যেভাবে পুতিনের ইউক্রেন আগ্রাসন বন্ধ হবে

যেভাবে পুতিনের ইউক্রেন আগ্রাসন বন্ধ হবে
প্রতীকী ছবি

অন্য পশ্চিমা নেতাদের মতো রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সাধারণ ভোটারদের কাছে বা কোনো গণমাধ্যমে কোনো ব্যাপারে জবাবদিহি করতে বাধ্য নন। তার মানে রাজনীতির মাঠে তিনি অন্যদের চেয়ে অনেক ব্যতিক্রম।

প্রায় এক বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন কিছুটা মান হারিয়েছে। গত সপ্তাহের শেষে একটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ডিনিপ্রোতে একটি আবাসিক ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহতের সংখ্যা ৪৫। এ ঘটনার পর থেকে এখন ইউক্রেনকে পশ্চিমা ট্যাঙ্ক সরবরাহ করার কথা বলছে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, এমনকি সদা-সতর্ক জার্মানি। যুক্তরাষ্ট্র এবং শীর্ষ ইইউ প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা রাশিয়ার সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডগুলোকে যুদ্ধক্ষেত্রে চূড়ান্ত সাফল্য পেতে ইউক্রেনকে সাহায্য করার একটি উপায় হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন। ফলে রাশিয়া ইউক্রেনের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় আসতে বাধ্য হবে বলে মনে করছেন তারা।

গত বছর ফেব্রুয়ারির শেষ ভাগ থেকে, যখন ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলা শুরু হয়, তখন থেকেই ইউক্রেন পশ্চিমা মিত্রদের কাছে আক্রমণাত্মক অস্ত্র সরবরাহের জন্য মরিয়া হয়ে বারবার অনুরোধ করে আসছিল। কিন্তু এখন ইউক্রেনে ট্যাঙ্ক বা সমরাস্ত্র পাঠানোর জন্য ইউক্রেনের পশ্চিমা মিত্রদের কোন ব্যাপারটি অনুপ্রাণিত করেছে? এর উত্তর খুঁজতে হলে ফিরে যেতে হবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের টাইমলাইনে। প্রতিরোধ বোদ্ধাদের মধ্যে ‘ভবিষ্যতের ছায়া’ নামে একটি ধারণা প্রচলিত রয়েছে। যেহেতু পুতিন ঘোষিত ‘তিন দিনের যুদ্ধ’ প্রকারান্তরে সপ্তাহ এবং মাসব্যাপী প্রসারিত হয়েছে, প্রতিটি পক্ষকেই এ যুদ্ধের জন্য তৈরি করতে হয়েছে একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।

পোকার খেলায় যেভাবে অল্প অল্প করে বাজির পরিমাণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়, ছোট ছোট অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক ডিভাইস থেকে আর্টিলারি বা প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থেকে ট্যাঙ্ক পর্যন্ত সামরিক সহায়তা বৃদ্ধি করা তেমনই একটি সামরিক কৌশল। যখন ইউক্রেন একের পর এক রাশিয়ার ‘লাল দাগ’ অতিক্রম করা শুরু করল, তখন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্ররা ইউক্রেনকে রাশিয়ার আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানে ইচ্ছুক—এ বার্তা পাঠায়। ব্যাপারটি এরকম যে, যদি রাশিয়া মনে করে শেষ পর্যন্ত দেশটি তার সামরিক লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে না, তাহলে সর্বোত্তম উপায় হচ্ছে এখনই ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা কমিয়ে আনা। কারণ যে যুদ্ধে জেতা যাবে না, তা চালিয়ে যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

