‘করজে হাসানা’ পরকালীন জীবনের মুনাফা

‘করজে হাসানা’ পরকালীন জীবনের মুনাফা
ছবি : সংগৃহীত

জীবনে চলার পথে সবাই যে পরম সত্যের মুখোমুখি হই, তা হলো জগতে সবাই কোনো না কোনোভাবে অপরের ওপর নির্ভরশীল। পারস্পরিক নির্ভরশীলতার এ বন্ধন থেকে ধনী-গরিব, রাজা-প্রজা কেউই মুক্ত নয়। পারস্পরিক সাহায্য-সহযোগিতার মধ্য দিয়েই এগিয়ে চলে আমাদের সামাজিক জীবন। একজন প্রতাপশালী বাদশাহ যেমন সাধারণ মেথর-প্রহরীর সাহায্য ছাড়া চলতে পারেন না, তেমনি একজন নরসুন্দর বা রাঁধুনিও চলতে পারেন না বাদশাহর আনুকূল্য ছাড়া। সমাজের শৃঙ্খল গতিময় রাখতে ধনী ব্যক্তির প্রয়োজন হয় গরিব শ্রমিকের সাহায্য, গরিবের দরকার হয় ধনী ব্যক্তির আশ্রয় ও সাহায্য। সুখে-দুঃখে একে অন্যের পাশে দাঁড়ানো যেমন মানবিক দায়িত্ব, তেমনি ইসলামেরও নির্দেশনা। প্রয়োজনে ঋণ আদান-প্রদানও করতে হয় জীবন-জীবিকার গাড়ি সচল রাখতে। ইসলামে ঋণ গ্রহণ বৈধ, পবিত্র কোরআনের ভাষায় এ ঋণকে বলা হয়েছে ‘করজে হাসানা’। ক্ষেত্রবিশেষে করজে হাসানাকে উৎসাহিত করা হয়েছে ইসলামে।

আবহমান কাল থেকেই ঋণ প্রথা চালু রয়েছে পৃথিবীতে। ঋণ ছাড়া অর্থনীতি, ব্যবসাবাণিজ্য, উন্নতি ও প্রগতি স্থবির হয়ে পড়ে। এ ছাড়াও ঋণ আদান-প্রদানের মাধ্যমে সামাজিক বন্ধন অটুট ও মজবুত হয়। এ জন্য ‘করজে হাসানা’ বা উত্তম ঋণের প্রতি মহান আল্লাহ মানুষকে আহ্বান জানিয়েছেন। আল্লাহ বলছেন, যারা এ ধরনের ঋণ দেবে তাদের আল্লাহ তার প্রদানকৃত ঋণের চেয়ে অনেকগুণ বৃদ্ধি করে তাকে আবার ফেরত দেবেন। (সুরা বাকারা : ২৪৫)। অভাবের তাড়নায় পড়ে মানুষ ঋণ করতে বাধ্য হয়, আর মানুষের অভাব দূর করা বিরাট পুণ্যের কাজ। শুধু তাই নয়, কেউ যদি কোনো অভাবীর অভাব দূর করে, তাহলে আল্লাহ তার নিজের অভাব দূর করবেন। রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি কারও অভাব দূর করবে, আল্লাহ তার পরকালের অভাব দূর করবেন। আর যে ব্যক্তি কোনো মানুষের কষ্ট দূর করবে, আল্লাহ তার পার্থিব ও পরকালীন কষ্ট দূর করবেন।’ (মুসলিম)। অতএব ঋণ প্রদানকারী পার্থিব ও পরকালীন জীবনে লাভবান হবেন। ঋণ প্রদানের মাধ্যমে মানুষ লাভ করে পরকালীন জীবনের মুনাফা।

