যে কারণে কাদিয়ানিরা নির্যাতনের শিকার

রেজাউল করিম।
রেজাউল করিম।

আহমদিয়া মুসলিম সম্প্রদায়কে বলা হয় কাদিয়ানি মুসলিম। এ সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা মির্যা গোলাম আহমদ (১৮৩৫-১৯০৮)। মির্যা গোলাম আহমদের পূর্বপুরুষ মির্যা হাদি বেগ ছিলেন সম্রাট বাবরের দূর সম্পর্কের ভাই। তিনি পরিবার, আত্মীয়স্বজন, অনুসারী, চাকর-বাকরসহ ২০০ লোক নিয়ে ১৫৩০ সালে মধ্য এশিয়ার সমরখন্দ থেকে ভারতে আসেন। বাবর তাকে পাঞ্জাবের কাযিয়ান গ্রামসহ আশপাশের শখানেক গ্রাম দান করে তথাকার কাজি (বিচারক) ও জমিদার নিযুক্ত করেন। কাযিয়ান নাম পরিবর্তিত হয়ে কাদিয়ান এবং কাদিয়ান গ্রামের বাসিন্দাদের বলা হয় কাদিয়ানি। মির্যা গোলাম আহমদ ১৮৩৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি কাদিয়ান গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মির্যা গোলাম মর্তুজা। তার বংশধারা মুঘল বংশ হিসেবে পরিচিত। শৈশবে মির্যা আহমদ একাধিক গৃহশিক্ষকের কাছে কোরআন-হাদিস শিক্ষালাভ করেন। আরবি ফারসি ভাষায় ব্যুৎপত্তি লাভ করেন। তার মতে, সশস্ত্র জিহাদ এ যুগে প্রযোজ্য নয়। এ যুগের জিহাদ হচ্ছে কলম ও বাকশক্তি (pen and tongue)। তিনি ইসলামের পক্ষে খ্রিষ্টান ধর্মবিশারদ, হিন্দু ধর্মবিশারদ এমনকি ইসলামী আলেমদের সঙ্গে বিতর্কে অংশ নিতেন। বিতর্কে বেশ পারদর্শিতা অর্জন করেন। তিনি লেখকও বটে। তিনি মহারানি ভিক্টোরিয়াকে খ্রিষ্টান ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণের আহ্বান জানান। যিশুখ্রিষ্ট আততায়ীর হাতে নিহত হয়েছেন এ কথা তিনি মানতেন না। তিনি বলতেন, যিশুর (ঈসা নবী) স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। একপর্যায়ে তিনি নিজেকে ইমাম মাহাদি বা মসিহ দাবি করেন। তার বহু অনুসারী জুটে যায়। গোলাম আহমদের অনুসারীরা আহমদিয়া মুসলিম জামায়াত নামে অভিহিত। তার প্রতিপক্ষরা তাদের হেয়প্রতিপন্ন করে কাদিয়ানি বলে ডাকে।

আহমদিয়া মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে প্রধানত যে অভিযোগ সেই বিতর্ক নিয়ে এখানে আলোচনা করতে চাই না। যদিও সেই কারণেই সুন্নিদের সঙ্গে আহমদিয়াদের বিরোধ শত্রুতায় রূপান্তরিত হয় এবং অতীতেও নানা সময় তাদের মধ্যে বিবাদের ঘটনা ঘটে। আহমদিয়ারা নির্যাতনের শিকার হয়। ১৯৫৩ সালে পাকিস্তানে আহমদিয়াদের সঙ্গে কট্টরপন্থি সুন্নিদের দাঙ্গা হয়। সে দাঙ্গায় শত শত আহমদিয়া (কাদিয়ানি) মুসলমান নিহত হয়, বহু ঘরবাড়ি পুড়িয়ে ধ্বংস করে দেওয়া হয়। এ দাঙ্গার নায়ক ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা আবুল আলা মাওলানা মওদুদী। সামরিক আদালত মওদুদীকে ফাঁসির আদেশ দেন। পরে তা কমিয়ে ১৪ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। দেশি-বিদেশি চাপে একপর্যায়ে তিনি জেল থেকে ছাড়া পেয়ে যান।

