আমরা ভিন্ন দিকে চলে যেতে অভ্যস্ত। পারলে তার এ কথার ভুল ধরি। সমালোচনাও ছাড়ি না। ট্রলও করি। বাস্তবটা বড় নিষ্ঠুর। কেন তার এ আশা বা স্বপ্ন বাস্তব হচ্ছে না, সেই জবাবও যেন তাকেই দিতে হবে।

আমাদের একজন সালাউদ্দিন ছিলেন, আছেনও। তিনি অদ্বিতীয়। তার বিকল্প নেই। তাকে ছাড়া চলেই না। তিনি ২০১২-তে বলেছিলেন, ২০২২-এ বাংলাদেশ বিশ্বকাপের আসরে খেলবে। কাতারে খেলছে তো বাংলাদেশ? সালাউদ্দিন সাহেবকে ঠিকঠাক মতো ধরে তা জিজ্ঞাসা করছেন কেউ? কিন্তু প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রীদের সমালোচনা-গোষ্ঠী উদ্ধারে কমতি নেই। এ কর্মে কেউ কারও চেয়ে পিছিয়েও নেই।

পুরো ফুটবল বিশ্বকাপ চলছে কাতারের রাজধানী দোহাকে ঘিরে। ১৯৩০ সালের প্রথম আসরের পর কাতার বিশ্বকাপকে সবচেয়ে ‘আঁটসাঁট’ বলছে ফিফা। স্বাগতিক কাতারসহ ৩২টি দলের একটি করে ‘টিম বেস ক্যাম্প’ আছে, সঙ্গে ‘টিম বেস ক্যাম্প হোটেল’। ৩২টি দলের শুধু থাকার জায়গা নয়, অনুশীলনেরও আলাদা আলাদা জায়গা নির্দিষ্ট করা। ৩২টি দলের মধ্যে ২৪টিই ১০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে। এই দ্য গ্রেটেস্ট শো অন দ্য আর্থকে ঘিরে শুধু কাতার নয়, পুরো বিশ্ব ভাসছে উৎসবের আনন্দে। জাঁকজমক বিলাসিতার অভাব নেই কাতার বিশ্বকাপে। চোখ-ধাঁধানো স্টেডিয়াম, বিলাসবহুল হোটেল, জাঁকজমক পুরো বিশ্বকে এরই মধ্যে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। এ উৎসবের আড়ালে যে বেদনা, যে কান্না, যে মৃত্যু তা কি আমরা মনে রেখেছি?

তামাশার মতো হজমও করি। গল্প নয়, কারও কাছে শোনাও নয়। তা দিব্যি দেখছে মানুষ। যে যা পারছেন করে ফেলছেন। মুখ দিয়ে যা আসে বলে দিচ্ছেন। কিচ্ছু হয় না। কয়েক দিন একটু সমালোচনা, চর্চা বা গসিপ মাত্র। চলতে থাকবে এভাবেই? এর শেষ থাকতে নেই? কিন্তু কড়া অভিযোগ, কথা বলতে দেওয়া হয় না। কথা বলতে না দিলে চারদিকে এত কথা হচ্ছে কীভাবে? প্রায় নিয়মিত গোলটেবিল-লম্বাটেবিল আলোচনা। আসলে আলোচনার নামে সরকারের যাচ্ছেতাই গিবত। শাসনব্যবস্থা, নির্বাচন, ভোট, সরকারের লেজিটেমিসি নিয়ে হেন কোনো কথা তারা না বলছেন? এর বিপরীতে কেবল ক্ষমতাসীন দল নয়, পুলিশ, মিলিটারি, বিচারালয়, প্রশাসনসহ বিভিন্ন সুধীজন সরকারের হেন বন্দনা নেই যা না করছেন। এটি করতে গিয়ে যা-তা কথা। মুখের স্বাধীনতা আছে বলেই তো সম্ভব হচ্ছে এত মুখ চালানো। উপরোক্তরাসহ আরও অনেকের মুখের জোর কেবল বাড়ছেই। সঙ্গে একটু চাতুরী থাকলে তো আর কথাই নেই। মুখের জোরে সত্যকে মিথ্যা বানিয়ে দেওয়া যাচ্ছে নিমিষে। মানুষও কি লুফে নিচ্ছে না? মেধা-শিক্ষা, নীতি-নৈতিকতা, সততার কোনো প্রশ্ন আসছে সেখানে?