প্রয়োজনের সময় আমাদের নবীজীও (সা.) মানুষের থেকে ঋণ নিয়েছেন এবং উত্তমরূপে তা পরিশোধ করেছেন। সাহাবি আবু রাফে (রা.) বলেন, ‘একদিন নবীজী (সা.) এক ব্যক্তি থেকে একটি উট ধার নেন। তারপর সদকার উট আসলে আবু রাফেকে (রা.) আদেশ দেওয়া হয়, তিনি যেন সেই ব্যক্তির উট ফেরত দিয়ে দেন। আবু রাফে (রা.) ফিরে এসে বললেন, আমার কাছে “রুবায়ি মুখতার উট” (সেই সমগুণের উট নেই বরং তার থেকে উত্তম; অর্থাৎ ছয় বছর বয়স অতিক্রম করে সপ্তম বছরে প্রবেশকারী পুরুষ উট) আছে। নবীজী (সা.) বলেন, ঠিক আছে, তাই দিয়ে দাও; কারণ সেই ব্যক্তিই উত্তম যে উত্তমরূপে পরিশোধকারী।’ (মুসলিম, হাদিস : ৪১০৮)। সাহাবি জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত আরেকটি হাদিসে এসেছে, তিনি বলেন, ‘আমি রাসুলের (সা.) কাছে আসলাম। তখন তিনি মসজিদে ছিলেন। তিনি বললেন, দুই রাকাত নামাজ আদায় করো। তার কাছে আমার কিছু ঋণ প্রাপ্য ছিল। তিনি আমার ঋণ আদায় করলেন এবং পাওনার চেয়েও বেশি দিলেন।’ (সহিহ বুখারি : ৪৪৩)

ঋণ মানুষের হক, পাওনাও অধিকার। ঋণ পরিশোধের পূর্বে মৃত্যুবরণ করা মানে মানুষের হক নিজ কাঁধে বহন করে নিয়ে যাওয়া। সেই কারণে এ ধরনের ব্যক্তির জানাজা নবীজী (সা.) নিজে পড়েননি। সাহাবি আবু কাতাদা (রা.) বলেন, নবীজীর (সা.) কাছে এক ব্যক্তির জানাজা নিয়ে আসা হলে তিনি বললেন, ‘তোমরাই তোমাদের সাথীর জানাজা পড়ে নাও; কারণ সে ঋণগ্রস্ত।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১০৬৯)। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আমার কাছে যদি উহুদ পাহাড়ের সমান সোনা থাকত, তবু আমার পছন্দ নয় যে, তিন দিন অতিবাহিত হওয়ার পর তার কিছু অংশ আমার কাছে থাকুক। তবে এতটুকু পরিমাণ ব্যতীত, যা আমি ঋণ পরিশোধ করার জন্য রেখে দিই।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৪৪৫)

বিপদে-আপদে পড়লে তো ঋণ নিতেই হয়; ইসলামও একে বৈধতা দিয়েছে। তবে ঋণ পরিশোধের নির্দেশও দিয়েছে কঠোরভাবে। আমাদের সমাজে কিছু লোক আছেন, যারা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও পাওনাদারকে ঠকানোর মনোবৃত্তি নিয়েই ঋণ পরিশোধে গড়িমসি করেন। ইসলাম যা আদৌ সমর্থন করে না। সুরা নিসায় ঋণ পরিশোধের ব্যাপারে ব্যাপক তাগিদ দিয়ে বলা হয়েছে, ‘যদি কেউ আল্লাহর আদেশমতো সহজেই এ ঋণ পরিশোধ করে, তবে তার জন্য জান্নাতের সুসংবাদ রয়েছে যেখানে সে অনন্তকাল থাকবে। পক্ষান্তরে অস্বীকার করলে বা অবাধ্য হলে রয়েছে অপমানজনক শাস্তি ও আজাব—যে আজাবও চিরকালের জন্য অবধারিত।’ ইবনে মাজাহ ও বায়হাকি শরিফে আছে, ‘ঋণ গ্রহণের পর যে বা যারা ওই ঋণ পরিশোধ না করার সংকল্প করে, তাকে কিয়ামতের দিন আল্লাহর দরবারে চোর হিসেবে সাক্ষাৎ করতে হবে।’ অন্য এক হাদিসে মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘শহীদের সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়, কিন্তু ঋণ এর ব্যতিক্রম।’ (মুসলিম, হাদিস : ১৮৭৬)

ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিকে পরকালে তার নেক আমল দিয়ে ঋণ পরিশোধ করতে হবে। না হলে গুনাহের বোঝা মাথায় নিয়ে জাহান্নামে যেতে হবে। ঋণ নিয়ে উচ্চাভিলাষ চরিতার্থকারী ঋণখেলাপির জানাজা হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) পড়তেন না। তবে ঋণ পরিশোধের প্রবল ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অপারগতাবশত সময়মতো ঋণ পরিশোধ করতে পারে না, এ ধরনের ঋণখেলাপিকে অবকাশ দিয়েছে ইসলাম। পবিত্র কোরআনে এসেছে, ‘যদি ঋণগ্রহীতা অভাবগ্রস্ত হয়, তবে তাকে সচ্ছলতা আসা পর্যন্ত সময় দেওয়া উচিত। আর যদি মাফ করে দাও, তবে তা খুবই উত্তম, যদি তোমরা উপলব্ধি করো।’ (সুরা বাকারা : ২৮০)। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে নবী (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো অভাবগ্রস্ত ঋণী ব্যক্তিকে অবকাশ দেয় অথবা ঋণ লাঘব করে আল্লাহতায়ালা তাকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবেন।’ (মুসলিম)। অন্য হাদিসে এসেছে, হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মানুষের সম্পদ ধার নেয় পরিশোধ করার উদ্দেশ্যে, আল্লাহতায়ালা তা আদায়ের ব্যবস্থা করে দেন। আর যে তা নেয় বিনষ্ট করার নিয়তে, আল্লাহতায়ালা তাকে ধ্বংস করেন।’ (বোখারি : ২৩৮৮)

কখনো ঋণ গ্রহণের প্রয়োজন হলে ঋণ পরিশোধের ইচ্ছার পাশাপাশি নিয়মিত আল্লাহর কাছে দোয়া করা। হজরত আলীর (রা.) কাছে একজন ক্রীতদাস এসে বলল, আমি চুক্তির টাকা আদায় করতে পারছি না। আমাকে সাহায্য করুন। তখন হজরত আলী (রা.) তাকে বললেন, আমি কি তোমাকে কয়েকটি শব্দ শিখিয়ে দিব, যা আমাকে রাসুলুল্লাহ (সা.) শিক্ষা দিয়েছেন? যদি তুমি এটা পড়ো তাহলে আল্লাহই তোমার ঋণমুক্তির ব্যাপারে দায়িত্ব নেবেন। যদি তোমার ঋণ পর্বতসমানও হয়।’ এরপর আলী (রা.) ওই ব্যক্তিকে বললেন পড়ো, ‘আল্লাহুম্মাকফিনি বিহালালিকা আন হারামিকা ওয়াগনিনি বিফাজলিকা আম্মান সিওয়াক।’ অর্থ—‘হে আল্লাহ! হারামের পরিবর্তে আপনার হালাল জীবিকা আমার জন্য যথেষ্ট করুন। আর আপনি ব্যতীত সবার থেকে আমাকে অমুখাপেক্ষী করে দিন।’ (তিরমিজি, হাদিস : ৩৫৬৩)। হাদিসে আরেকটি দোয়ার কথা এসেছে। এ দোয়াটিও পড়তে পারি—‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজু বিকা মিনাল হাম্মি ওয়াল হুজনি, ওয়া আউজু বিকা মিনাল আজযি ওয়াল-কাসালি, ওয়া আউজু বিকা মিনাল-বুখলি ওয়াল-জুবনি, ওয়া আউজু বিকা মিন গালাবাতিদ দাইনি ওয়া কাহরির রিজাল’ অর্থাৎ ‘হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই আমি আপনার আশ্রয় নিচ্ছি দুশ্চিন্তা ও দুঃখ থেকে, অপারগতা ও অলসতা থেকে, কৃপণতা ও ভীরুতা থেকে, ঋণের ভার ও মানুষদের দমনপীড়ন থেকে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৮৯৩)। আপৎকালে ঋণ দেওয়া যেমন পুণ্যের কাজ, তেমনি ঋণ পরিশোধের তাড়নাও রাখতে হবে ঋণগ্রহীতাকে। তাহলে সমাজে ঋণের ধারা বহমান থাকবে এবং এর মাধ্যমে দৃঢ় হবে সামাজিক বন্ধন, সমৃদ্ধ হবে পরকালীন জীবনের মুনাফা।

লেখক : আলেম ও প্রাবন্ধিক

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.
kalbela.com