যে কারণে শিক্ষায় আমরা পিছিয়ে রয়েছি

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উচ্চপদ লাভে গবেষণা ও প্রকাশনা এখন আর অত্যাবশ্যকীয় শর্ত নয়। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রকাশনার উদ্যোগ অত্যন্ত সীমিত। অর্থোপার্জনের দাপটটা এতই প্রবল যে, গবেষণায় মনোযোগ রাখা কঠিন হয়ে পড়ে
যে কারণে শিক্ষায় আমরা পিছিয়ে রয়েছি

সমাজে শ্রেণিবিভাজন জিনিসটা মর্মান্তিক সত্য। আমাদের বিভক্ত সমাজে মতাদর্শিক ব্যাপারে মধ্যবিত্তই কর্তৃত্ব করে এসেছে। শিক্ষাও মধ্যবিত্ত শ্রেণির আগ্রহ ও উৎকণ্ঠ দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত। এ মধ্যবিত্ত শিক্ষিত এবং তার শ্রেণিগত গোড়াপত্তনটা ঘটে বৃটিশ আমলে, তারপর থেকে এই শ্রেণিটি নিজের উন্নতি অব্যাহত রেখেছে; রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্ব তার করতলেই ন্যস্ত রয়ে গেছে। মধ্যবিত্তের আকাঙ্ক্ষা ওপরে ওঠার, আতঙ্ক নিচে পড়ে যাবার। গোড়াপত্তনের প্রথম দিকে মধ্যবিত্তের ভরসা ছিল চাকরি। চাকরির জন্য শিক্ষা চাই, পরীক্ষা পাসের সনদ চাই। সে জন্য শিক্ষায় যতটা না, তার চেয়ে অনেক অধিক মনোযোগ ছিল পরীক্ষায়। শিক্ষার্থীরা পরিণত হয়েছিল পরীক্ষার্থীতে। এখনো সেই ব্যবস্থাই বহাল রয়েছে। শিক্ষার জন্য নয়, পরীক্ষার জন্যই পড়ালেখা; আর পরীক্ষায় ভালো করার জন্য চাই নোটবই, গাইডবই এবং কোচিং সেন্টার। ক্লাসরুমের তুলনায় কোচিং সেন্টারের আকর্ষণ এখন বেশি। এবং পরীক্ষা পাসের জন্য সহযোগিতার যত আয়োজন, সেগুলোর প্রত্যেকটির পেছনেই রয়েছে বাণিজ্য। শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ ব্যাপক হারে ঘটেছে।

এটা প্রতিষ্ঠিত সত্য যে, মধ্যবিত্ত শ্রেণির শিরদাঁড়া আর যাই হোক, শক্ত নয়। মধ্যবিত্তকে ভয়ের ভেতর থাকতে হয়। ভয় মূলত পিছলে পড়ার। এককালে বাল্যশিক্ষার বইতে বর্ণমালা শেখানোর জন্য লেখা হতো, “‘অ’তে অজগর আসছে তেড়ে”। অর্থাৎ একেবারে শুরুতেই শিশুকে ভয় দেখানো। মধ্যবিত্তের নিজের শ্রেণিগত ভয়টাকে সংক্রমিত করা হতো শিশু শিক্ষার্থীদের ভেতরে। ‘আ’তে দেওয়া হতো অন্য পরামর্শ: ‘আমটি আমি খাবো পেড়ে।’ গাছটি কার সে-বিবেচনা অনাবশ্যক। গাছে আমটি পেকেছে, আমি সেটা দখলে নেব। এবং কেবল আমি নিজেই সেটা খাব, অন্য কাউকে ভাগ দেব না। আমি ‘আমরা’তে পরিণত হব না। এ শিক্ষাটিই হলো পুঁজিবাদী উন্নয়নের মূলমন্ত্র। দেশের শিশুদের মনের ভেতর শৈশবেই লোভী ও স্বার্থপর হওয়ার মন্ত্রটি গেঁথে দেওয়ার আয়োজন ছিল, এমনকি শিশুশিক্ষার ওই বইয়ের মাধ্যমেও। ‘ই’তে লেখা থাকত, ‘ইঁদুরছানা ভয়েই মরে, ঈগল পাখি পাছে ধরে।’ এটাও ভয় পাওয়ারই শিক্ষা, সাহসী হওয়ার নয়। শিশুশিক্ষার বইগুলো এখন নিশ্চয়ই আগের মতো নেই, অবশ্যই উন্নত হয়েছে; কিন্তু ওই যে ভয় এবং লোভ, ওই দুই মন্ত্রকে শিক্ষাদানের ভেতর দিয়ে চালু রাখার ব্যাপারটা এখনো রয়েছে; ভিন্নভাবে এবং উন্নত আকারে।