মুখজোরওয়ালা নেতারা কিছু না বললে গণমাধ্যমকর্মীরা নিউজ ক্রাইসিসে ভোগেন। ওবায়দুল কাদের, মির্জা ফখরুল, হাছান মাহমুদ বা রিজভীর কেউ একজন দুয়েক দিন ফিল্ডে না থাকলে নিউজের কী ছিদ্দত পড়ে যায়। নিয়মিত কথাশিল্প-মুখপাণ্ডিত্য চালাতে হয়েছে তাদের। আমাদের কুমিল্লাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে মুখজোরকে থোঁতাবাজি, চোপাবাজি, গলাবাজি ইত্যাদি নামে ডাকা হয়। থোঁতার জোরের এ সংস্কৃতি রাজনীতির মাঠ গড়িয়ে এখন অন্যদেরও পেয়ে বসেছে। মিথ্যা বলেন না কেউ। ফুটপাতের ফেরিওয়ালা-দোকানদার থেকে শুরু করে শিক্ষক, সাংবাদিক, মসজিদের ইমাম-খতিব পর্যন্ত। সত্যাচারের সঙ্গে যে যা পারছেন করে ছাড়ছেন না? কারণ সত্য-মিথ্যা, সুখ-দুঃখ, ভালো-মন্দ সবই এখন আপেক্ষিকতায় ঠাসা। মুখের সঙ্গে তাদের শরীরী ভাষাও সেই বার্তাই দিচ্ছে। তারা সমাদৃত। বিশেষ আদর-সমাদর, আদাব-সালাম, তোয়াজ-কুর্নিশ, যত্ন-আত্তি কি বাড়ছে না সমাজে? এতে বোধ-বুদ্ধি ভোঁতা করে রাখা ছাড়া উপায় কী?

পরস্পরকে মিথ্যুক প্রমাণের পাশাপাশি কেউ কাউকে সামান্যতম বিশ্বাসের কোনো বালাই নেই তাদের মধ্যে। নিম্নমানের ভাষায় কে কাকে কত খাটো করবেন সেই চেষ্টাও বিস্তর। একজন কিছু একটা বললে আরেকজন প্রথম দায়িত্ব হয়ে পড়ে ‘মানি না, মানি না’ আওয়াজ প্রতিষ্ঠা করা। তাহলে ‘কোনটা মানেন বা মানবেন—সেটাও কেউ জিজ্ঞাসা করেন না তাদের। মোটকথা কেউ কাউকে একরত্তি আমল না দেওয়ার সিদ্ধান্ত পাকা করে ফেলেছেন তারা। বিএনপির সমাবেশে বিশাল গণজমায়েত আওয়ামী লীগের কাছে আমল পাচ্ছে না। তাদের কাছে বিএনপির সমাবেশের মানুষ জব্বারের বলীখেলার চেয়েও কম। আর বিএনপির কাছে আওয়ামী লীগের সমাবেশের মানুষগুলো নিতান্তই ভাড়ায় আনা। একদলের কর্মসূচিকে আরেক দল নাটক বলতে বলতে এখন ঘটনাকেও নাটক বলতে মুখে বাধে না। আদালত চত্বর থেকে জঙ্গি ছিনিয়ে নেওয়াকেও নাটক বলতে মুখে আটকাচ্ছে না।

এ নোংরা মন-মনন চর্চায় ‘মানি না, মানি না’ প্রশ্নে কী মানি না, এর জবাব হয়ে পড়ছে ‘জানি না জানি না’। আবার সব জান্তার ভাবও আছে। এ কদাকার খেলায় সবকিছুর জন্য সরকারকে দায়ী করে শর্টকাটে খেলা শেষ করার একটা আচানক খেলা চলছে। এর খেলারাম এখন সবখানে। ফুটপাত-অলিগলি থেকে ব্যাংক, বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সবখানে। এর সংক্রমণে সব শ্রেণি-পেশার মানুষই আক্রান্ত। যোগফলে মূল্যবোধের চরমতম অবক্ষয়। সততা ও ভালো কাজের প্রতিযোগিতা বন্ধ। মেধা-যোগ্যতার চেয়ে ফ্যাক্টর অন্য কিছু।