তাহলে রাশিয়া কেন এ যুদ্ধ থেকে পিছিয়ে আসছে না? এর কারণ হচ্ছে পুতিন তার পশ্চিমা প্রতিপক্ষদের চেয়ে কিছুটা ব্যতিক্রমভাবে ভিন্ন ধরনের দেশীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা মেনে কাজ করেন। সাধারণত গণতন্ত্রে, যারা ভোটের মাধ্যমে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসেন বা টিকে থাকেন, পুতিনের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি ভিন্ন। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের ক্ষমতা নির্ভর করে মুষ্টিমেয় কিছু বিশ্বস্ত অভিজাতের সমর্থনের ওপর। আর সেসব অভিজাতের বেশিরভাগই সরকারি ক্ষমতা, সরকারের উচ্চস্তরের অবস্থান বা পদের জন্য পুতিনের ওপর নির্ভর করেন। আবার এ অভিজাত শ্রেণির অনেকেই নিজেদের প্রভাব বলয় বাড়িয়ে নেওয়ার জন্য একে অন্যের সঙ্গে কাদা ছোড়াছুড়ি করতেও দ্বিধা করেন না। মূলত তারা তাদের সম্পদ অর্জন ও সুরক্ষার জন্য পুতিনের অনুগ্রহের ওপর নির্ভরশীল। তাই পুতিনের নীতিগত কোনো সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপের বিরোধিতা করার মতো কোনো শক্তি, অবস্থান বা সাহস তাদের নেই। এসব অভিজাতের ভাগ্য সরাসরি পুতিনের উত্থান বা পতনের সঙ্গে যুক্ত। এ প্রাতিষ্ঠানিক প্রেক্ষাপট রাশিয়ান নেতা পুতিনকে এনে দিয়েছে গুরুত্বপূর্ণ দুটি সুবিধা। প্রথমটি সাময়িক। নিয়মিত নির্বাচনী প্রতিযোগিতা না থাকার কারণে পুতিন দীর্ঘ একটা সময় ধরে রাশিয়ার মসনদে আসীন থাকতে পারবেন। এ ছাড়া পশ্চিমা দেশগুলোতে কম সুবিধাজনক ইউক্রেনপন্থি অভিজাতদের প্রতিস্থাপিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি অপেক্ষা করতে পারেন।

পোকারের টেবিলে পশ্চিমা নেতারা দক্ষতার জন্য একে অন্যকে অভিনন্দন জানালেও, পুতিন এবং তার অভিজাতদের পোকার খেলার টেবিল আলাদা। রাশিয়ার মতে, ইউক্রেনের পশ্চিমা মিত্র এবং বর্তমান প্রতিপক্ষরা রাশিয়ার সামরিক লক্ষ্য অর্জনের পথে ক্ষণস্থায়ী বাধা মাত্র। আজ থেকে আগামী দুই বছর পর ইউক্রেনের সমর্থনে পশ্চিমা ঐক্য নিশ্চিত করার জন্য বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন না-ও থাকতে পারেন। আর এমন ছোটখাটো অনেক বিষয়ে রাশিয়া বড় ধরনের সুবিধা নিতে পারে।

পুতিনের দ্বিতীয় সুবিধাটি অনেকটা নীতিগতভাবে উদয় হয়। যেহেতু যুদ্ধ বা অন্য কোনো ব্যাপারে জনসাধারণের কাছে জবাবদিহিতার কোনো প্রশ্ন নেই, যদিও রাশিয়ার জনগণই যুদ্ধের সব আর্থিক খরচ বহন করছে, পুতিনের নীতির পরিসর তার নিজস্ব বৃত্তে স্বার্থ দিয়ে নির্ধারিত এবং যারা প্রধানত সামরিক কর্মকর্তা বা গোয়েন্দাদের মধ্যে অভিজাত শ্রেণির এবং সম্পূর্ণভাবে যুদ্ধের সঙ্গে জড়িত, তারা চায় সোভিয়েত অঞ্চলগুলোকে আবার একত্রিত করতে। এতে যদি সাময়িক অস্থায়ী কিছু খরচ বা অসুবিধাও হয়, সেসব তারা অগ্রাহ্য করবেন। আবার এসব অভিজাতের মধ্যে অনেকেই চায় যেন ঝামেলা আরও বাধুক এবং রাশিয়ার সমাজ যেন সম্পূর্ণ সামরিক খাতের দিকে ধাবিত হয়। তবে রাশিয়ার বর্তমান রক্ষণশীল অভিজাতদের মধ্যে ক্ষমতার বর্তমান কেন্দ্রীকরণ ক্রেমলিনের সাম্রাজ্যবাদী পররাষ্ট্রনীতির দিকেই নির্দেশ করে। এ বিস্তৃতির সীমানা প্রেসিডেন্ট পুতিনেরও নেতৃত্বের বাইরে।