শিক্ষা ক্ষেত্রে মধ্যবিত্ত শ্রেণি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার দিকে অতটা মনোযোগ দেয়নি, যতটা দিয়েছে উচ্চশিক্ষার প্রতি। প্রাথমিক বিদ্যা যে-যেভাবে পারে সংগ্রহ করুক, না-পারলে ঝরে পড়ুক; মাধ্যমিকেও শিক্ষার্থী কম থাকলে ভালো, প্রতিদ্বন্দ্বী কমবে; কিন্তু উচ্চশিক্ষা আমার সন্তানের মঙ্গলের জন্য অত্যাবশ্যক; শিক্ষিত মধ্যবিত্তের মনে-মজ্জাতে এ বোধটা কাজ করত। ফলে শিক্ষাব্যবস্থার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তর নিয়ে তেমন দুশ্চিন্তার সংবাদ পাওয়া যায়নি যেমনটা নাকি পাওয়া গেছে উচ্চশিক্ষার ব্যাপারে।

তিন ধারায় শিক্ষা আগেও ছিল, কিন্তু এখনকার মতো প্রবলভাবে ছিল না। তবে এটা স্থির ছিল যে সুযোগপ্রাপ্তরা ইংরেজি মাধ্যমে পড়বে এবং ইতিমধ্যেই প্রাপ্ত সুযোগ আরও বৃদ্ধি করে নেবে; সুযোগবঞ্চিতরা পারলে মাদ্রাসায় যাবে, গিয়ে নিজেদের বঞ্চনাকে দীর্ঘস্থায়ী করবে। মধ্যবিত্ত পড়বে বাংলা মাধ্যমে, তবে সন্তুষ্টচিত্তে নয়, তার চোখও ওপরের দিকেই থাকবে। তিন ধারার ভেতরে ওই পার্থক্যটা ছিল, তবে এখনকার মতো নয়। এখন তিন ধারার পার্থক্য অনেক গভীর; মাঝখানে পরিখা আছে, দেয়ালও রয়েছে; বিভাজনের তারা পাহারাদার।

কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে তো পরাধীনতার অন্ধকার যুগের মতো তিন ধারার শিক্ষার থাকার কথা ছিল না। বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ওপর ভর করেই বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা এবং এর একেবারে প্রাথমিক প্রতিশ্রুতিগুলোরই একটি ছিল নতুন রাষ্ট্রে শিক্ষা হবে একটি অভিন্ন ধারার। বৈচিত্র্য থাকবে, কিন্তু অবসান ঘটবে বৈষম্যের এবং অভিন্ন ধারার যে শিক্ষা তার মাধ্যম অবশ্যই হবে বাংলা ভাষা। বলার অপেক্ষা রাখে না যে সেটা ঘটেনি; অন্য অনেক প্রতিশ্রুতির মতোই ওই প্রতিশ্রুতিও রক্ষা করা হয়নি। তিন ধারার মধ্যকার ব্যবধান আরও গভীর ও পোক্ত হয়েছে।