গত কিছুদিনের আলামত বলছে, ক্রিকেটের মতো লম্বা সময়ের খেলায় আর অভ্যস্ত নন রাজনীতিকরাও। বড়জোর ওয়ানডে ম্যাচে ফল ঘরে তোলার একটা তাড়না স্পষ্ট। তার ওপর বাংলাদেশের ক্রিকেটের সেনাপতি সাকিব আল হাসানও অনেক দিন ধরে খণ্ডকালীন খেলোয়াড়, ফুল টাইম ব্যবসায়ী। মাঝেমধ্যে ইচ্ছে হলে খেলেন। বাদবাকি সময় পুরোটা ব্যবসা আর রাজনীতিতে। তার দেখানো পথে তরুণ ক্রিকেট প্রজন্মকে নির্মমতার পাঠ-পঠনই দিয়েছে। ফুটবল, ক্রিকেট মাড়িয়ে রাজনীতিতে রাগবি, রেসলিং, কাবাডি, লুডু, কানামাছি অনেক খেলার ধুম।

খেলার রকমফেরও এখন নানাদিকে। হা-ডু-ডুতে কেবল ঘিরে ধরে টেনে নামানো হচ্ছে না। না ধরে ফ্রি রেখে শক্তি ক্ষয় করে কাহিল অবস্থায় নিয়ে এক চাপে ঘাড় মটকে দেওয়ার কৌশল আছে। সাপ-লুডুতে দম মেরে থেকে পিক আওয়ারে সাপের নীল বিষে শুইয়ে দেওয়ার বিষয় থাকে। আর দাবা রাজনী‌তির মতোই অত্যন্ত জটিল এক খেলা। স‌ঠিক সম‌য়ে স‌ঠিক চাল‌টি না দি‌তে পার‌লে সব থাকার পরও সামান্য এক সৈন্য ‌কিংবা এক ঘোড়ার কা‌ছেও রাজা‌কে হে‌রে যে‌তে হয় শোচনীয়ভা‌বে। ক্যারমের তো এক ঘুঁটিতে পাঁচ-সাত ঘুঁটিকে টোটোকিতে শেষমেশ গর্তে ঢুকিয়ে দেওয়ার কৌশল। বাকি ঘুঁটিবাজদের কখনো কখনো তা ধারণায় আসে না। ঘোরে পড়ে যাওয়ায় সেই ধারণা করার শক্তিও থাকে না তাদের।

ক্রিকেট-ফুটবল-হ্যান্ডবল বা হাডুডুর বাইরেও কিছু খেলা আছে। এতে মাঠ লাগে না। ফিজিক্যাল ফিটনেসও দরকার পড়ে না। কখনো কখনো মানসিক বিকৃতমনারাও ঘরে বসে সাপ-লুডু, দাবা টাইপের খেলায় বেশি ভালো করেন। এ সাপ-লুডু, দাবা খেলা ‘কারও পৌষ মাস, কারও সর্বনাশ’ ডাকছে। এ খেলা বড়ই ভয়ংকর। খেলোয়াড়রা আরও ভয়ংকর। তারা অঙ্কের সাপ-লুডুতে নীল তিমি ডাকেন। সব ঠিক হয় বলে লড়কে ল্যাঙ্গেতে সর্বনাশ ডাকেন সবার জন্য।

