মশা খেয়েছে ৬শ কোটি টাকা

মশা খেয়েছে ৬শ কোটি টাকা
ছবি : কালবেলা

রাজধানীবাসীকে মশা থেকে রক্ষায় ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আয়োজনের শেষ নেই। মশা মারতে প্রতিবছরই বরাদ্দ বাড়ে, সেই সঙ্গে মশাও বাড়ে। সিটি করপোরেশন দুটি এ খাতে গত ৯ বছরে ব্যয় করেছে ৬৩৬ কোটি টাকা। তবে এর সুফল পায়নি নগরবাসী। এ নিয়ে প্রতিবছরই সমালোচনার মুখে পড়তে হয় মেয়রদের। সম্প্রতি উত্তর সিটির মেয়র আতিকুল ইসলাম স্বীকার করেছেন, মশা নিধনে এতদিন যে পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়েছে, তা ভুল ছিল। এ অবস্থায় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মশা সমস্যা নিয়ন্ত্রণে শুধু ওষুধ ছিটালেই হবে না; প্রয়োজন কার্যকর ওষুধ ও সমন্বিত কীট ব্যবস্থাপনা।

মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিদর্শনে যুক্তরাষ্ট্র সফরে রয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) একটি প্রতিনিধি দল। ওই দলের নেতৃত্বে রয়েছেন মেয়র আতিকুল ইসলাম। তাকে উদ্ধৃত করে গত শনিবার ডিএনসিসির এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘আমরা এতদিন ভুল পদ্ধতি ব্যবহার করেছি। তাতে মশা তো ধ্বংস হয়নি; বরং অর্থের অপচয় হয়েছে। মিয়ামিতে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি, তা ঢাকায় মশা নির্মূলে কাজে লাগাতে চাই। দ্রুত সময়ের মধ্যে মশার প্রজাতি চিহ্নিত করতে একটি ল্যাব স্থাপন করবে ডিএনসিসি।’ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব কমার্সের কমার্শিয়াল ‘ল’ ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের (সিএলডিপি) আমন্ত্রণ ও অর্থায়নে ফ্লোরিডা সফরে রয়েছে প্রতিনিধি দলটি।

কীটতত্ত্ববিদ ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তারা একাধিকবার রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনকে কীটনাশক প্রয়োগ পদ্ধতি পরিবর্তন করতে বলেছেন। কিন্তু তারা তা শোনেনি।

‘মশা মারতে কামান দাগা’ প্রবাদের প্রচলন রয়েছে নগরবাসীর মুখে মুখে। কামান না হলেও মশার উৎপত্তিস্থল খুঁজতে গত বছর আধুনিক প্রযুক্তির ড্রোন ব্যবহার করে উত্তর সিটি করপোরেশন। সে সময় ভিন্ন এক উদ্যোগ নেয় দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। মশা মারতে খাল, নালা, ড্রেনসহ

বিভিন্ন জলাশয়ে ব্যাঙ ছেড়েছিল তারা। তাদের বক্তব্য ছিল, জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য কাজে লাগিয়ে ব্যাঙগুলো পানিতে ভাসতে থাকা মশার লার্ভা খেয়ে ফেলবে। ফলে সেসব স্থানে মশা আর বংশবিস্তার করতে পারবে না। এ ছাড়া জিঙ্গেল বাজিয়েও মশা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে। ২০১৭ সালে ঢাকার নর্দমাগুলোতে গাপ্পি মাছের পোনাও ছেড়েছিল ডিএসসিসি। ২০২০ সালে তিনটি জলাশয়ে ছাড়া হয় তেলাপিয়া মাছ ও হাঁস। এমন নানা উদ্যোগেও নগরবাসীকে মশার অত্যাচার থেকে রক্ষা করতে পারেনি এই সিটি করপোরেশন।