শিক্ষার একদিকে থাকেন শিক্ষক, অন্যদিকে শিক্ষার্থী, দুয়ের ভেতর যোগাযোগের মাধ্যম হচ্ছে ভাষা। মাতৃভাষার মাধ্যমে সর্বস্তরে শিক্ষা ইংরেজের শাসনামলে সম্ভব ছিল না; সম্ভব হয়নি পাকিস্তানিদের অভ্যন্তরীণ ঔপনিবেশিক শাসনকালেও। পাকিস্তানের শাসকদের চেষ্টা ছিল উর্দুকেই আমাদের কাঁধে চাপিয়ে দেবে; সেটা সম্ভব নয় দেখে তারা আরবি হরফে বাংলা লেখার ব্যবস্থা করা যায় কিনা তা নিয়ে ভেবেছে এবং এমনও আশা পোষণ করেছে যে, উর্দু-বাংলা মিলিয়ে নতুন একটা পাকিস্তানি ভাষাই তৈরি করে ফেলবে, যার বর্ণমালা হবে আরবি। এসব পরিকল্পনা বাতিল হয়ে গেছে বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। কিন্তু কই বাংলা তো উচ্চশিক্ষার মাধ্যম হয়নি, যেমন হয়নি সে উচ্চ আদালতের ভাষা! এর কারণ অবশ্য অস্পষ্ট নয়। আমরা জানি যে কারণ হচ্ছে এটা যে, ইংরেজ ও পাকিস্তানিদের দুটি রাষ্ট্রই যদিও শেষ পর্যন্ত ভেঙেছে, আমাদের নতুন রাষ্ট্রের আয়তন ছোট হয়েছে, নাম বদলেছে; কিন্তু উন্নতির দর্শনটা বদলায়নি। ইংরেজ আমলে যেমন, পাকিস্তান আমলেও তেমনি, উন্নয়নের দর্শন ছিল পুঁজিবাদী। এখন বাংলাদেশের কালেও সেই দর্শনই বহাল রয়েছে।

পুঁজিবাদ একটি বিশ্বব্যবস্থা, বাংলাদেশে সেই ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে, এবং যোগাযোগের ব্যাপারে বিশ্বপুঁজিবাদের যেটি প্রধান ভাষা, সেই ইংরেজিকেই আঁকড়ে ধরে রেখেছে। সে জন্য দেখা যাচ্ছে যে, রাষ্ট্রভাষা যদিও বাংলা-ই, কিন্তু রাষ্ট্রের ভাষা যে পুরোমাত্রায় বাংলা হবে তেমনটা মোটেই ঘটেনি। অর্থনীতিই হচ্ছে আসল নিয়ন্ত্রক; পুঁজিবাদী অর্থনীতি শ্রেণিবিভাজনকে অপরিহার্য করে তোলে; সেই বিভাজন সমাজে যখন রয়েছে, তখন শিক্ষা ক্ষেত্রে থাকবে না কেন? সেখানেও আছে। যারা সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণির সদস্য তারা আগের মতোই ইংরেজির দিকে ঝুঁকে থাকে এবং প্রাপ্ত সুবিধার বৃদ্ধি ঘটায়। রাষ্ট্রের শাসকও এরাই। ইংরেজি ভাষার প্রতি এদের পক্ষপাত রাষ্ট্রব্যবস্থার বিবিধ ক্ষেত্রে প্রবহমান; শিক্ষা ক্ষেত্রেও তা অনিবার্যভাবেই কার্যকর রয়ে গেছে। ওদিকে সাম্রাজ্যবাদের দ্বারা শাসিত হওয়ার দরুন যে মোহ ও মৌতাত সৃষ্টি হয়েছিল সেটাও কিন্তু কাটেনি। এর অদৃশ্য তৎপরতা বহুবিধ। দৃশ্যমান প্রমাণ মিলবে ছোট ছোট ঘটনাতেও। যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাকিস্তানি আমলে চালু করা ইকবাল হল, জিন্নাহ হল, এসব নাম বদল হয়েছে; কিন্তু ইংরেজ আমলে প্রবর্তিত কার্জন হল, লিটন হল বা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার ফুলার রোড—এসব নাম কিন্তু অক্ষতই রয়ে গেছে। বাংলা প্রচলনের বেলাতেও এ ঔপনিবেশিক পিছুটানও একটা প্রতিবন্ধক বৈকি। আমরা তো ইংরেজদের অধীনে ছিলাম প্রায় দুইশ বছর, আর পাকিস্তানি শাসন টেকেনি বাইশ বছরের বেশি। তদুপরি ইংরেজদের ছিল সাম্রাজ্য; পাকিস্তানিরা সাম্রাজ্য পাবে কোথায়, রাষ্ট্রই গড়তে পারেনি। তাদের প্রভাবটা তাই কম টেকসই হয়েছে। কিন্তু মাতৃভাষাকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার না করলে শিক্ষা যে স্থায়ী, গভীর ও যথার্থ হবে এমনটা তো সম্ভব নয়। শিক্ষা ভাষার সাহায্য ছাড়াও দেওয়া যায় বৈকি; কিন্তু মানুষ ভাষাহীন প্রাণী নয়। অভ্যাসেরও ভাষা আছে, আর সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে ভাষা তো খুবই জরুরি বিষয়। মাতৃভাষা ভিন্ন অন্য ভাষায় শিক্ষা দিলে সেটা হবে কৃত্রিম, অনেকাংশে যান্ত্রিক। ঘটেছেও ঠিক সেটাই। শিক্ষা ক্ষেত্রে আমাদের প্রধান দুর্বলতাই হলো মাধ্যম হিসেবে মাতৃভাষাকে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ব্যর্থতা। মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদানের ব্যবস্থা স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য ছিল প্রধান চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। এই দায়িত্ব পালনের জন্য দরকার ছিল প্রচুর পরিমাণে ও অব্যাহত ধারায় বই লেখা, অনুবাদ করা এবং গবেষণা করা ও গবেষণাকে বাংলা ভাষায় প্রকাশ করা। এসব কাজ একা কেউ করতে পারে না। আবশ্যক ছিল রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের। বলা বাহুল্য, সে উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। যে জন্য শিক্ষায় আমরা খুবই পিছিয়ে রয়েছি। একই সঙ্গে কর্তব্য ছিল দেশের সব মানুষকে প্রথম পর্যায়ে অক্ষরজ্ঞান দান করে দ্বিতীয় পর্যায়ে অর্জিত সাক্ষরতার অনুশীলন যাতে চালু থাকে তার জন্য পদক্ষেপ নেওয়া।