অন্যদিকে, রাশিয়ার পশ্চিমা প্রতিপক্ষরা এমনভাবে কাজ করছে, যেন তারা রাশিয়ার পরের সুবিধাটি সম্পর্কে কিছুই জানে না এবং ভুলক্রমে রাশিয়াকে তার নিজের নির্ধারিত অবস্থান দিয়েই বিচার করছে। পশ্চিমা নেতাদের মনে সামরিক খরচের জন্য একটি নির্ধারিত থ্রেশহোল্ড রয়েছে, যার মাধ্যমে তারা ভাবছেন ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ বা সম্পদ খরচের হিসাব দেখলে রাশিয়া তার সিদ্ধান্ত বদলাতে বাধ্য হবে। তাই এ যুদ্ধে ইউক্রেনের যদি আরও কিছু অগ্রগতি হয়, রাশিয়া হয়তো এ যুদ্ধের ব্যাপারে আপস করতে রাজি হবে। তবে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এবং তার ইউরোপীয় মিত্ররা একটা ব্যাপার ভুলে গেছেন—কর্তৃত্ববাদী নেতারা গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার নেতাদের মতো জনরোষ বা চাপের মুখোমুখি হন না। বডি ব্যাগে সৈন্যদের মৃতদেহ বাড়ি ফিরিয়ে আনার চিত্রগুলো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রপ্রধানদের জন্য হয়তোবা আতঙ্কের। কিন্তু ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য যারা জনসমর্থনের ওপর নির্ভর করে না এমন নেতাদের জন্য এ ধরনের চিত্র একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে হতাহতের সংখ্যা রাশিয়ান সম্রাটের হৃদয়কে নরম করবে বলে মনে হয় না।

অবশেষে ইউক্রেনের জন্য ব্যাপারটা কী দাঁড়ায়? এর মানে হচ্ছে রাশিয়া থামবে না। এ যুদ্ধ থেকে পিছিয়ে আসবে না। একটি রাশিয়ান প্রবাদ আছে যে, একটি ব্যাচের প্রথম ক্রেপ (এক ধরনের কাগজ যা প্যানকেক বানাতে বা সাজাতে ব্যবহার করা হয়) সাধারণত প্যান থেকে বের করা হয় না। অন্যভাবে বলতে গেলে কোনো কাজে সফল হতে হলে সাধারণত ট্রায়াল অ্যান্ড এরর (পরীক্ষা এবং সেখান থেকে প্রাপ্ত ভুল থেকে শিক্ষা) দরকার হয়। রাশিয়ার সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য বলে বিবেচিত হচ্ছে। সোভিয়েত-ফিনিশ যুদ্ধ থেকে চেচনিয়া পর্যন্ত, রাশিয়ার অভিযান প্রথম পর্যায়ে ব্যর্থ হয়েছিল। কিন্তু দ্বিতীয়বারের অভিযানগুলো সফলতার মুখ দেখেছিল।

ইউক্রেন যদি তার মাটি থেকে শেষ রাশিয়ান সৈন্যটিকেও তাড়া করে, তাহলেও ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন শেষ হবে না। রাশিয়া বারবার ইউক্রেনের ভূখণ্ডে দাবি নিয়ে হাজির হবে এবং এ দাবি মানানোর জন্য হুমকি, বিরতিহীন ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং সীমান্ত সংঘর্ষে চলতেই থাকবে। প্রতিরোধকারীর জন্য সর্বশেষ বিজয় বলে কিছু নেই। একটি নিষ্পত্তিমূলক বিজয় মানে যে আক্রমণ করছে, তাকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে ফেলতে হবে যেন সে আবার কখনো আক্রমণ করার জন্য ফিরে আসতে না পারে। রাশিয়ার যুদ্ধংদেহী মনোভাব ধ্বংস করে দেওয়া বা রাশিয়ার কোনো একটি ভূখণ্ডের দখল নেওয়া ইউক্রেনের জন্য কোনো সঠিক বিকল্প নয়। তাই আন্তর্জাতিক বা অভ্যন্তরীণ চাপের মুখে নত না হওয়া কোনো প্রতিপক্ষের সঙ্গে যুদ্ধে টিকে থাকতে হলে ইউক্রেনের প্রয়োজন একটি অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্রবিরোধী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এর সঙ্গে দরকার বিশ্বমানের একটি সার্বক্ষণিক সামরিক বাহিনী।

ইউক্রেনের কাছে এ ব্যাপারটি পরিষ্কার যে, পশ্চিমা মিত্ররা এখনো আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধের নিষ্পত্তি করার আশায় আছে। এখন ইউক্রেনের দরকার সামনে দীর্ঘ একটা পথ চলার জন্য সর্বাত্মক প্রস্তুতি নেওয়া। এ ছাড়া সম্ভাব্য অন্যান্য মিত্রের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে ইউক্রেনের নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্পকে আরও বিকশিত করা একটি অত্যাবশ্যকীয় কাজ। দীর্ঘস্থায়ী শান্তি অর্জন করতে হলে ইউক্রেনের উচিত সামরিক দিক থেকে যতটুকু পারা যায় এগিয়ে থাকা এবং সমরাস্ত্র মজুত করে রাখা।

লেখক : টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। নিবন্ধটি দ্য গার্ডিয়ান থেকে অনুবাদ করেছেন রতন খান

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.
logo
kalbela.com