২০১৪-১৫ অর্থবছর থেকে চলতি অর্থবছর পর্যন্ত রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের মশক নিধনে অর্থের বরাদ্দ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রতিবছরই বরাদ্দ বেড়েছে। কিন্তু মশার যন্ত্রণা থেকে নিস্তার পায়নি রাজধানীবাসী। এতে প্রতিবছরই প্রশ্ন ওঠে, মশা মারার বরাদ্দ কার পেটে যায়? ৯ অর্থবছরে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন মশা নিধনে ব্যয় করেছে ৪০৫ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। আর দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ব্যয় ২৩০ কোটি ৬৫ লাখ টাকা।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ব্যয় হয় ১১ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। ২০১৫-১৬ অর্থবছরের ব্যয় ১২ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১১ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও ব্যয় হয় ১৭ কোটি ১৮ লাখ টাকা। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ২৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ব্যয় হয় ১৩ কোটি ৯০ লাখ টাকা। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাজেট ছিল ২৬ কোটি টাকা, ব্যয় হয়েছে ১৯ কোটি ৫২ লাখ টাকা। ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাজেট ছিল ৪৩ কোটি ৩০ লাখ টাকা, ব্যয় করা হয় ২৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। এ বছর মশক নিয়ন্ত্রণে যন্ত্রপাতি ক্রয় বাবদ ৭ কোটি টাকা বাজেট ছিল। সেখানে ব্যয় হয়েছে ৫ কোটি টাকা। ২০২০-২১ অর্থবছরে ৩৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয় মশক নিধনে। এর বাইরে মশক নিধন যন্ত্রপাতি ক্রয়ে ৭ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরে মশা নিধনে বাজেট রাখা হয় ৪৫ লাখ ৭৫ কোটি টাকা।

এদিকে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে মশা নিধনে ব্যয় হয় ১০ কোটি টাকা। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বাজেট ছিল ২৪ কোটি টাকা। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বাজেট ছিল ২৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা, ব্যয় হয় ১৬ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ২০ কোটি টাকা বাজেটের বিপরীতে ব্যয় হয় ১৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাজেট ছিল ২১ কোটি টাকা, ব্যয় করা হয় ১৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাজেট ছিল ৪৯ কোটি ৩০ লাখ টাকা, ব্যয় করা হয় ৫৮ কোটি টাকা। ওই বছর মশক নিধন যন্ত্রপাতি কেনা বাবদ খরচ করা হয় ৮ কোটি টাকা। ২০২০-২১ অর্থবছরে ৫০ কোটি ৫০ লাখ এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে ব্যয় হয় ১১০ কোটি টাকা। আর চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরে মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে ১০১ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে এই সিটি করপোরেশন।

ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, জিকা, চিকুনগুনিয়াসহ ১৩ ধরনের রোগ ছড়ায় মশা। বিশেষজ্ঞরা জানান, অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ, অপরিচ্ছন্নতা, জলবায়ু পরিবর্তনসহ নানা কারণে মশার পরিমাণ এবং প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার ক্ষমতা বেড়েছে বহুগুণ। তাই এখন প্রচলিত কীটনাশক ব্যবহার করেও মশা কমানো যাচ্ছে না। তবুও বাজেটের বড় অংশ ব্যয় হচ্ছে শুধু কীটনাশক কোটি কোটি টাকার ক্রয়ে। মশা নিয়ন্ত্রণে কীটনাশক প্রয়োগ মূলত তৃতীয় পর্যায়ের কার্যক্রম। এর আগের গুরুত্বপূর্ণ আরও দুটি পর্যায় রয়েছে। এগুলো হলো—পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও জৈবিক পদ্ধতিতে মশা নিয়ন্ত্রণ। এটি বাদ রেখে সিটি করপোরেশন কীটনাশকের প্রতিই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে আসছে।

দুই সিটি করপোরেশন বিগত পাঁচ অর্থবছরে মশক নিয়ন্ত্রণে ৪১০ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। এর মধ্যে প্রায় ৩০০ কোটি টাকায় ব্যয় কীটনাশক ক্রয়ে। এই সময়ে ডিএনসিসি ১৫৩ কোটি ও ডিএসসিসি ১৩৬ কোটি ৫৭ লাখ টাকার কীটনাশক কিনেছে। এ থেকে দেখা যায়, কীটনাশকের ওপরই বেশি নির্ভরতা তাদের।