ইতিহাসের ট্র্যাজেডি হচ্ছে আহমদিয়ারা ছিলেন পাকিস্তান আন্দোলনের সমর্থক। ১৯৪৭ সালে তারা পূর্ব পাঞ্জাব ছেড়ে পশ্চিম পাঞ্জাবে (পাকিস্তানে) চলে যান। তারা পাকিস্তানে গিয়ে হন রিফিউজি ধাঁচের নাগরিক বা ২ নম্বর নাগরিক। পাকিস্তানে তারা তাদের জন্য পৃথক স্থান দাবি করেন। আহমদিয়াদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হলো যে, তারা কাফের, অমুসলিম, তারা নবী মানে না। তাদের বিরুদ্ধে কলম ধরলেন মাওলানা মওদুদী। অথচ মওদুদী ছিলেন অখণ্ড ভারতে বিশ্বাসী, পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরোধী। আর আহমদিয়ারা ছিলেন পাকিস্তানের পক্ষে। তাদের নেতা স্যার জাফরুল্লাহ খান ছিলেন ব্রিটিশের বন্ধু, প্রিভি কাউন্সিলের মেম্বর, ১৯২৬ সাল থেকে এমপি, ১৯৩৫ সালে রেলমন্ত্রী। ভাইসরয় লর্ড লিনলিথগো তাকে পরামর্শ দেন ১৯৪০ সালের মুসলিম লীগ কাউন্সিলে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ যেন দ্বিজাতি তত্ত্ব ঘোষণা করে মুসলমানদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র দাবি করেন। জাফরুল্লাহ খান তা জিন্নাহকে অবহিত করেন। এমনকি জাফরুল্লাহ খান ছিলেন লাহোর প্রস্তাবের রচয়িতা। ফজলুল হক ছিলেন উত্থাপক। পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টি হলে তিনি হন পাকিস্তানের প্রথম পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি আন্তর্জাতিক আদালত ও জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন। আন্তর্জাতিক আদালতের প্রধান হিসেবে তিনি ছিলেন এশিয়ার প্রথম। তিনিও যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের মতো তার সম্প্রদায়কে নিপীড়নের হাত থেকে রক্ষা করতে পারলেন না। যোগেন মণ্ডল ভারতে গেলেও তিনি পাকিস্তানেই থেকে যান। কিন্তু আহমদিয়া সম্প্রদায়ের লোক হওয়ার কারণে কোনো সম্মান পান না। যেমন পান না ১৯৭৯ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেলজয়ী আবদুস সালাম। কেননা তিনি আহমদিয়া বা কাদিয়ানি। অথচ তিনি প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র মুসলিম, যিনি পদার্থে নোবেল পান।

আহমদিয়ারা কলেমা, নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত পালন করলেও তাদের পাকিস্তানে অমুসলিম বলা হয়। পাকিস্তান সরকার ১৯৭৪ সালে আইন করে তাদের অমুসলিম ঘোষণা করে। বাংলাদেশের রক্ষণশীলরাও তাদের অমুসলিম ঘোষণার দাবি করে আসছে। একজন নাগরিক কোন ধর্ম বিশ্বাস করবে রাষ্ট্র কি তা নির্ধারণ করে দিতে পারে? যদিও পাকিস্তান পেরেছে। কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কি তা পারে? তর্কের খাতিরে মেনে নিলাম, তারা অমুসলিম। কোনো অমুসলিম যদি আল্লাহ-রাসুলের নাম জপে, তাতে ইসলাম ধর্মের ক্ষতি কী তা আমার বুঝে আসে না। এটা তো ইসলাম ধর্মের গর্ব। কেননা অমুসলিমরাও আল্লাহ-রাসুলের নাম নেন। আরেকটি বিষয়, আহমদিয়ারা অমুসলিম হলেও কি তারা তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করার অধিকার পাবে না? বাংলাদেশে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ও বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বসবাস করে। তারা অমুসলিম। তারা তো তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করে। তাহলে আহমদিয়া বা কাদিয়ানিরা পারবে না কেন, বোধগম্য নয়। সংখ্যালঘু হয়ে জন্ম যেন আজন্ম পাপ।

৩ থেকে ৫ মার্চ তিন দিনব্যাপী পঞ্চগড় জেলায় আহমদিয়া জামায়াত সম্প্রদায়ের বার্ষিক ধর্মীয় জামাত সালানা জলসা হওয়ার কথা ছিল। ইসলাম রক্ষাকারীরা তাতে বাধা দেয়। এ ঘটনায় দুজন নিহত হয়, অনেক দোকানপাট ভস্মীভূত হয়। প্রশাসন আহমদিয়াদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেয়। বাংলাদেশ-পাকিস্তানে আহমদিয়া মুসলিম সম্প্রদায় চাপে থাকলেও বিশ্বের বহু দেশে তাদের সংখ্যা বেড়ে চলেছে। আফ্রিকা মহাদেশে তাদের সংখ্যা বেশ ভালো। যেমন নাইজেরিয়ায় ২৮ লাখ ৪০ হাজার, তানজানিয়ায় ২৫ লাখ ৪০ হাজার, নাইজারে ৯ লাখ ৭০ হাজার, ঘানায় ৬ লাখ ৩৫ হাজার, কঙ্গোতে ৫ লাখ ৪০ হাজার, সিয়েরা লিওনে ৫ লাখ, ক্যামেরুনে ৪ লাখ ৩০ হাজার, পাকিস্তানে ৪৯ লাখ, ভারতে ১০ লাখ, বাংলাদেশে ১ লাখ আহমদিয়া মুসলিম বাস করেন।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ, ফরিদপুর

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.
logo
kalbela.com