শিক্ষক ছাড়া তো শিক্ষা সম্ভব নয়। একটা সময় ছিল, যে কথাটা বক্তাদের আলোচনায় এসেছে, শিক্ষকরা যখন ছিলেন সমাজে অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তি। কখনো কখনো মনে হতো সর্বাধিক সম্মানের পাত্র তারাই। এর কারণ ছিল। সমাজে তখন শিক্ষিত লোকের সংখ্যা ছিল অল্প। দ্বিতীয়ত, শিক্ষকরা ছিলেন ব্যতিক্রমধর্মী মানুষ। তাদের দেখা হতো দাতা হিসেবে। তা ছাড়া সাংস্কৃতিকভাবে তখন আমরা কিছুটা সামন্তবাদীও ছিলাম বটে; শ্রদ্ধা ও ভক্তি শক্তিশালী উপাদান ছিল আমাদের সংস্কৃতিতে। লোকে ভালোমানুষ খুঁজত, এবং শিক্ষকদেরই সামনে দেখতে পেত। সে অবস্থা এখন আর নেই। সমাজে এখন তারাই সম্মানিত যারা ক্ষমতাবান। আর ক্ষমতার মূল উৎস হচ্ছে অর্থ। অর্থ আছে ব্যবসায়ীদের হাতে; তাদের সহযোগী হচ্ছে আমলারা এবং রাজনীতিকরা। জ্ঞানের মূল্য কমেছে, কারণ জ্ঞানও চলে গেছে অর্থের অধীনে এবং জ্ঞানার্জন মোটেই অর্থোপার্জনের জন্য প্রকৃষ্ট পন্থা হয়ে ওঠেনি; উন্নতির পথে জ্ঞান অনেক ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকও; নৈতিক জ্ঞান তো বোঝা হয়েই দাঁড়াতে চায়। অভিযোগ আছে, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখন আর তেমন একটা গবেষণা হয় না। কথাটা পুরোপুরি সত্য নয়; গবেষণা অবশ্যই হয়, তবে আগের তুলনায় কম হয়। কিন্তু হ্রাসপ্রাপ্তির কারণ যে কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরেই রয়েছে তা কিন্তু নয়। রয়েছে বাইরেও। ওই যে জ্ঞানের প্রায়োগিক মূল্যের হ্রাসপ্রাপ্তি সেটাকে তো অবশ্যই বিবেচনায় রাখতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গবেষণাকে যে উৎসাহিত করা হচ্ছে না এটাও বাস্তবিক সত্য। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উচ্চপদ লাভের জন্য গবেষণা ও প্রকাশনা এখন আর অত্যাবশ্যকীয় শর্ত নয়। আবার গবেষণা হলেও তা যথোপযুক্ত প্রচার পায় না। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রকাশনার উদ্যোগ অত্যন্ত সীমিত। সর্বোপরি অর্থোপার্জনের দাপটটা এতই প্রবল যে, গবেষণায় মনোযোগ রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.
kalbela.com