নগরবাসী বলছেন, নিয়মিত মশার ওষুধ ছিটানো হয় না। নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় সীমাবদ্ধ এ কার্যক্রম। মশক নিধন কর্মীরা যেসব ওষুধ ছিটায়, তাতে ধোঁয়া ছাড়া কিছুই নেই। ওষুধের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। বছর বছর ব্যয় বাড়িয়েও মশক নিয়ন্ত্রণের সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। প্রতিবছরই ভয়াবহ আকার ধারণ করে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, ম্যালেরিয়াসহ নানা মশাবাহিত রোগ।

দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ডা. ফজলে শামসুল কবির কালবেলাকে বলেন, ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে এখন পর্যন্ত মশা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছি। ২০১৯ সাল পর্যন্ত মশক নিধন কার্যক্রম কিছুটা বিক্ষিপ্তভাবে চলতে। বর্তমান মেয়র এটিকে সমন্বিত ব্যবস্থার মধ্যে এনেছেন। সারা বছর পরিকল্পনা করে সমন্বিত মশক নিধন ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম চলে। অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে ১ হাজার ৫০ মশক কর্মী ও ৭৫ জন সুপারভাইজার ৭৫টি ওয়ার্ডে কাজ করছেন। তিনি বলেন, খুব হিসাব করে বাজেট করছি। যতটুকু লাগবে, গুনে গুনে বাজেট প্রণয়ন করা হয়।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৫৪ ওয়ার্ডে ৫৪ জন সুপারভাইজারের অধীনে প্রায় ৯০০ মশক কর্মী কাজ করছেন। এই সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জোবায়দুর রহমান কালবেলাকে বলেন, মশক নিধন কর্মীরা বছরজুড়েই কাজ করছেন। মিয়ামি শহরে মশা নিয়ন্ত্রণের উপায়গুলো মেয়র দেখেছেন। যেগুলোকে তিনি দেশে প্রয়োগ করতে চান। তিনি দেশে ফিরলে বিস্তারিত জেনে সেগুলো করবেন।

ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান কালবেলাকে বলেন, যেহেতু মেয়র নিজেই মশা নিয়ন্ত্রণে ভুল পদ্ধতি ব্যবহারের কথা স্বীকার করেছেন, তাই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহি করতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা উচিত।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মশা নিয়ন্ত্রণের অন্যতম পরামর্শক, কীটতত্ত্ববিদ ও বিজ্ঞানী অধ্যাপক কবিরুল বাশার কালবেলাকে বলেন, মশা নিধনে ফগিং ভালো প্রযুক্তি না। মশার ওষুধ দিয়ে যায়, কিন্তু মশা মরে না। মশাভেদে নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতিও আলাদা। ফগিংয়ে নিরুৎসাহিত করে লার্ভিসাইডে গুরুত্ব দিতে দুই সিটি করপোরেশনকে অনেকবার পরামর্শ দিয়েছি, কিন্তু সেগুলো তারা আমলে নেয়নি। এখন যেহেতু উত্তরের মেয়রের এ বিষয়ে ধারণা পাল্টেছে, এজন্য তাকে ধন্যবাদ।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে কত প্রজাতির মশা আছে, সব সময় একটি গবেষণার মধ্যে রাখতে হবে। কীটনাশক কোনটি ব্যবহৃত হবে, কীটনাশকের কার্যকারিতা সব সময় পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, কোন মশার বিরুদ্ধে কোন কীটনাশক ব্যবহৃত হবে; সেটা বুঝেশুনে প্রয়োগ করতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রে মশক নিধন কার্যক্রম পরিদর্শনের উপলব্ধি থেকে মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, তারা এখন ফগিংয়ে অর্থ অপচয় না করে লার্ভিসাইডিংয়ে নজর দেবেন। আমরা দেখেছি, মিয়ামি আর ঢাকার আবহাওয়া এবং মশার ধরন একই। তাই তারা সফল হলে অবশ্যই আমরা সফল হবো। এখন আর পিছিয়ে থাকার সময় নেই। উন্নত দেশের পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারলে ঢাকাকেও মশামুক্ত করা সম্ভব হবে।

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.
logo
kalbela.com