রাজনীতিতে সাপ-লুডু, কাবাডি, ক্যারম, দাবা ধরনের খেলা বরাবরই চলে। এসব খেলায় ওপরে উঠতে থাকা পক্ষ নিজেদের শক্তি-মহাশক্তি ভাবতে থাকে। দাপটের শিখরে আজীবন থাকার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করতেও উঠে পড়ে লাগে। হাল চিত্র আরও ভিন্ন। বৈশ্বিক পরাশক্তির দ্বন্দ্ব ও স্থানিক সাপ-লুডু-হাডুডু, দাবায় দেশে দেশে স‍রকার পরিবর্তনের ঢেউ বইছে। আফগানিস্তান, হাইতি, কিউবার মতো দেশগুলোতে অস্থিরতা চলছে। এর তাপ-চাপ ছড়ছে আশপাশে। ছোট ছোট বিভিন্ন দেশে পছন্দের স‍রকার বসানোর খেলায় নেমে পড়ছে পরাশক্তিভুক্ত দেশগুলো। আলামত বলছে, খেলাটিকে তারা ভিডিও গেমসের দশায় এনে ঠেকাচ্ছে। খেলার এ চাল কোথাও লাল সাপের পায়ে পড়ছে। কোথাও পড়ছে কালো সাপের ফাঁদে। কালো সাপের মুখে পড়লে নিচে নামতে হবে আর লাল সাপ তাকে উন্নত জায়গায় উঠিয়ে দেবে। অভ্যন্তরীণ রাজনীতির খেলারামরা না দমলে বা তাদের দমানো না গেলে শঙ্কামুক্ত থাকছে না বাংলাদেশও।

এর আড়ালে যে কত খেলা হয়ে যাচ্ছে তার ইয়ত্তা নেই। এমনকি কাতারেও যে কেবল ফুটবল খেলা হচ্ছে মোটেই তা নয়। বলের সঙ্গে সেখানে তেলের খেলাও তুঙ্গে। বিশ্ব দুর্যোগের এ সময়ে কাতারের সঙ্গে ২৭ বছরের জন্য তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস কেনার চুক্তি করে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে আরও এগিয়ে গেল চীন। এদিকে রাশিয়ার জ্বালানিতে পশ্চিমারা নিষেধাজ্ঞা দিলেও চীন তার থোড়াই কেয়ার করছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের খবর বলছে, চলতি বছর চীনে রাশিয়ার জ্বালানি রপ্তানি ৬৪ শতাংশ বেড়েছে।

এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন রাশিয়ার উপপ্রধানমন্ত্রী আলেক্সান্ডার নোভাক। এতে মস্কোরও রপ্তানি বেড়েছে, আবার চীনেরও লাভ, কারণ তারা রাশিয়ার কাছ থেকে বাজারমূল্যের চেয়ে কম মূল্যে জ্বালানি পাচ্ছে। এর পাশাপাশি ইকোনমিক টাইমসের সংবাদ হচ্ছে, রাশিয়া থেকে আমদানি করা জ্বালানি তেল পরিশোধন করে বাংলাদেশে রপ্তানির চিন্তা করছে ভারত। মহাজনী শক্তির আয়োজিত-প্রযোজিত এসব খেলাধুলায় জয়-পরাজয় সাজ-সজ্জা, প্রচার, আবেগ-হুজুগ, ভেতরে ভেতরে গড়াচ্ছে অনেক দূর। গড়ের অঙ্কে এর সব যেন হরিবল না হয়, সেদিকে নজর দেওয়া আমাদের জন্য সময়ের দাবি। ডিসেম্বরে ফাইনাল খেলায় মত্ত হওয়ার চেয়ে আন্তর্জাতিক এ খেলায় আমাদের অবস্থান কোথায় গড়াবে ভাবা জরুরি।

সময়টা এমনিতেই খারাপ। বৈশ্বিক মহামারি করোনার পর রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ। বিশ্বমন্দার তাপ বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও। বিশ্ববাজারে নজিরবিহীন হারে বেড়ে গেছে জ্বালানি, খাদ্য ও নিত্যপণ্যের দাম। রিজার্ভ কমেছে। এসব কারণে ভবিষ্যৎ অর্থনীতি নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে দেশে গুজবের ধুম। একটার মধ্যেই আরেকটাকে আছড়ে ফেলা হয়। এ অপখেলার মধ্য দিয়ে রাজনীতি সাপ-লুডু-হাডুডু, ক্যারম, দাবায় আরও খেলাময় হয়ে উঠছে।

লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট

বার্তা সম্পাদক, বাংলাভিশন

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.
kalbela.com